মৃত্যুর মিছিলে ঘুম ভাঙ্গানোর ডাক কিংবা আমাদের “ওয়েকআপ কল”…

0

সাবিরা শাওন:

অন্যান্য সব জাতির থেকে আমাদের ঘুমটা বুঝি একটু বেশিই গভীর। এতোটা গভীর ঘুমে আমরা এখনও ডুবে আছি যে, একেকটা দুর্ঘটনা এখন আমাদের কাছে স্রেফ খবরের কাগজের শিরোনাম আর মৃত মানুষগুলো শুধু পরিসংখ্যানের তথ্য। অথচ ৪৮ বছর আগে এই সময়টাতে আমরা কতোটা অধীর আর বিনিদ্র হয়ে পাহারায় ছিলাম নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য। তখন অন্যায়, অবিচারগুলো বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করতো, এলোমেলো করে দিতো আমাদের জাতিসত্ত্বার ভিত। তখন সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম বলেই আজকে আমরা স্বাধীনতার রোদ পোহাই।

কিন্তু প্রশ্ন উঠে যখন বর্তমান নিয়ে ভাবি। চারদিকে এতো অবিচার, হাহাকার আর অনিয়ম; অথচ আমরা কত স্বাভাবিক! তবে কি আমাদের তেজ, অনুভূতি কিংবা প্রতিবাদের ধার ক্ষয়ে গেছে? নাকি আমরা ক্লান্ত? জানি প্রশ্ন গুলো অবান্তর ও একই সাথে কাগজে বন্দী শুধুই কিছু শব্দ।

আমাদের সহ্য ক্ষমতা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। না হলে প্রতিনিয়ত এতো এতো অঘটনেও কেন আমাদের ঘুম ভাঙ্গে না। ২০১০ সালের নিমতলীতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিলো আমরা ভেবেছিলাম ১২৪ টা প্রাণ হয়তো এবার কিছুটা বদল আনবে। সরকার তার দায়িত্ব পালনে কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসবে। আর আমরা আমজনতা যারা টিভিতে কিংবা পত্রিকার পাতায় বীভৎস মৃত দেহ দেখে আঁতকে উঠেছিলাম, আমরাও হয়তো সচেতন হবো। সরকারি আদেশ, নিষেধ আসুক বা না আসুক অন্তত নিজের প্রাণ রক্ষায় নিজেরা উদ্যোগী হবো।

২০১০ সালের নিমতলীর সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে পাওয়া শিক্ষা কতটা কাজে আমাদের লেগেছে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি গত মাসের ২১ তারিখ। আবারও দেখেছি পুড়ে যাওয়া নিথর কিছু দেহ আর কান্নায় নির্বাক কিছু চাহনি। কিছুদিনের জন্য পেয়েছি ৬৯টি মৃতদেহ আর তাঁদের স্বজনদের হতবিহবলতায় মূক কিছু ছবি এবং কতগুলো গল্পের প্লট। সুশীলের ভাষায় এবার এটা আমাদের আরেকটা “ওয়েকআপ কল”। সবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও টিভি টকশো আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র তিরস্কারমূলক কথাবার্তায় কিছুটা আশা জাগতে চাইলেও দুঃস্বপ্নের মতো হানা দিলো বিগত দিনগুলোর আরও কিছু ব্যর্থ “ওয়েকআপ কল”।

যেমন ২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। শুরুটা হয়েছিলো সহপাঠীর প্রতি ভালোবাসা থেকে, কিন্তু তাদের প্রতিবাদ ও দাবিগুলো ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। তাঁরা পেয়েছে সকলের অকুন্ঠ সমর্থন। সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এবার তবে বাঙ্গালি জেগে উঠবেই। সড়কে নৈরাজ্য কমবে। দিনশেষে সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরবে।

এর পরেরটুকু পুরোটাই ইতিহাস। সবার জানা, হেলমেট বাহিনীর ভূমিকা থেকে শুরু করে শাহজাহান খানকে দিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন।

আমাদেরকে কুম্ভকর্ণের সাথে তুলনা করা মানে তাকেও লজ্জা দেওয়া। তবুও আমাদের মহারথীদের একটু জানিয়ে যাই, এতোবড় একটা আন্দোলনের পরেও ২০১৮ সালে ৫ হাজার ১৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা হারিয়েছি মাত্র ৪৪৩৯ জন স্বজনকে। আর এখনও প্রতিদিন গড়ে প্রাণহানি ঘটে ৬৪ থেকে ৬৫ জনের। এই হলো আমাদের জেগে উঠার নমুনা।

শুধু চকবাজার ও এই নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনগুলো যদি আমাদের সাম্প্রতিক ওয়েকআপ কল হয়, তাহলে ২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ড, ২০১২ এর তাজরিন ফ্যাশন এর আগুন এবং ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধ্বস কি তবে স্রেফ ট্রেইলার ছিলো? এর সাথে ধর্ষণ, বিচার বহির্ভূত হত্যাগুলোর সংখ্যা জুড়ে দিয়ে শুধু শুধু লেখা বড় করে লাভ কী!

বলছিলাম আমাদের জেগে উঠার কথা, এতো এতো দুঃসংবাদের ভিড়েও কখনও সখনও কিছু খবর ঠিক নজর কাড়ে। যেমন সোহরাওয়ার্দীর হাসপাতালে ও চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে এবং বিগত দিনগুলোতে প্রতিটি বিপর্যয়ে সকলের এগিয়ে আসা। সাধারণ মানুষের সহায়তা ও তাঁদের জীবনবাজি রেখে দুর্ঘটনাগ্রস্থ মানুষদের উদ্ধারের গল্পগুলো এখনও আশা জাগায়।

এতো এতো অনিয়ম ও অন্যায়ের প্রতিরোধে আমাদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো নিজেদের সচেতনতা। আমাদের জীবন বাঁচানোর তাগিদ যে সরকারের খুব একটা নেই তা আমরা সম্প্রতি দুই নেতার কাঁদা ছোড়াছুড়ি কিংবা তাঁদের সত্যভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝেছি। সরকারি মহলগুলো সাধারণের জীবনরক্ষায় কতোটা তৎপর তা না হয় অন্যদিনের জন্য থাকুক।

তাই আরও একটা চকবাজার অথবা নিমতলীর মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় এর জন্য আবাসিক এলাকায় দাহ্য কিছু না রাখার জন্য এলাকাবাসী যে প্রচরণা শুরু করেছে তা প্রশংসার দাবি রাখে।

সাধারণ মানুষের এই উদ্যোগটুকুও যদি হয় জেগে থাকার প্রক্রিয়া, তবে হয়তো আরো একটা ওয়েকআপ কলের অপেক্ষা আমাদের করতে হবে না; এই আশাটুকু করতেই পারি।

শেয়ার করুন:
  • 100
  •  
  •  
  •  
  •  
    100
    Shares

লেখাটি ২১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.