বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন ও আন্তর্জাতিক নারী দিবস

0

সামিনা আখতার:

ধর্ষণের শিকার একজন নারী যার ধর্ষণের বিচার হয় না, বা সুশীল সমাজের প্রতিবাদে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয় না, এমন একজন নারীর কাছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী অর্থ বহন করে? আচ্ছা, আন্তর্জাতিক নারী দিবস কি শুধু নারীর, নাকি নারী বিষয়ক সচেতনতার দিবস? তাহলে রাষ্ট্র এই দিবসকে কীভাবে দেখে? রাষ্ট্রের কার্যক্রমগুলোর জবাবদিহিতা আসলে কোথায়?

পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন ধর্ষণের খবর দেখতে দেখতে মনে হয় বাংলাদেশ একটা রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠতে পারেনি, আর সেখানে কোনো মানুষ নেই, আছে শুধু ধর্ষক।

কয়েকদিন আগে পত্রিকার পাতায় ৬৫ বছরের একজন নারীর ছবি ছাপা হলো, যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যিনি বা যারা এই নারীর ছবিটা ছাপিয়ে দিলেন, তিনি বা তারা কি এটা করতেন যদি নারীটি তার বা তাদের নিজের মা হতেন! নিশ্চয়ই না।
তাহলে নারীটি তো বাংলাদেশেরই একজন নারী, একজন মা, আমাদের মা, তবে তার মুখটি ছাপিয়ে আমরা সমাজকে আসলে কী মেসেজ দিতে চাচ্ছি?

কথাটা কি এভাবে বলা যায় না যে, আমরা একজন ধর্ষণের শিকার নারীকেও পণ্য করতে ছাড়ি না, এতোটাই নিচে নেমেছি আমরা!
এই মা একবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তারপর মিডিয়ায় এভাবে তার ছবি ছাপিয়ে তাকে কি আবার অসংখ্য মানুষ দিয়ে ধর্ষণ করা হলো না? উন্নয়নের বাংলাদেশে এখন সবার হাতে হাতে এ্নড্রয়েড ফোন। হতে কি পারে না যে এই নারীর অনেকের হাতেই আছে ফোন। বাইরের পুরো সমাজ না হয় বাদই দিলাম, বিপদগ্রস্থ মানুষটির নিজের আত্মীয় স্বজন নিয়েও যে জগতটা আছে, সেখানেও তাকে মারাত্মক ছোট করে ফেল্লাম না কি!

একজন ৬৫ বছর বয়সী মা নির্যাতিত হয়েছেন, ছবিবিহীন এই খবর কি আমাদেরকে এখন নাড়া দেয় না? প্রচার বাড়াতে ছবি দিতে হবে নারীটির, আর এই সমাজের অসংখ্য কুলাংগার ঐ ছবি দেখবে আর মানসপটে আরও বারংবার যৌনতার ছবি আনবে, ভাববে ঠিক কীভাবে নারীটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল! টিকাটিপ্পনিও কাটবে যে এই বয়সে ধর্ষকরা কী খুঁজে পেয়েছে এই নারীর মাঝে!
কী পাশবিক আমাদের আচরণ!
আচ্ছা ধর্ষকের ছবি দেয়া হলো না কেন!
কোন যুক্তিটা দেখানো হবে এখানে? ধর্ষক পুরুষটিকে পাওয়া গেল না, যেভাবে পুলিশ প্রশাসন সবসময়ই পায় না সেরকম?
হাতের কাছে পাওয়া গেল নারীটিকেই?
আমরা কি দিন দিন বুদ্ধিহীন বিবেকহীন কিছু প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি!

খবরটা দেখার পর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, আছেন কি কোন মানুষ বাংলাদেশে! যিনি বাংলার এই মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারেন!নাকি মানুষহীন দেশটাতে আছে শুধু নারী আর পুরুষের শরীর!
বা অদ্ভুত এক পথে হাঁটছে বাংলাদেশ! একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ‘মুক্তচিন্তা’ কে বাদ দিয়ে ধর্মীয় লেবাসকে তোষামোদ করাটাই প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনীতিতে, অন্যদিকে দুর্নীতি আর ধর্ষণের কবলে পড়ে দেশটি ডুবতে বসেছে।

যে রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদগণ এই মৌলিক প্রশ্নের স্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে পারে না যে ঐ সমাজ আসলে নারীকে কীভাবে দেখবে? সেই সমাজ কি নারীর পোশাক, নারীর চলাচল তথা নারীর স্বাধীনতাকেই সমস্যা হিসাবে দেখবে! নাকি যেকোনো মূল্যে নারীকে সম্মান দেখানোর সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করবে?

যেকোনো রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে ঐ রাষ্ট্রের প্রজন্মকে তৈরির শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় এই মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর কোনো সরকারের আমলেই দেয়া হয় নাই। বলা যায় সাম্প্রতিক সময়ের আপোষকামী রাজনীতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে! অথচ অবাক হতে হয় যে, এইসব মৌলিক প্রশ্নগুলোর পথ ধরেই কিন্তু দেশটিকে একদিন যুদ্ধের মতো ভয়ংকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সে যুদ্ধে নারীকে দিতে হয়েছিল চরম মূল্য। কিন্তু স্বাধীন এই দেশটি নারীর বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।

এই দিকনির্দেশনাহীন রাষ্ট্র এবং সংস্কৃতি কিন্তু নারীর নিজের বিকাশকেও প্রাভাবিত করেছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের এই এতোটা দিন পরে নারী নিজেকে কতটা স্বাধীন এবং সামাজিক সত্ত্বা হিসাবে তৈরি করতে পেরেছে অথবা পারে নাই? এক্ষেত্রে ১৯৫২ এবং ১৯৭১ এ নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা, এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সাথে যদি এখনকার নারীর চিন্তা চেতনা আর রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংশ্লিষ্টতাকে তুলনা করা যায়, তবে চিত্রটি সহজে অনুমেয়।
সুতরাং একথাটি স্পষ্ট যে স্বাধীনতা অর্জন করলেও পরবর্তীতে দেশটি যারা পরিচালনা করেছেন তাদের রাজনৈতিক দর্শন নারীকে সঠিক পথ দেখাতে পারে নাই।

বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্র যা কিনা কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল নয়। দেশটি চলে এর নারী আর পুরুষের শ্রমের দুটি হাতের উপর। এরকম একটি দেশে নারী আর পুরুষের স্বাধীন চলাচলকে নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট অবস্থান খুব জরুরি। রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বিধান্বিত অবস্থান দেশটিকে ধর্ষণ সংকটে ফেলবার এক মৌলিক উপাদান হিসাবে কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক।

মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পর যে দেশটিতে প্রশ্ন উঠে, নারী পড়বে শুধুমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত, তাহলে তো বলতেই হয় “হে আমার প্রিয় স্বদেশ, তুমি পথ হারাইয়াছো!” আর এই যে পথ হারানো দেশ তার দায়দায়িত্ব কি রাজনৈতিক দলগুলো নেবেন না? তা সে আজকের ক্ষমতাসীন দলই হোন, আর গতকালের ক্ষমতাসীন দলই হোন! এই দায় আপনারা কার উপর দেবেন?
শুধুমাত্র ইটপাথরের গাঁথুনী দিয়ে উন্নয়ন আর ভোটের রাজনীতিতে মৌলিক বিষয়গুলতেও আপোষ করে গেলে একদিন দেশ তো বটেই, ঘরের কন্যা, জায়া জননীকেও রক্ষা করা যাবে না!

আমার প্রিয় স্বদেশ খুঁজে পাক সঠিক রাজনৈতিক দর্শন; শুভ হোক আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৯!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 124
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    124
    Shares

লেখাটি ৩১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.