আমার মুক্তি সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতায়

0

ফারহানা আনন্দময়ী:

“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…” আমার ভাবনায় এই আলোটুকু হলো স্বাধীনতা। মানুষ হিসেবে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকার স্বাধীনতা, মানুষ হিসেবে উড়ে বেড়াবার স্বাধীনতা, পরিপূর্ণ মানবসত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত-নেয়ার স্বাধীনতা। তবে আমাদের সমাজব্যবস্থায় এই স্বাধীনতাটুকুর জন্মগত অধিকার নিয়ে জন্মান কেবল পুরুষ। নারীদের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতাটুকু অর্জন করে নিতে হয়।

আমার এতোদিনের ধারণা ছিল, এ সমাজে নারীর মুক্তির জন্য এই আলোটুকুর একমাত্র এবং প্রধান নিয়ামক হলো তার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। কোনো একজন নারী চাকরি করে বা ব্যবসা করে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা পেলেই, ভেবেছি, তিনি বুঝি একজন মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু পেয়ে যাবেন; সমাজ এবং পরিবার তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তাকে সম্মানের সাথে স্বীকৃতি দিয়ে দেবে। কিন্তু চারপাশ দেখে আজকাল মনে হয়, তা হয় না আসলেই।

ফারহানা আনন্দময়ী

পরিচিত অনেক তরুণীকে দেখছি, সাফল্যের সাথে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে নিজ যোগ্যতায় কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। কাজ করছেন, উপার্জন করছেন, পরিবারে সাহায্য-ও করছেন। কিন্তু তিনি কীভাবে নিজের জীপনটা যাপন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা তার পরিবার তাকে দিতে নারাজ। তাকে নিজ শর্তে বাঁচতে দিতে পরিবারের প্রবল আপত্তি, সমাজের অযুহাত দেখিয়ে তাকে জীবন এবং যাপনের প্রতি পদে জবাবদিহি করতে বাধ্য করছেন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন তাকে বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে চাপে রাখছেন; কেউ সরাসরি, কেউ বা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, অনেক তো হলো, এবার ওড়াউড়ি বন্ধ করো। তরুণীটি হয়তো জীবনের এই পর্যায়ে বিয়ের জন্য এখনো প্রস্তুত নন, অথচ তাকে বাধ্য করা হচ্ছে পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে।

আবার এমনও দেখেছি, কর্মক্ষেত্রে একজন সফল বিবাহিত নারী; তার ক্যারিয়ারের জন্য ঠিক এই মুহূর্তে মাতৃত্বের ভার নিতে রাজি নন। অথচ তার জীবনসঙ্গী বা পরিবার আশেপাশের সমাজ এবং আত্মীয়স্বজনের বাক্যবাণের দোহাই দিয়ে নারীটিকে বাধ্য করছেন নিজ ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে গর্ভধারণে। শুধু মাতৃত্বকে মহান একটা জায়গায় অধিষ্টিত করতে গিয়ে কত নারীর ক্যারিয়ারগ্রাফকে থমকে দেয়ার অজস্র করুণ উদাহরণ আছে এই সমাজে। গর্ভধারণের মতো একটি মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে মূলতঃ নারীর একচ্ছত্র অধিকার থাকা উচিত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে, সেখানেও একজন উপার্জনক্ষম স্বনির্ভর নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে খর্ব করা হয় অহরহ।

এতো গেল তরুণীদের কথা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, স্বামী-সন্তান নিয়ে ভরপুর পারিবারিক জীবন কাটিয়ে এসেছেন কত কর্মজীবী সফল নারী; অথচ পরিবারের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেই তাকে সম্মান দেখানো হয়নি, তার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব দেয়া হয়নি; এমন-ও হয়, পারিবারিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার কাছে সিদ্ধান্ত জানারই প্রয়োজন মনে করেননি পরিবারের অন্য উপার্জনক্ষম পুরুষটি কিংবা সন্তানেরাও। অর্থাৎ নারী উপার্জন করেছেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছেন; কিন্তু নারীর যথাযথ ক্ষমতায়ন হয়নি বা হতে দেয়া হয়নি এই প্রথাবদ্ধ সমাজে। তবে ব্যতিক্রম আছে, তারা সংখ্যায় খুব অল্প, উল্লেখযোগ্য নন; সামাজিক বোধের ঘন অন্ধকারে হঠাৎ এক ঝলক আলো হয়ে উঁকি দেন মাঝেমধ্যে।

অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হয়েও সিদ্ধান্ত-না-নিতে-পারার যে অক্ষমতা, এটার বীজ আসলে নারীর বেড়ে ওঠার বয়স থেকেই মগজের গভীরে বুনে দেয় তার পরিবার; যে পরিবারে বাবার সাথে সাথে বেশিরভাগ সময়েই সহযোগী ভূমিকা পালন করেন নারীটির মা। সেই মা, যিনি নিজের জীবনেও কোনোদিন একটিও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ভোগ করেননি। বিপরীত দিকে এমন দু’একটা পরিবারও নিশ্চয়ই আছে, যে পরিবারের মা কর্মজীবী নারী নন, এক টাকাও কোনোদিন উপার্জন করে পরিবারে দেননি, কিন্তু পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষটির মানসিক গঠন এমন আলোকিত, যে কোনো সিদ্ধান্তের ভার নির্দ্বিধায় নারীটির হাতে দিয়েই নিশ্চিন্ত থাকেন। তবে প্রথার বাইরে বেরিয়ে ধারা গড়বার মতো বোধ এ সমাজে খুব কম পুরুষেরই থাকে।

আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, নারী হয়ে জন্মেও একটি স্বাধীনচিত্তের অধিকারী থাকা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তে নিজ জীবনকে পরিচালিত করার অভিপ্রায় আমার ভেতরে ভেতর থেকেই গড়ে উঠেছিল আমি যখন উপার্জন করার বয়সে পৌঁছাইনি, তখন। বালিকা বয়সে আমার মাকে যখন দেখতাম প্রায় সকল সিদ্ধান্তের জন্যই তিনি আমার বাবার উপর নির্ভর করতেন, সেই বয়সেই আমি তাকে সাহস দিতাম। মাকে বলতাম, একটু যাও না ছকের বাইরে। বাবাও বুঝে গিয়েছিলেন, এই মেয়ে কোনোদিন কারো চাপিয়ে-দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না, যতক্ষণ না সে মনে নেবে।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত, উপার্জন যেটুকুই করি না কেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতায় ঋজু থাকতে পেরেছি, আমার মুক্তি এখানেই। যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়গুলো ছাড়া বাকি সিদ্ধান্তের বেলায় আমার ভালোলাগা-মন্দলাগার প্রতিফলন ছায়া ফেলে। বন্ধুবলয়ের অনেকেরই ধারণা, আমার জীবনসঙ্গীর যথেষ্ট উদারতার সুযোগেই বোধ হয় আমি পারি এরম স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে। তারা হয়তো জানেন না, স্বাধীনতা কেউ কাউকে দান করার বিষয় নয়, এটা অর্জন করতে হয়। বোধের নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়েই চিত্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়। এবং এটার জন্য সবচেয়ে আগে যেটার প্রয়োজন, তা হলো, মানুষ হিসেবে একজন মানুষের স্বতন্ত্র সত্তাকে সম্মান জানানো।
আগে আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে, আপনি নিজে নিজেকে কতটা সম্মান করতে চান, তারপর সেই পথ ধরে এগুতে থাকুন, মুক্তি আসবেই। তবে হ্যাঁ, এ পথে এগুনোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বস্ত সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে সকল নারী এবং পুরুষ বন্ধুর কাছে একটাই চাওয়া, আপনার কন্যাসন্তানকে স্বাধীনভাবে তার নিজ জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারার যোগ্য করে বেড়ে তুলুন। সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতার আকাশটি আপনার আত্মজার জন্য উন্মুক্ত করে দিন; এই কথাটিও সাথে জানিয়ে দিন, সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা তোমার, তোমার জীবনের ভার বহন করার দায়-ও তোমার। সে ঠিকই দায়িত্ব বুঝে নেবে, আলো খুঁজে নেবে।

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ১,৭২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.