‘আছিরুন কিংবা দুঃখনামা’

0

লাবণ্য সায়মা রহমান:

পর্ব ১

ওই যে দূরের এক গাঁয়ে, ওই যেখানে পানকৌড়ি টুপ করে ডুব দিয়ে ওঠে। ডাহুক ডেকে যায় কী ব্যথায় গভীর রাতে, রাখাল সাঁঝের বেলায় হাট্ হাট্ শব্দ করে দ্রুত পায়ে গরু নিয়ে গোয়ালের দিকে ছোটে। কুররু রুম ক্রুক বলে সোহাগী সাদা কবুতরগুলো দেমাগী সুখে ডানা ঝাপটায়, যেখানে বেগুনী জারুল ফোটে বসন্ত কালে। যেখানে দুপুর রোদে গা ভেজায় কামরাঙা আর ডালিম ফল, হু সেই গাঁয়ের নাম নবীপুর।

নবীপুর হবিগঞ্জের এক অনামা ছোট্ট গ্রাম। একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই সেখানে। সে গ্রামে মানুষেরা তখনও আটপৌরে জীবন যাপন করে, এখনকার মতো মোবাইল কিংবা অন্তর্জালে আসক্ত হয়নি। সেখানে তখনও বাস করতো ছমিরন, আইতুন, আকিকুন নামের মেয়েরা। সেখানে শরতের ভোরে শিশির স্নাত কচি নরম ঘাসে নি:শব্দে শিউলি ফুল ঝরে পরে টুপটাপ। নদীতে মাঝিরা নাও ভাসিয়ে চলে যায় কতো কতো দূরের গন্তব্যে। সে গাঁয়ে শান্ত শীতল সবুজের সমারোহে বড় হতে থাকে একটা প্রাণ।

সায়মা লাবণ্য রহমান

ওই গ্রামে বছর বছর গাভী যেমন বিয়ায়, তেমনি বছর না ঘুরতেই পোয়াতী হয় নছিমন বানু। এক, দুই, তিন গুনে গুনে একদম গুনে গুনে গাভীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেও বিয়ায় বাচ্চা। বিয়ের সাত বছরে পঞ্চম বার গর্ভবতী হলে তেইশ বছরের শরীরটা আর পেরে ওঠে না। ঝিমায় নছিমন সারাদিন, কাহিল কাহিল সন্ধ্যা সকালগুলো তবু পার করতে হয় কখনো ধান ভেনে কিংবা গরুর গামলায় ভুষি ভিজিয়ে। আবার লাকড়ির চুলায় ঝাঁঝালো আঁচের সঙ্গে থেকে থেকে নছিমনের নিজেকে মনে হতে থাকে আগুন, নয়তো পোড়া লাকড়ির কয়লা।

পর্ব ২

তখন শ্রাবণমাস, আট মাসের ভারী শরীর নছিমনের, বিয়ানবেলা থেকেই আসমান আন্ধার করে ঝর ঝর বৃষ্টি ঝরছে। রোদ ওঠার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বেহায়া বৃষ্টি ঝরছেই অবিশ্রাম। হাম ম্ ম্বা আ, ম্যা হে হে হে হে হে শব্দে নছিমনের দুটো গরু আর তিনটে ছাগল কাঁদছে ক্ষুধায়। ওর বাচ্চা চারজন ছয়, চার, তিন ও দুই বছরের, ঘরেই রাখা পান্তা খেয়ে শান্ত মেজাজে আছে। হউরি ডিম ভাজা দিয়ে পান্তা খাবে, পাকের ঘরটা মূল ঘরে থেকে বেশ একটু দূরে এই বৃষ্টিতে চুলা ধরাবে কী করে?

বুড়া হউরি বক্ বক্ করে চলেছে আপন মনে বৃষ্টির তালে তালে তেমনি অঝোরে। ‘নুডির গরও নুডি, মাঙডার গরও মাঙডা, অহনও আন্ডা বাজে না ক্যারে আমার লাগি? হিদা গেলেগা গো হাইতাম না ত দেরি অইলে। তুই হাইবি নুডি মাগী, নাইলে আন্ডা বাজি গোয়ার ভিত্তে হান্দায়া দিমু। আমারে অহনও চিনছস না নুডির ঝি’। এই গালিটা দেবার পর নছিমনের জেদ চেপে যায়, যতো খুশি গাইল পাডুক, কিন্তু মা বাবা তুলে বকলে মাথায় চাঁই করে রক্ত উঠে যায়।

গোবেচারা স্বামীটা নিজের বৃদ্ধ মাকে কিছু বলতে পারে না, অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে পোয়াতি বউয়ের দিকে। এবার নছিমন ভারী শরীরটাকে নিয়ে চলে পাকের ঘরের দিকে। পা ফেলে সাবধানে, পিছলে না যায় আবার। ইস্ শেষ রক্ষা কী হয়! ছপাত প্যাকের মধ্যে পা পড়ে আর অমনি সরাৎ করে পিছলে যায় নছিমন, বুঝে ওঠার আগেই বহু দূরে ছিটকে গিয়ে কোমরে ব্যথা পায়। চিৎকার দিতে দিতে ‘আল্লাগো ……ও আল্লা’ বলে জালালী দোয়া পড়া শুরু করে, লা ইলা হা বলা শেষ না হতেই জ্ঞান হারায়।

পর্ব ৩

লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সবকিছু, সব। নছিমন আছরে পড়ে কোমরে আঘাত পাবার পর পরই পেটের পানি ভেঙ্গে যায়, ঝপাৎ করে এক কলস মতো পানি আচানক বেরিয়ে আসে পেশাবের রাস্তা দিয়ে। সুরুজ মিয়া চিৎকার শোনার সাথে সাথে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে।লম্বা কদম ফেলে মুহূর্তের মধ্যে পাঁজাকোলা করে তুলে আনে কর্দমাক্ত এবং স্রাব মিশ্রিত ভেজা নছিমনকে।

নছি, ও নছি বলে ডাকলে একটু সাড়া পায় বউটার। শুধু বলে, ‘দাইরে খবর দেও ব্যাদনা উঠছে, বলেই আবার কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে যায় নছিমন। ‘এমুন কু আলামত ‘ দেখে নছিমনের হউরি অজিফা বেওয়া নিশ্চুপ হয়ে যায়। একটু আগে খিদার জ্বালায় বউটাকে কতোই না গাইল দিলো, এখন মায়া লাগছে বউটার জন্য।

ঘন আঁধার মেঘে ঢাকা আকাশটার রোদন কমলো তখন দুপুর সময়টায়, বিলম্ব করেনি এক্কেবারে এক ছুটে দাইকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে যায় সুরুজ মিয়া। দাইয়ের নাম বেঙ্গির মা, বায়না হয়েছে টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে সময়টা যখন কুজ্ঝটিকাময়। গামলা ভরা গরম পানি , পরিষ্কার কাপড় আর নতুন ব্লেড নিয়ে ছটি ঘরে ঢুকে যায় বেঙ্গির মা ও নছিমন।

ধড়াম ধড়াম বাজের আওয়াজ আর ফরৎ ফরৎ বিদ্যুতের চমক হচ্ছিলো একটু পর পর বাচ্চাগুলো ভয়ে গুটি সুটি হয়ে দাদীর পাশে বসে আছে, অজিফা বেওয়া ততক্ষণে তসবিহ পড়তে শুরু করেছেন। আবার আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো সেই গ্রামে। অধৈর্য নিয়ে তবু ট্যাকার কারণে অপেক্ষমান দাই, ছটফট ছটফট ব্যথাকাতর নছিমনের চিৎকার সুরুজ মিয়ার মনটাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখছিলো।

সন্ধ্যা ঘনায় যখন, তখন বৃষ্টিটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। ক্ষুধার্ত ও শুষ্ক ওদের সকলের মুখ টিমটিমে কুপির আলোয় আরও ম্লান দেখায়। সে বাড়িটায় শুধু শোনা যায় বেঙ্গির মায়ের ধমকা ধমকি, ‘চিল্লাইও না বেটি চিল্লাইও না, কোঁত দেও আরও জোরে কোঁত দেও’।

পর্ব ৪

জীবন কতোটা যন্ত্রণা এবং নিষ্ঠুর, দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়াটা যে আজন্ম লব্ধ পাপ, সেটা জানার জন্য এক স্যাঁত স্যাঁতে ভর সন্ধ্যা রাতে ভূমিষ্ঠ হলো আছিরুন। হায় নছিমনের রক্তপ্রবাহ আর তো বন্ধ হয় না! বেঙ্গির মা উঁচু কণ্ঠে ডাকতে থাকে ছটি ঘর থেকে, ‘ও সুরুজ মিয়া, সুরুজ মিয়া, তোমার বউয়ের অবস্থা বেগতিক গো!’ জলদি সদরে নিতে হইবো নাইলে শ্যাষ! ‘ক্যামনে নিবো এতো জলদি?’ ভেবে সুরুজ মিয়া অকুল পাথারে পড়ে, হিচকি তুলে কাঁদতে থাকে।

নছিমনকে বুঝি আর বাঁচানো গেলো না।

আছিরুন মাকে হারায় ভূমিষ্ঠ হবার পর পরই। যথা সময়ের আগে চলে আসার কারণে বুদ্ধি বা হাঁটা চলা কিছুই সময়মতো হয়নি ওর। বাড়ির সবার ছোট হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটা বড্ড অবহেলা, অযত্নে বড় হতে থাকে। কিছু পেতে চাইলেই ওর ভাগ্যে জোটে গাল মন্দ। প্রতিবন্ধী বলে ওকে ডাকে সবাই ‘ব্যাহা’ বলে। চর থাপ্পরকে আছিরুন বোঝে খুবই স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে।

এমনই তো হয় কিছু চাইলে তাই কাঁদে না মেয়েটা। কতো না পুতুল পেতে চায়, একটা সুন্দর জামা পেতে চায়, বড় ভাই বোনদের ছেঁড়া কাপড়গুলো ওর জন্য বরাদ্দ থাকে বছরকে বছর। খাবার জোটে উচ্ছিষ্ট আর এঁটো, বড়জোর সকালের পান্তাটা আর সবার মতো।

নছিমনের মৃত্যুর পর বছর না পেরোতেই সুরুজ মিয়া সাঙ্গা করে আরেক গরীব ঘরের মেয়ে হাওয়া বিবিকে। হাওয়া বিবির কোলে আসে আরো দুই সন্তান। অথর্ব আছিরুনের প্রতি সদা নির্দয় থাকে হাওয়া বিবি, দুই চক্ষে সহ্য করতে পারে না ওকে। কোন কারণ ছাড়াই গায়ে হাত তোলে, পারে না শুধু একেবারে মেরে ফেলতে। আছিরুন স্কুলে যায় না, সারাদিন বাড়ি থাকে আর প্রতিক্ষণে নিগৃহীত হয়, ওই ক্ষণে লাথ্থি, তো পরক্ষণে কিল থাপ্পর। কেউ কখনো আদর করে না আছিরুনকে, কখনোই না।

ক্রমশ:

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

লেখাটি ২৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.