অনুর্বরা

0

লাবণ্য সায়মা রহমান:

পর্ব ৫

এখন হাস্নাহেনা জন্মদিনের পার্টি, বিয়ের অনুষ্ঠান বা কুলখানি কোথাও গিয়ে স্বস্তি পায় না। যে কোনো নিমন্ত্রণ এলে মুখটা বিষন্ন হয়ে যায়। লোক সমাজে গেলে সেই এক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না ওর। একই প্রশ্ন, ‘ভাবী বাচ্চা নিবেন না? দেরি কইরেন না, তাড়াতাড়ি লইয়া ফালান’। কেউ কেউ আবার বলে ‘বাচ্চা না হলে স্বামীকে কিন্তু বাঁধতে পারবেন না ভাবী’।

আহা মহিলাগোত্র একত্রিত হলে তাদের কথার ফুলঝুরি ফোটে। শাড়ি গহনা ম্যাচ করা ব্লাউজ এসব প্রসঙ্গ ফুরোলে শুরু হয় বাচ্চা পর্ব। কেউ বলে ‘আর বইলেন না ভাবী বাচ্চাটা আমার কিচ্ছু খায় না’। অথচ কিন্তু তার নাদুস নুদুস বাচ্চাটা ঘুরছে ফিরছে আশে পাশে। আরেক ভাবী বলে উঠলেন, ‘জানেন, প্যাম্পার্স পরা বাচ্চা হেঁটে গেলে আমার যে দেখতে কী ভালো লাগে, পাছাটা ভারী ভারী করে গুর গুর করে, ইস্ কত্ত সুন্দর লাগে’।

লাবণ্য সায়মা রহমান

কথা ফুরায় না যেনো ভাবীদের। কার স্বামী কতোটা বাচ্চাদের যত্ন করে তারও একটা হিসেব চলে সেসব আড্ডায়। সবকিছু যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয় হাস্নাহেনা বোঝে তা, তবু মাঝে মাঝে বলে উঠতে ইচ্ছা হয় এতো আদেখলাপনা কেনোরে বাবা? এতো বকর বকর করার কী দরকার! বাচ্চা নিয়ে এতো কেনো মাতম? আবার মনে মনে লজ্জা হয়, ছি ছি অন্য মানুষের অনুভূতিকে সে কেনো খাটো করে দেখছে?

পর্ব ৬

হাস্নাহেনার বিয়ের আট বছর হয়ে গেলো হায় হায়, কোনো খবর হলোনা এতোদিনেও? বাতেন আলী এতো যৌতুক নিয়েছিলেন যে চক্ষু লজ্জায় বউকে তালাক দেওয়ার কথা ভাবত পারেন না। কিন্তু পরিবারের চাপ আছে লোকটার, চুপে চাপে নিকট আত্মীয়রা বলে, ‘এই বাজা বউ ছাড়ান দে’ বাতেন আলীর অনেক মায়া হয় বউটার জন্যে। কতো সুন্দর সংসার গোছায়, কী ভালো যে রাঁধতে পারে, সেলাইয়ের কাজ জানে হাস্নাহেনা। বাতেন আলী চিন্তায় ডুবে থাকেন।

একদিন হঠাৎ পাসপোর্ট আর ইন্ডিয়ান ভিসা নিয়ে এসে বউকে বলেন, ‘চলো বউ, যা আছে কপালে’। শেষ চেষ্টাটা করতে চান বাতেন আলী। শুনেছেন ওখানে খুব নাকি ভালো চিকিৎসা আছে, বন্ধ্যা মেয়েরা নাকি বাচ্চা জন্ম দেয়, টেস্টটিউব বাচ্চা। হাস্নাহেনা তাই শোনে, ব্যাগ গুছিয়ে নেয় নীরবে। কয়েক মাসের ব্যাপার, ওরা কলকাতা যাবে, ওখানে হোটেলে থাকবে।

জীবনের আরেক অধ্যায়ের শুরু হয় মেয়েটার।

হাস্নাহেনা ঠাহর করতে পারে মনে মনে কেনো তার পেটে বাচ্চা আসে না। ওই যে গর্ভপাতের পর ভীষণ অসুস্থ হয়ে
হাসপাতালে ভর্তি ছিলো, নিশ্চয়ই তারপর এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। মনটা তার চুপসে থাকে সব সময়, কতো মানত করে সে একটা যদি সন্তান পেতো! ছোট ছোট শিশুদের দেখলে কী যে মায়া লাগে হাস্নাহেনার। মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে গভীর রাতে, একটা ফুটফুটে শিশু ডাকছে মা মা মাগো। ধর্ মর্ করে উঠে বসে হাস্নাহেনা, কেঁদে কেঁদে বাকি রাত পার করে দেয় প্রায়শই।

পর্ব ৭

কলকাতায় চিকিৎসা শেষ করে ফিরে এলো ওরা ঢাকায়, তৈরি করা ভ্রুণ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিলো হাস্নাহেনার জঠরে। কতো উত্তেজনা! মনের মধ্যে অসীম আশা, সুখ আর স্বপ্ন নিয়ে ফিরলো ওরা দুজনে। টাকা-পয়সা খরচ যা হলো তা নিয়ে একটুও আফসোস করেনি বাতেন আলী। বাতেন আলী নিবিড় যত্নে রাখলো হাস্নাহেনাকে। এমনকি ঘরের কাজের জন্য আরো বেশি লোক নিয়োগ দিলেন।

চিকিৎসার অংশ হিসেবে হাস্নাহেনা উরুতে ইঞ্জেকশন নিচ্ছিলো। রক্ত পরীক্ষাও করতে হচ্ছিলো হরমোনের পরিমাণ দেখার জন্য। প্রতিবার ইঞ্জেকশনের সুঁইটা চামড়ার নিচে পুশ করতে চিন চিন ব্যথা হতো মেয়েটার, হলেই কী? বাচ্চা আসবে, তার জন্য কষ্ট করতে হবে না? ওষুধের প্রতিক্রিয়া থেকে সারা গা চুলকাতে শুরু করতো ওর, চুলকাতে চুলকাতে ঘা হয়ে যাচ্ছিলো শরীরের অনেক জায়গায়, হাস্নাহেনা সব মেনে নিয়েছিলো। তবু বাচ্চা হোক, জীবনটা সুখে ভরে উঠুক।

সুখ সুখ অনুভূতি, কষ্ট সহ্য করেও আনন্দে থাকা বারোটা সপ্তাহ ঝির ঝিরে বসন্তকালের মতো পেরিয়ে গেলো। এক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে দেখে চাপ চাপ রক্ত বিছানার চাদরে, হায় সর্বনাশ! সব শেষ! এ যাত্রায়ও রক্ষা হলো না হাস্নাহেনার।

হায় জীবন, এতো নিষ্ঠুর কেনো হলো ওর জন্য? কী কারণে প্রতারণার জালে আটকে জীবনে এমন পরিণতি হলো? মেয়েটা ভালোই বেসেছিলো তো শুধু, কোন এক নরাধমের লোভের শির হয়ে এতো ভোগান্তি জীবনে! হাস্নাহেনা কাঁদে, অঝোরে কাঁদে, ওর বুক ফাটা আর্তনাদে চার দেয়ালের ঘরটা থর থর থর কাঁপতে থাকে।

সমাপ্ত

শেয়ার করুন:
  • 74
  •  
  •  
  •  
  •  
    74
    Shares

লেখাটি ৬৫৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.