ক্ষুদে গানরাজ ঝুমা ও মিডিয়ার দায়িত্বহীনতা

Jhumaউইমেন চ্যাপ্টার: ক্ষুদে গানরাজ ঝুমাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে অনলাইন পত্রিকা নতুনদেশ এর মন্তব্য প্রতিবেদনটি উইমেন চ্যাপ্টারের মূল ভাবনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় তা পুনরায় প্রকাশ করা হলো।

“অপরিণত বয়সের শিল্পীকে বিয়ের চেষ্টা” বা “ঘরে তিন বউ রেখে অপ্রাপ্ত বয়সের শিল্পীকে বিয়ে”, “ক্ষুদে শিল্পীকে বিয়ের প্রলোভন” –এমন কতো রকম হতে পারত সংবাদগুলোর শিরোনাম! কিন্তু বাংলাদেশের কোন পত্রিকাতেই শিরোনাম হলো না- বাল্যবিবাহের বলি হতে যাচ্ছেন ঝুমা! দেশ ও জাতির দায়িত্বের ভারে স্থবির বা রগরগে-চটকদার কোন পত্রিকাতেই ঝুমার অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসল না। আড়াল করা হলো, এমন অপকর্মের মূল হোতা ঝুমার কথিত স্বামী ঢাকার আশুলিয়ার বাসিন্দা মো. ইসরাফিলকে!

ঘুরেফিরে প্রায় সব পত্রিকাতেই শিরোনাম হলো এই রকম- ‘তিন সতীনের ঘরে সুখেই আছেন ঝুমা’। ওই সংবাদে চৌদ্দ বছর বয়স্ক ‘ক্ষুদে গানরাজ’ ঝুমার শাড়িপরা ছবি প্রকাশ পেল। সংবাদের গুণে বোঝা গেল শাড়িপরা ছবিটি দিয়ে ঝুমাকে বিবাহিত দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। মিডিয়া দেখাতে চাইল ঝুমা বাল্যবিবাহে বলি হননি বরং সুখী হয়েছেন!

শুধুই কি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের প্রতিও সম্পাদকের আগ্রহ প্রকাশ পেল ঝুমার প্রসঙ্গটি থেকে। ১৪ বছরের এক শিশুর তৃতীয় বউ হওয়া নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই সম্পাদকদের। প্রশ্নহীন সম্পাদকেরা বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে ঝুমার ঘরকণ্যার বিবরণ দিয়েছেন। কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিন বউয়ের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় ঝুমা বেশ আদরে আছেন। সবার সাথে কেনাকাটা করতে গেছেন ইত্যাদি।

খেয়াল করলেই দেখা যায়, ঝুমাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ছিল সাংবাদিকতার স্বভাবসুলভ অনুসন্ধিৎসু মন। প্রতিবেদনগুলোতে একটি প্রশ্ন বেশ জোরেশোরে আলোচিত হয়েছে। প্রশ্নটি হলো- ঝুমা কেন ঘর ছেড়েছেন? উত্তর সাংবাদিকেরা পেয়েছেন, আর সম্পাদকেরা ছেপেছেন। অধিকাংশ পত্রিকাতেই প্রশ্নটির একটিই উত্তর- ‘অপহরণ নয়, প্রেমের টানেই ঘর ছেড়েছেন ‘ক্ষুদে গানরাজ’ তারকা ঝুমা আক্তার। শুধু তাই নয়, বিয়ে করে এখন সংসারী সে’।

সম্পাদকেরা ভালো বুঝবেন। তাই সম্পাদকদের কাছেই প্রশ্নটা থেকে যায়- ১৪ বছরের ঝুমা ‘প্রেমের টানে’ ঘর ছেড়ে সংসারী হয়েছেন সিদ্ধান্ত টানলে তারা কত শত বছর পিছিয়ে যান? বাংলাদেশ এখন শিশুর জন্য কৈশোর উপহার দিতে পারে। কিন্তু ঝুমার প্রসঙ্গে এই শৈশব ও কৈশোর ভাবনা এড়িয়ে গেলেন সম্পাদকেরা। কেন?

ঘরছাড়া প্রসঙ্গে ঝুমার মায়ের ভাবনাটা ভিন্ন। তিনি বলছেন, মায়ের সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণেই ঝুমা ঘর ছেড়েছেন। সম্পাদকের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রেমের টানে ঘর ছেড়েছেন সিদ্ধান্ত টেনে একজন কিশোরীর কৈশোর খুন করে ফেলার দায়িত্বটা কি সম্পাদকেরা নেবেন? না কি জেসমিন বেগমের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ঝুমার কৈশোরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় সামিল হবেন? অবশ্য এরই মধ্যে ঝুমাকে পুলিশ নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছে। মা’র সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কথাও জানিয়েছেন ঝুমা। কিন্তু সম্পাদকদের কাছে এই প্রশ্নগুলো থেকেই যাবে। উত্তরটা পাওয়া যাবে তখনই, যখন সম্পাদকেরা আগামীতে বাল্যবিবাহের শিকার কোন কিশোরীর জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে যায় তা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ আবার পাবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত, ঝুমার ঘর ছাড়ার খবর প্রচার করে সংবাদ মাধ্যম বাল্যবিবাহকে উসকে দিয়েছে, সমর্থন জানিয়েছে।

শুধু বাল্যবিবাহে সমর্থন জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি মিডিয়া। সংবাদের অন্তরালে ইতোমধ্যেই মিডিয়া খুন করে ফেলেছে ঝুমার কৈশোর এবং অনাগত আগামী। একজন ১৪ বছরের কিশোরীকে বিবাহিত হিসেবে দেখা, একজন কিশোরী তারকা-শিল্পী কিভাবে ঘরকন্যা করে তাও দেখে ফেলা, তার আবার সতীনের ঘর করার মতো বিচিত্র সকল অভিজ্ঞতা উপভোগের বিলাসিতা হয়তো সংবাদ মাধ্যমের আছে। কিন্তু শুধু ঝুমা নয়, কোন কিশোরীর জীবন নিয়েই এমন ছেলে-খেলা করার সুযোগ আমাদের কারোরই নেই। সুতরাং এবার দেখার পালা, প্রেমের উপাখ্যান ছাপিয়ে ঝুমার সহজ ও সাবলীল কৈশোর আর অনাগত আগামীকে খুন করে ফেলার দায় আমাদের সম্পাদকরা কিভাবে পরিশোধ করবেন?

শেয়ার করুন:
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.