সিদ্ধান্ত

0

ফাহমিদা খানম:

“এই মুহূর্তে ২৫ হাজার টাকা আমি তুলতে পারবো না, তুমি বরং মাকে বুঝিয়ে বলো”।
“আহ নীরু মা শুনতে পেলে কষ্ট পাবেন, আশা করেই তো আমার কাছে এসেছেন, আমি ২৫ হাজার ম্যানেজ করেছি, আর ২৫ হাজার তুমি দাও, আমি পরে তোমায় দিয়ে দিবো”।
“এই পর্যন্ত কতো দিয়েছি, কয় টাকা শোধ করেছো? আমিও কষ্ট পেয়েছিলাম, সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার হয়নি। আর কতো? প্লিজ এবার অন্তত আমাদের কথা ভাবো, দুই বাচ্চা আছে আমাদের, আর মেয়েটাও বড়ো হচ্ছে”।

ডাইনিঙয়ে পানি খেতে এসে মা-বাবার রুম থেকে আসা কথাগুলো শুনেই ফেললাম, গত তিন বছর ধরেই এই ঝগড়া দেখলেও আজও অভ্যস্ত হতে পারিনি। কবে যে এসব শেষ হবে কে জানে! রুমে ঢুকতেই দাদী চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো –“তোর বাপ কি অফিস থেকে এখনো ফিরেনি? আর তোর মা কি নাস্তাপানি কিছু বানাইছে?”
“বাবা জামাকাপড় ছাড়ছে, মা একসাথেই সবাইকে নাস্তা দিবে দাদী”।
“কতোক্ষণ লাগে নাস্তা বানাইতে? আমরা কি সংসার, বাচ্চাকাচ্চা সব সামলাই নাই? চাকুরী কইরা এমন ভাব যেনো দুনিয়া উল্টাইয়া ফেলছে তোর মায়! আমরা যেন আর সংসার সামলাই নাই!”

দাদী, ফুফুরা সবসময়ই মাকে এভাবেই বলে, আমি শুনে শুনে বড় হলেও আজও অভ্যস্ত হতেই পারিনি, তাই নিজেই গেলাম রান্নাঘরে।
“অর্থী পড়ার সময় রান্নাঘরে কী করো তুমি? যাও পড়তে বসো গিয়ে”।

লেখক: ফাহমিদা খানম

দাদী রুম থেকে বেরিয়েই উত্তর দিলেন –“মাইয়ারে কাজ–কাম শিখাও, এই বয়সে ওর ফুফুরা সংসারের সব কাজ করতো, তোমার মাইয়া কিছু বুঝেও না, পারেও না। বিয়া দিলে শ্বশুরবাড়ির কথা শুনতে হইবো!”
“আম্মা, অর্থী আগে পড়াশোনা শেষ করে নিজ পায়ে দাঁড়াক, তারপর এসব নিয়ে ভাবা যাবে।”
“আমরা মাইয়াগোরে পড়াইছি, ঘরের কাজও শিখাইছি। তোমার মাইয়া পারে খালি মুখের উপরে ঠাস ঠাস কথা কইতে!”

মা চোখে পানি নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন, সেই চোখের ভাষাও আমি জানি। আমার বয়স এখন ১৮+ চলে, অনেককিছুই বুঝি আমি। প্রায় সন্ধ্যায় বারান্দায় গিয়ে মা তার শখের গাছের সাথে কথা বলেন, আমি চুরি করেই শুনি –জানি এটা অন্যায়, তবুও শুনি, বুঝি মায়ের শূন্যতা কোথায়!

রাতে খাবার টেবিলে বসেই দাদী বাবাকে জিজ্ঞেস করলো –“কীরে বাপ টাকার কি ব্যবস্থা হইছে? আমি তো বড়ো মুখ কইরাই জামাইকে বলে আসছি, মাইয়ার ঘরে সিজারের খরচ বাপের বাড়ি থেকেই দিমু।”
“আম্মা, আমি চেষ্টা করতেছি, আপনি এসব নিয়ে টেনশন কইরেন নাহ”
“আম্মা, যারা মা-বাবা হবে, এটা কিন্তু তাদের দায়িত্ব”
“বউ, আমি কি তোমার কাছে তোমার বেতনের টাকা চাইছি? বড়ো ভাই হিসাবে ছোট ভাইবোনকে দেখা বাহারের কর্তব্য বুঝছো! তোমার এতো হিংসা হয় ক্যান? ছেলে তো কুনু কথা কয় না।”

রাগে ভাতের প্লেট ঠেলে দাদী উঠে গেলেন, খাবারের রুমের পরিবেশ নীরব হয়ে গেলো, বাবার দিকে তাকালাম –এই চোখের ভাষাও আমি পড়তে পারি। সেখানে আকুলতা – “আহ মায়ের সামনে এসব কেনো বলতে যাও?” বাবাও উঠে গেলেন দাদীর রাগ ভাঙ্গাতে। মা, আমি, বাবু নিঃশব্দে খেলাম। আমাদের বাসায় সবার কাজ মা ঠিক করে দিয়েছেন, আমরা যার যার খাবারের প্লেট, রুম গুছানো, মশারী নিজেরাই টাঙ্গাই, ছুটা বুয়া ভোরে এসে তিন কাজ করে, তাই এই নিয়ম। মা একটা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করে, সকালে বেরিয়ে দুপুরের মাঝেই ফিরে। বড় খালা এলেই চিল্লাচিল্লি করে, কেনো মা নিজের উপরে এতো চাপ নেয়! বাবাটাও দাদুবাড়ি থেকে কেউ এলে মাকে আর সাহায্য করে না, আমি বুঝি না কেনো! বাবা কী ভয় পায় নাকি সমঝে চলে সবাইকে?

সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে এসে দাদীর রুমে গিয়ে খাম ধরিয়ে দিলেন, দাদী ছেলেকে প্রাণভরে দোয়া করতে লাগলেন, এই রুমে আসার আগে আমি দেখেছি মাকে বাবার হাতে টাকা দিতে– বাবা সেটা কেনো দাদীকে বলেননি, সেটাও বুঝলাম না। সবার কাছে ভালো হবার জন্যে? বড়দের অনেক বিষয়ই আমি এখনো ঠিক বুঝি না, যেমন শুনেছি সেজো চাচা নাকি মায়ের বিয়ের পর মায়ের কাছে থেকেই পড়েছে, কিন্তু ঈদ ছাড়া কখনো ফোন দেয় না, আমার দাদীবাড়ির কেউই কখনো মাকে ফোন দেয় না, বাবাকে ফোন দেয় তাদের দরকারে। সবার ছোট চাচাকে ব্যবসা করার জন্য বাবা-মা কয়েকবার টাকা দিয়েছে, কোনো ব্যবসাই টিকে না, দাদী আর চাচা উল্টো বলে পুঁজির অভাবে নাকি এমন হয়।

“অর্থীর জন্য বাসায় একজন টিচার রাখতে চাচ্ছি, ব্যাচে পড়লেও তেমন ইম্প্রুভ দেখছি না, একজন পড়লে বেশি খরচ, তাই দুইজন মিলে পড়ুক, আট হাজার করে একজনের পড়বে”
“আমরা নিজেদের পড়া নিজেরাই করেছি, আর সন্ধ্যার পরে আমি তো বাসায়ই থাকি, আমার কাছে পড়লেই পারে!”
“পড়ায় অনেক চেঞ্জ এসেছে, আগের সাথে বাচ্চাদের পড়া মিলাতে যেও না আর অফিস থেকে ফিরে তুমি টিভিতে টক শো আর সারা দুনিয়ার খবর নিয়েই ব্যস্ত থাকো!”
“আমি চাকুরী করে সংসারই দেখি আর রিলাক্স বলেও একটা ব্যাপার আছে!”
“হুম, আমি যা আয় করি, সেটা দিয়ে বন্ধু-বান্ধব আর শাড়ি–গহনা কিনে উড়াই, তাই না?”

আমি নিঃশব্দে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলাম, মাঝে মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার, আগে এমন পরিবেশ বাসায় ছিলো না। তিন বছর আগের সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে —
“বিয়ে হওয়া অব্দি সংসারের ঘানি টানছো, ভালোই পুরষ্কার দিলো তোমার পরিবার!”
“আহ, নীরু, হয়তো ভেবেছেন আমরা দুজনেই চাকুরী করি, তাই বাড়ির হিস্যা আর সামান্য জমি না দিলেও চলবে, তুমি সহজভাবে দেখো!”
“দুই বাচ্চাকেও কেউ কখনো কিছুই দেয়নি, মা কিভাবে বঞ্চিত করলেন? বিয়ে হবার পর থেকে তোমাদের সব বিপদে –আপদে আমি পাশে দাঁড়িয়েছি, আজ সেটার পুরস্কার পেলাম, স্বার্থপর সব!”
“আমি তো সংসারের বড় ছেলে, বাবা নেই, আমাকে সবাইকেই দেখতে হয় নীরু”
“পরিবার হলে তাদেরকেও দেখা দায়িত্বের মাঝেই পড়ে, নিজের বউ, বাচ্চাকে বঞ্চিত করে এতোই যদি দায়িত্ববান হতে চাও তাহলে বিয়ে করলে কেনো তুমি? কারো বিয়ে, কারো বাচ্চা হবে, কারো ঈদের সময় শ্বশুরবাড়িতে জিনিস পাঠাতে হবে –দায়িত্ব, দায়িত্ব আর দায়িত্ব! গত ২০ বছর ধরে টেনেই চলেছি, আমার কথা বাদ দাও, দুই বাচ্চাকে কেউ কিছু দিয়েছে, কখনো সেটাও মনে পড়ে না আমার!”

তারপর থেকেই শুরু হলো এই যন্ত্রণা, বাবা প্রতি ঈদে বাড়ি চলে যায় একাই, মা আমাদের নিয়ে ঢাকা থাকেন, আমরা বাবা ছাড়াই ঈদ করি। মা যখন বলে—“অর্থী মন দিয়ে পড়ো, তোমাকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে”,
আমার ইচ্ছে করে মাকে বলি — “তুমি কি পেরেছো ভাগ্যটা বদলাতে?”

বাবার জন্যেও মায়া লাগে, তাকে সিঁড়ি করে সবাই আখের গুছালেও বোকা বাবা সেটাকে দায়িত্ব ভেবেই বসে আছে! সামান্য একটা সিদ্ধান্ত — সেটা ভুল না সঠিক আমি জানি না—আমাদের পরিবারে ঝড় নিয়েই এলো, বাবা বলেন, মা স্বার্থপর, মা বলেন — দাদা বাড়ির সবাই স্বার্থপর! আমি আর বাবু নিশ্চুপ হয়ে দেখি, অথচ সামান্য ছাড় দিলে হয়তো মায়ের ভেতরে অভিমান জন্মাতো নাহ। মা গাছ ভালোবাসে –প্রতিদিন গাছে পানি দেয়, যত্ন নেয় –দেখে মনে হয় ভালোবাসাটাও একতরফা হয় না —একে যত্নে রাখতে হয়। সবকিছু দেখে মনে হয় –স্বার্থে মনে হয় সবাই স্বার্থপর হয়!

১/৩/১৯

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 955
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    955
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.