মাদারহুড ও রিগ্রেটিং মাদারহুড নিয়ে কিছু কথা

0

সুপ্রীতি ধর:

আমার এক বন্ধু তাহমিনা রশীদ, সে লিখেছে, ‘আমার আত্মীয় এক তরুণী ক্যান্সার পেশেন্ট। হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। শরীর অতি নাজুক, কিমো নিতে পারবে না। ডাক্তার তাই তার ওভারি ফেলে দিবে। আমার মেয়ে আমাকে বলে যে, মা, ওকে সান্ত্বনা দাও, সে খুব আপসেট। জীবনে মা হতে পারবে না আর। মেয়েটির মা-ও খুব কান্নাকাটি করতেছে। প্লিজ কথা বলো। ক্যামেরার সামনে এসে তরুণীর নাম ধরে বললাম, বাহ্, তুই তো খুব লাকি রে, আমার ড্রিম লাইফ নিয়া বাঁচবি। তোকে কিমো দিতে হইতেছে না, আমি খুব খুশি। ও বলে, ফুপি, ড্রিম লাইফ কেন? আমি বলি, এই যে পোলাপান নিয়া ঝামেলা, খুশি, কোনটাই থাকবে না। রাত জাগতে হবে না, হোম ওয়ার্ক করাতে হবে না, সন্তানের স্কুলের জন্য কোথাও যাওয়া বন্ধ করতে হবে না। দেশ-বিদেশ অফ পিকে ঘুরতে পারবি, যেখানে রাইত, সেখানে কাইত হতে পারবি, কী মজা! কতগুলা জীবনের দায়িত্ব, টেনশান নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াবি না। আমার ভাতিজি হা হা করে হেসে উঠে। বলে, এই কথাটাই আম্মাকে বলো’। (বন্ধুর স্ট্যাটাসটা ঈষৎ সংশোধন করে দিলাম বানানসহ)

সামান্য দুই-চার লাইনের একটা স্ট্যাটাস, কিন্তু ভীষণ গভীর এর মর্মার্থ। তাহমিনা আরও লিখেছে, “আমি আসলে সান্ত্বনা না, মনের কথা, নিজের কথা বলছি। মেয়ে সুখে আছে, ছেলে সুস্থ আছে, তারপরও শিকল লাগে। দায়িত্ব ভালো লাগে না। পালানোর টাইম, স্কোপ নাই। কত কিছু করার ছিল। সিম্পল করে বলি, ছেলের স্কুলের জন্য দেশের বই মেলায় গেলাম না, বাবার কাছে তাকে রেখে গেলেও গিল্ট ফিল করি। ভাতিজি অসুস্থ কানাডায়, তার চিকিৎসার সময় থাকবো, টিকেট করা। নাতি আর ছেলের জন্য নড়তে পারবো না’।

অধিকাংশ মা-বাবাই স্বীকার করবেন যে, সন্তান হচ্ছে প্রচণ্ড একটা হার্ড ওয়ার্ক, কিন্তু এর প্রতিদান যা মেলে তা চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রায় সময়ই অস্বীকার করে। প্রতিটি মানুষই চায় মা বা বাবা হতে, এটাই স্বাভাবিক এখন পর্যন্ত। এর বাইরে অন্য কোনো চিন্তাভাবনাকে এখনও সমাজ স্বীকৃতি দিতে নারাজ। কেউ মা হতে চায় না, এটা যেন ভাবনারও অতীত। ফলে যে মেয়েটি মা হতে পারে না, সে যেমন একটা বিশাল বোঝা আজীবন বহন করে চলে, নিজেকে অভিশপ্ত ভাবে, তেমনি যে মেয়েটি স্বেচ্ছায় মা হতে চায় না, বা নিজেকে মাতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করে না, অথবা নিজে কোনো দায়িত্বের মধ্যে জড়াতে চায় না, তাকেও সমাজ সহজভাবে নেয় না। এই সব রকম চরিত্রই কিন্তু আমাদের আশেপাশে আছে, কেউ দেখতে পাই, কেউ পাই না।

পাশ্চাত্যে এখন রিগ্রেটিং মাদারহুড বলে একটা গবেষণার কাজ হচ্ছে। ফিনল্যান্ডে আমার এক সতীর্থ এই কাজের সাথে যুক্ত। তার সাথে পরিচয় হয়েছিল একটা রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে বার্সেলোনাতে গিয়ে। ওই প্রোগ্রামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গবেষক, একাডেমিক এবং মানবাধিকার কর্মীরা এসেছিলেন, মোট একমাসের প্রোগ্রামে সবার সাথে সবার ভাববিনিময়, কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করার চমৎকার এক সুযোগ।

রিগ্রেটিং মাদারহুড হচ্ছে ফেমিনিজমের নতুন ধারা।

গবেষণায় বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদারহুড বা মাতৃত্বের নেতিবাচক আবেগগুলো নিয়ে আলোচনা বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। নেতিবাচক আবেগ বলতে দমবন্ধ পরিবেশ, হতাশা এবং ক্লান্তিকে বোঝানো হয়েছে। রিগ্রেটিং মাদারহুডও মানুষ ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে শুরু করেছে, অথচ কিছুদিন আগেও এটি ছিল সবচেয়ে অনুচ্চারিত একটি বিষয়, লুকানো এবং যতোদূর সম্ভব একে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

ফিনল্যান্ডে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় সেইসব ফিনিশ নারীদের অভিজ্ঞতা এবং আবেগকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যারা তাদের মাতৃত্ব নিয়ে দু:খ প্রকাশ করেছেন, যারা মা হতে চাননি, যারা বলেছেন, জীবনে আরেকটিবার সুযোগ পেলে তারা কখনই আর মা হতে চাইতেন না। গবেষকরা বলছেন, তারা বিশেষ করে দেখতে চেয়েছেন যে কীভাবে এবং কেন এই মা হতে না চাওয়ার বোধকে সমাজ ধামাচাপা দেয়, আড়াল করে। সেইসাথে এই অদৃশ্য দু:খবোধ, হতাশা যখন দৃশ্যমান হয় সমাজে, তখন এর ফলাফল কী হয়, আলোচনা-সমালোচনায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে এর। গবেষকরা অনলাইনে এ নিয়ে একটা জরিপ পরিচালনা করেন।

একজন নারী বলেছেন, ‘আমি যদি ঘড়ির কাঁটা উল্টাতে পারতাম, তবে কখনও সন্তান নিতাম না। ওই নারীর বয়স পঞ্চাশের ঘরে। তার তিন সন্তান, সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৭ বছর। এবং মাতৃত্বের পুরো সময়টা ধরেই তিনি সিঙ্গেল মাদার ছিলেন, এবং এখনও তাই আছেন।

তিনি আরও বলেন যে, ‘এমনও অনেক সময় গেছে যখন আমি অন্য কারও দায়িত্ব নেয়ার মতোন নিজেকে যথেষ্ট দায়িত্বশীল অনুভব করিনি, অথচ ছোট ছোট মানুষগুলোর বেঁচে থাকার জন্য আমাকেই দরকার ছিল। এটা এমন একটা অনুভব, যার কোনো শেষ নেই, এক মুখে খাবার দিয়েছি তো আরেক মুখে দুধের বোতল তুলে দিয়েছি। এটা কোনো জীবন হতে পারে?’

‘কখনও কখনও চিৎকার করে কাঁদতে চাইতো মন। তবে কেউ যদি সত্যি সত্যিই মা সুলভ হয়ে থাকে, তবে তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট থাকা লাগে, কিন্তু কেউ তা না হলে পুরোটাই একটা ট্র্যাপ ছাড়া কিছুই না’।

একজন নারী স্বীকার করেন যে, তিনি কখনও ভাবেননি যে সন্তান ধারণের বিষয়টি এতোটাই ক্ষতিগ্রস্ত করবে তার জীবন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে’। তবে এও বলেন যে, এতোসব কথা বলে আবার নিজের ভিতরেই একটা অপরাধবোধে ভুগছেন, কারণ তিনি তার সন্তানদের খুব ভালোবাসেন। তার মতে, সবসময় তোমাকে একটা অপরাধ তাড়া করবে যে তুমি ভালো মা হতে পারোনি, এই অনুভব থেকে মুক্তি নেই। কিন্তু জীবন তো এভাবে চলতে পারে না। একটাই মাত্র জীবন, হারলে হবে? হবে না। নিজের স্বাধীনতাও বিকিয়ে দেয়া যায় না, আবার সন্তানদেরও জীবন আছে, পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সেই জীবন পাবার। সব মিলিয়ে আসলে কোনো সিদ্ধান্তেই আসা যায় না।

একজন নারীর জন্য এটা স্বীকার করা খুবই কঠিন, ‘কারণ লোকজন ধরেই নেয় যে, তুমি মা হওয়াকে মেনে নিচ্ছো না মানেই হচ্ছে, তুমি মোটেও ভালো মানুষ নও’। গবেষণার কাজে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই বলেছেন, তারা একই মনোভাবাপন্ন নারীদের জানতে আগ্রহী, যারা নোংরামি বা সমালোচিত নন। রাসেল নামের একজন বলেছেন, তিনি নিজে খুব একা বোধ করেন। সবসময় তার মনে হয় যেন কিছু একটা ভুল করেছেন তিনি। এ বিষয়ে যদি তিনি কথা বলতে পারতেন খোলামেলা ভাবে এবং কাউকে পেতেন যে কিনা তাকে বুঝতে পারবে, তাহলে হয়তোবা মাতৃত্বের সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি তার কাছে সহজ হয়ে উঠতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, কষ্টটা তাকে একাই পার করতে হচ্ছে। এই অনুভূতি একাকিত্বের অনুভূতি। এটা মারাত্মক।’

ওপরে গবেষণার প্রসঙ্গ এবং উদাহরণগুলো দিলাম এ কারণেই যেন সহজেই আমরা বুঝতে পারি নারী মানেই মা হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের জরায়ুর স্বাধীনতা নারীর নিজের। কাজেই সে তার জরায়ুতে সন্তান ধারণ করবে কি করবে না, এটা বুঝতে পারাটা মা হয়ে যাওয়ার পর দু:খবোধে ভোগার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের। অথচ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে নারীর জীবন ওই চার শিকেতেই বন্দী হয়ে যায় এবং মাতৃত্ব তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে সারা জীবনের মতো, যেখান থেকে তার আর কোনো মুক্তি নেই। একবার মা হয়েছো তো গেছো সারা জীবনের জন্য! তোমার আর ভালো লাগা, মন্দ লাগা থাকবে না, তোমার স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না, আসলে তোমার আর কোনো জীবনই থাকবে না। জীবনভর তোমাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে তোমারই অপ্রাপ্তিগুলো, তোমার বছরের পর বছর নির্ঘুম রাতগুলো, পরাধীনতার দিনগুলো।

একবার মা হয়ে গেছো, আর তোমার মুক্তি নেই। তোমার দমবন্ধ হয়ে আসুক, গলায় ফাঁস লাগা অনুভূত হোক, মাতৃত্বের দায় তোমাকে শোধ করতেই হবে। আমাদের এই উপমহাদেশে নিয়ম যখন এতোটাই কঠোর এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধে আবদ্ধ, তখন এর ব্যত্যয় মাঝে সাঝেই ঘটে, তখন চারদিকে ঢিঁ ঢিঁ পড়ে যায় গেল গেল বলে, সেই মেয়েটির কপালে তখন কলংকের তকমা জোটে। সমাজ তাকে কুলটা বলে, ডাইনী বলে, আরও একধাপ এগিয়ে ‘বেশ্যা’ বলে ডাকে। অথচ পুরুষ সঙ্গীটি কিন্তু দিব্যি দায়িত্ব কাটিয়ে যেতে পারে, সমাজ তাকে কলংকিতও করে না, এমনকি বাধ্যও করে না বেশিরভাগ সময়ই।

নারী জীবনের ধারাটিই এমন, সে চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারে না এই দায়িত্ব, এই সম্পর্ক। দিনশেষে সেই মা যদি ‘ভালো মা’ না হয়, তবে খারাপ মা হয়েই দিন কাটায়। সন্তানও তাকে ছাড় দেয় না কোথাও। সুদে-আসলে উসুল করে নেয় সব।

বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে, নারী জীবনও সেখানে পিছিয়ে নেই। নানারকম ভাঙাগড়া চলছে সেই জীবনে, ঠিক তখনও আমরা বাল্যবিয়ে চালু রেখে বাচ্চা পয়দা করার মধ্যেই নারী জীবনের সার্থকতা খুঁজে ফিরছি। এমনকি বাল্যবিয়ে না হলেও, মেয়েরা শত শিক্ষিত হলেও সমাজের সব শ্রেণীর নারীর মাঝেই অসম্ভব রকমের একটা মিল আছে, সেই মিলটা কষ্টের, বৈষম্যের, বঞ্চনার।

সম্পাদক: উইমেন চ্যাপ্টার

নোট: এ বিষয়ে আরও আলোচনা চলতে পারে। যে কোনো লেখা গ্রহণযোগ্য। 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৫,৪৬৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.