প্রসঙ্গ: রিগ্রেটিং মাদারহুড ও পাঠ প্রতিক্রিয়া

0

তামান্না ইসলাম:

এই লেখাটি সম্প্রতি উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সুপ্রীতি ধরের ‘মাদারহুড এবং রিগ্রেটিং মাদারহুড’ এর প্রসঙ্গে লেখা। ব্যক্তিগতভাবে সুপ্রীতি ধরের অনেক লেখাই আমার ভালো লাগে। কিন্তু এই লেখাটি আমার মনে কিছুটা খটকা লাগিয়েছে।

মাতৃত্ব পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের এবং ত্যাগের কাজ। সে হিসেবে দেখলে পিতৃত্ব ও কম কষ্টের নয়, যদি কোন পিতা ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব পালন করে। তারপরেও গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান, স্তন্যপানসহ কিছু কাজ আছে যেটা শুধু মায়েদেরই করতে হয়। কোনভাবেই কোনো পিতা সেই কষ্টের অংশীদার হতে পারবে না।

মায়ের শরীর থেকে সন্তানের জন্ম হয় বলে কিনা জানি না, শেষপর্যন্ত কোন কারণে যদি বাবা, মায়ের মধ্যে একজনকে সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা মাকেই নিতে হয়। বিশেষ করে যেসব জায়গায় আইন কানুনের কোন বালাই নাই। তাছাড়া অলিখিতভাবে, পৃথিবীর যেকোনো দেশে, যেকোনো সমাজে সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব মা’ই বেশি নেয়।

তামান্না ইসলাম

মাতৃত্বের বা এমনকি পিতৃত্বের এই যে ত্যাগ, কষ্ট, এটার মূল্যায়ন কী? এর তো কোনো মজুরি নেই, পুরস্কার নেই। তবুও মানুষ এই কষ্ট করে কেন? এখন তো আর সেই যুগ নেই যে বাবা, মা ভাববে বেশি সন্তান মানে আয় বেশি হবে, বা বুড়ো বয়সে ছেলে, মেয়ে বাবা, মাকে দেখবে। এই সব কোনো আশা ছাড়াও মানুষ সন্তান জন্ম দেয়, লালন-পালন করে।

আসলে মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের কোনো দৃশ্যমান, বস্তুগত মূল্যায়ন হয় না। এটা তার ঊর্ধ্বে। প্রকৃতি তার নিজ স্বার্থে প্রাণী জগতের বংশ রক্ষার উদ্দ্যেশ্যে অন্যান্য প্রাণীর মতোই মানুষের মনেও সন্তানের প্রতি অপার স্নেহ তৈরি করে দিয়েছে এবং সেই স্নেহধারাটি সারাজীবনই অক্ষুণ্ণ থাকে। এই একই কারণে পিতামাতার কাছে সন্তান হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রিয়। যুক্তি, তর্ক দিয়ে, মাপ কাঠি দিয়ে এই ভালো লাগার, এই অনুভূতির, এই কষ্ট স্বীকারের কোনো কার্যকরণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।

অনেকে বলে মাতৃত্বকে অযথা গ্লরিফাইড করা হয়, যেন মেয়েরা এই জালে আরও জড়িয়ে থাকে। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষকেই তার জন্মের জন্য মাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। বেশিরভাগ মানুষকেই তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং তার বর্তমান অবস্থানের জন্য মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ হতে হবে। পৃথিবীতে প্রাণের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখা কি কোনো মহান কাজ না?
পৃথিবী, প্রকৃতি, সমাজ সব কিছু যদি মানুষ নিয়ন্ত্রিত হয়, সেই মানুষকে যদি তৈরি করে মা, তাহলে এই সব গুরু দায়িত্বগুলোতেও কিন্তু মায়ের ভূমিকা আছে। সুতরাং মাতৃত্বকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নাই। একজন সুসন্তান তৈরি করা মানে এই পৃথিবীতে সেই মা কিছুটা হলেও অবদান রেখে গেল, তার ফুট প্রিন্ট, তার মূল্যবোধ সন্তানের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সেবা করে যাবে।

মাতৃত্ব এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, যা মায়ের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। একথা অস্বীকার করছি না। মেয়েদের উপরে অনেকসময় জোর করে এটা চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটাও অস্বীকার করছি না। কখনও কখনও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেও মুখোমুখি হতে হয় মাতৃত্বের।
সমাজের স্বীকৃতির অভাবে বা স্বাস্থ্যগত, অর্থনীতিক কারণে এবরশন করানো বা সদ্যজাত বাচ্চাকে ত্যাগ করার ঘটনা যে নেই তা নয়, তবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ‘রিগ্রেটিং মাদারহুড’ আইডিয়াটা আমার কাছে কিছুটা অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব মনে হয়েছে। অনেক মা-ই সন্তান জন্মদানের পরপর অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় চলে যায়। বিশেষ করে প্রথম সন্তান। তাছাড়া যদি হয় অপরিকল্পিত গর্ভধারণ। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সামলে উঠে। তবুও মা হয়ে যাওয়ার পর এটা আরেকটা ফুলটাইম জব হয়ে যায়। অনেক সময়ই মায়েরা হাঁপিয়ে উঠে। ক্লান্ত হয়, হতাশ হয়। অনেক সময়ই বলে, ‘আগে জানলে সংসার করতাম না’, ‘এতো ঝামেলা বুঝলে এই পথে যেতামই না।’ কিন্তু কোনো মা মনে মনে ভাবে না, ‘আমার যদি এই বাচ্চাগুলো বা এই বাচ্চাটা না জন্মাতো, আমার জীবন অনেক ভালো হতো!’

লেখার শুরুতেই লেখিকা তাঁর যে পরিচিতের কথা বলেছেন, আমি নিশ্চিত, তিনি নিজেও স্বাধীনতা তীব্রভাবে মিস করলেও, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না, জীবনটাকে রিঅয়াইন্ড করলে তিনি কোনো বাচ্চা নিতেন না। যেসব মা সিঙ্গেল মাদার, একা একা সন্তান নিয়ে যুদ্ধ করছে প্রতিদিন তাঁরাও ভাবেন না একথা। তাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা হয় বাচ্চাকে মানুষ করা। তাদের ভালোবাসার আশ্রয় হয় তাদের সন্তান। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে মা যেই শান্তি পায়, সন্তানের সাফল্যে বা সুখে মা যে সুখ পায়, পৃথিবীর অন্য কোথাও সেই শান্তি পাওয়া যায় না।

কে মা হবে, কে মা হবে না সেটা প্রতিটা মেয়ের নিজের সিদ্ধান্ত, সেই সাথে তার স্বামীরও যেহেতু স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা পালনের দায়িত্ব দুজনেরই। কে কখন মা হবে, কয়টা বাচ্চার মা হবে, এটাও সেই পরিবারের একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এখানে সমাজ বা এমনকি তাদের বর্ধিত পরিবারের কারও কিছু বলার কোন অধিকার নাই।

মা হওয়া ভীষণ কঠিন একটা কাজ, কতোটা কঠিন সে বিষয়ে প্রতিটা মেয়ের আগে থেকেই ধারণা থাকা উচিত। তার জীবন সঙ্গীরও ধারণা থাকা উচিত এবং সে হিসাবে পরিকল্পনা করা উচিত। কিন্তু ‘মা হওয়ার পর পস্তাতে পারো’, বা ‘মা হওয়া এতো কঠিন কাজ যে পরে মনে হতে পারে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল এই বাচ্চার জন্য’; এ ধরনের অহেতুক ভয়কে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক না। এটা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ এবং অসত্য।

সত্যটা হলো, এ পর্যন্ত যত কাজ তুমি করেছ, এই কাজটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, শারীরিক এবং মানসিকভাবে শ্রমসাধ্য, সময় সাপেক্ষ, প্রচুর ধৈর্য, ডিসিপ্লিন এমনকি ট্রেনিঙেরও প্রয়োজন। এটা তোমার জীবনে আমূল পরিবর্তন আনবে, তোমার অন্য কাজকে সেভাবে অরগানাইজ এবং প্ল্যান করতে হবে। তুমি যদি এসব কিছুর পরে মাতৃত্বকে তোমার জীবনের টপ প্রায়োওরিটি হিসেবে নিতে পারো, তবে তুমি এখন সেটার জন্য তৈরি। এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তুমি যে আনন্দ পাবে, শান্তি পাবে সেটাও জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি। তুমি নিজে অবশ্যই পৃথিবীতে অনেক অবদান রাখতে পারো, সেই সাথে একটি সুসন্তান এই পৃথিবীর জন্য তোমার আরেকটি অবদান। সর্বোপরি, মাতৃত্ব তোমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পর্কের স্বাদ দেবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 172
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    172
    Shares

লেখাটি ১,০৫৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.