বিপ্রতীপ সময়

0

সুচিত্রা সরকার:

‘আরে! তাই নাকি! গুড নিউজ’! ‘সুসংবাদ’। ‘দিদি, কী ভালো খবর! মিষ্টি খাওয়ান’!
যারা বলছে হয় তারা বধির, অন্ধ অথবা তাদের সয়ে গেছে। তাই এই খবরটাকে তারা সুসংবাদ মনে করছে।
আমি করছি না। আমি ভীত, সন্ত্রস্ত।

প্রথমে রিকশা। তারপর নৌকা, অটো বাইক। তারপর প্রায় অজ: একটা গঞ্জ থেকে দুধ কেনা হয়। প্রায় বিশ কেজির মতো খেয়ে ফেলেছি এরই মধ্যে। আজ শুনলাম, সেটায় প্রচুর পরিমাণে কেমিক্যাল মেশায়!

জানি না তার অবস্থা কী!

ডাক্তার বলেছে, প্রতিদিন ফল খেতে। অন্তত তিনবার। কেউ গ্যারান্টি দিতে পারবে না, ফলগুলোয় কোনো বিষ নেই! নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে। এবং খবর হচ্ছে এই প্রায়ই খবর বেরোয়, নকল ওষুধে শহর ছেয়ে গেছে।

সুচিত্রা সরকার

পেটের জন্য, পিঠের জন্য, জীবনের জন্য কিছু একটা করে খেতে হয়! অনেক দূর যাতায়াত প্রতিদিন। গণপরিবহন বলতে যা বোঝায় এই ঢাকায়, বেঁচে ফিরতে পারবো না বাড়িতে! অগত্যা উবার- পাঠাও। গাদা গাদা টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।

যত বড় ডাক্তার, তত বড় সিরিয়াল। প্রতি রোগীর জন্য সময় মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড! সদা কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষের জন্য এ বড় মুশকিল! ভবিষ্যৎ ভেবে রেখেছি, অপারেশন না লাগলেও করিয়েই ছাড়বে।

এস আলম গ্রুপের কাছে সরকার অনেক টাকা পায়। এদেশের কৃষকরা চাষের জন্যও সরকার থেকে ঋণ নেয়। এস আলম গ্রুপের ঋণ মওকুফ হয়ে যায়। দেনার দায়ে কৃষকের নামে মামলা হয়।
গতকাল মতিঝিল- পল্টন থেকে ২৭ জন্য হকারকে থানায় নিয়ে গেছে। অথচ এরাই থানা, এলাকার মাস্তান, লীগদের চাঁদা দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে বেচা- বিক্রি করে দিনভর- বছরভর!
ইয়ারা ব্যবসায়ী রাজ্য চালানোর ভার পায়!

চক বাজারে সত্তুরের উপর লাশ। প্রতিটি লাশের গায়ে কত নিবিড় করে সেঁটে আছে গল্প! এর দায় কার! আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক কারখানা যার, তার? নাকি রাষ্ট্রের? নেপালে বিমান দুর্ঘটনা হলে তিন দিনের শোক হয় রাষ্ট্রের। কত শত মোমবাতি জ্বলে আর নেভে! চক বাজারের বেলায় ঠুলি চোখে!

এক কালে আন্দোলন ছিল মহান কিছু! এক কালে দেশাত্মবোধক গানগুলোর গায়ে কান্না লেগে থাকতো। আজ জনগণকে জিম্মি করে আন্দোলন চালায় ক্ষমতালোভীরা, নিজেদের স্বার্থে। সময়ে সময়ে দেশাত্মবোধক গানের তালে চলে তাদের ডিজে নেত্ত (নৃত্য বলতে নারাজ)!

আমার শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েই দেখবে আত্মীয় বলে কিছু হয় না! নিজেদের মধ্যে নিজেরা রেষারেষি করি। কখনো মারামারি!

আমার শিশু অ আ শিখেই দেখবে, তার মায়ের কাল ঘাম ছুটছে- স্কুলে স্কুলে দৌঁড়িয়ে! কোন স্কুল ভাল! কোন স্কুলে আসলেই পড়ায়! কোন স্কুল মানবিক হতে শেখায়! কোন স্কুলে পড়লে সত্যিকার মানুষ হবার মন্ত্র পাবে শিশু!

আমার শিশু দেখবে, তার মা কাঁদছে- ওরকম একটা স্কুল না পেয়ে। ভর্তি হতে ঘুষ! পাশ করতে কোচিং। আরো ভাল নম্বর পেতে উদয়াস্ত খাটুনি! সেখানে বিদ্যাশিক্ষা হচ্ছে ছাতার মাথা! শিশুরা ছোট থেকে বড়দের অন্যায় দেখতে দেখতে তাদের অশ্রদ্ধা করা শিখছে। এবং আন্দোলনে তারা বড়দের হাতের ‘মধ্যমা’ দেখাচ্ছে!

এ বড় লজ্জার উত্তর প্রজন্মের কাছে! এ বড় গ্লানির!

তাহলে কেন আমি খুশি হবো এরকম খবরে? কেন এ খবর সুসংবাদ! তাই আমার কাছে এ খবর চরম ভীতিকর।

সুকান্ত পারেনি শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী এনে দিতে। সুকান্ত গেছে অনেক কাল আগে। আমিও পারিনি!

আমি জানি, এরকম অবিচার, অন্যায় পরিবেশে একটা শিশু ভালো কিছু পাবে না। কোনো চান্স নেই। তারপরও যদি সে ভালো কিছু পায়, ভালো মানুষ হয়, তবে সেটা হবে নিপাতনে সিদ্ধ! বাই চান্স!

তাই আমি খুশি নই। আনন্দিত নই। আহ্লাদিত নই।

আমার শিশু যদি জন্মের পর সব দেখে জানতে চায়, কেন এ পৃথিবীতে তাকে আনলাম, কোনো উত্তর নেই আমার কাছে! যদি পৃথিবীতে আসার জন্য সে আমার কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে, কী দিয়ে তার ক্ষতি পোষাবো আমি?

আমার কোনো যোগ্যতা নেই তাকে আহ্বান করার! কোনো অধিকার নেই! নিষ্পাপ শিশুর ক্ষতি করবার সাহস নিয়ে জন্মাইনি আমি!

২৪.২.২০১৯
১২.৪৯ মিনিট
দারুস সালাম, ঢাকা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 109
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    109
    Shares

লেখাটি ৫৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.