বন্ধু লাইলীকে সুস্থ করে তুলতে চাই

রাজীব নূর:

সাংবাদিক সালেহা ইয়াসীমন লাইলী এবারের ‘অনন্যা’ সম্মাননা পাচ্ছে। অনন্যা থেকে ওর কাছে পাঠানো চিঠিটা ফেসবুকে পোস্ট করে দু-চার জন বন্ধুকে ট্যাগ করেছে, যাদের একজন আমিও। ও অত্যন্ত মর্যাদাকর এই সম্মাননা পাচ্ছে জেনে যেমন খুশি হলাম, তেমনি ভালো লাগলো যে অল্প কয়জন বন্ধুর মধ্যে আমাকে এগিয়ে রাখে সে। সত্যি লাইলীর মতো সংগ্রামী এবং পরোপকারী একজন মানুষের বন্ধু আমি, এটা আমাকে গর্বিত করে।

মনে মনে তাসমিমা হোসেনকে ধন্যবাদ দিলাম। ‘যে সব নারী আমাদের মনে সাহস জোগান, ঋণী করেন দেশ-কাল-সভ্যতাকে, এগিয়ে নেন মানবজাতিকে’, তাদেরকে তিনি অনন্যা সম্মাননা দিয়ে আসছেন আশির দশকের শেষ দিক থেকে। সত্যি এতো বছর ধরে তিনি এই সম্মাননার মূল্য ধরে রাখতে পেরেছেন, মর্যাদা বাড়িয়েছেন। তাসমিমা হোসেন জহুরি, তাঁর পক্ষেই সম্ভব কোথাকার কোন অজপাড়াগাঁ কুড়িগ্রামের লাইলী বেগমকে সম্মাননা জানাবার জন্য খুঁজে বের করে আনা।

ব্যস্ততা এবং আলসেমির জন্য লাইলীকে অভিনন্দন জানাতে দেরি করে ফেললাম। যেদিন ফোন করলাম, সেদিন লাইলী ছিল কোনো এক গ্রামে। অনন্যার টিম গিয়েছে ওকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র বানাবে বলে। গ্রামের মেয়ে, গ্রামের জন্যই তো কাজ করে যাচ্ছে এতকাল ধরে। ওকে দেখাতে চাইলে গ্রাম দেখাতে হবে।

বুঝলাম লাইলী অনেক ব্যস্ত, বুঝতে পেরে শুধু বললাম, ‘তোমার অর্জন আমাকে গর্বিত করেছে। তোমার সম্মাননা গ্রহণের দিন তনুজা ও অপারকেসহ উপস্থিত থাকব। বন্ধুদেরও থাকতে বলবো।’

কিন্তু হঠাৎই খবর পেলাম লাইলী অসুস্থ। কুড়িগ্রামের সাংবাদিক বন্ধু বাদশা সৈকত লিখেছেন, লাইলী বেগম রংপুরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বুঝিনি অসুখটা কত ভয়াবহ। পরে সৈকতের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, রংপুর ডক্টরস ক্লিনিকে নিউরোলজিস্ট ডা. তোফায়েল হোসেনের চিকিৎসাধীন আছে লাইলী। তাকে ট্রাকশন দিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তার ওকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাই লাইলীকে ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। এখন সে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে নিউরো স্পাইন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

মফস্বলে যে কয়জন নারী ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় নিজেদের জড়িয়ে রেখেছেন, তাদের মধ্যে লাইলীর নাম অগ্রগণ্য। কুড়িগ্রাম ওর কর্ম এলাকা। লাইলীকে আমি জানি ২০০৪ সাল থেকে। ও তখন প্রথম আলোর সালমা সোবহান ফেলো। পরে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রথম আলোতে কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে বৈশাখী টেলিভিশন, ডেইলি অবজারভার ও মানবকণ্ঠ পত্রিকায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য তাকে দেয়া হয়েছে সাংবাদিকতায় ‘কীর্তিমতী নারী’ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ‘সেরা জয়িতা’ পুরস্কার। নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে জেলার বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনেও। মাত্র কিছুদিন আগে সে উদীচীর কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছে। অসহায় হতদরিদ্র মানুষসহ মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো বীরাঙ্গনাদের পাশে সব সময় দেখেছি ওকে। প্রায় আড়াই বছর আগে কয়েকটি হতদরিদ্র পরিবারের জন্য গরু কিনে তার আরেক সহকর্মী ইত্তেফাকের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ফজলে ইলাহী স্বপনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরছিল শহরে। নদী পাড়ের বাঁধের রাস্তা ধরে মোটর সাইকেলে ফেরার সময় দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে ব্যথা পায় লাইলী। পরে বিভিন্ন চিকিৎসাও নিয়েছে এবং কখনো ভালো, কখনো মন্দ অবস্থার মধ্যে গেছে ওর এই আড়াই বছর। গত জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখের দিকে ব্যথা আবারো বাড়তে থাকে। প্রায় এক মাস ধরে মেরুদণ্ড, ঘাড় ও ডান হাতের ব্যথা নিয়ে তীব্র যন্ত্রণার সময় পার করছে সে।

ওর অসুখটার নাম Cervical Myelopathy, কেউ কেউ আবার Cervical Spondylosis বলে। ঘাড়ের নিচে ৪ থেকে ৭ নম্বর ডিস্ক সরে গেছে ও চেপে বসেছে। ফলে নার্ভে চাপ পড়ে কাঁধ ও ডান হাতটাতে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। ডান হাতের শক্তি কমে যাচ্ছে ক্রমশ। ইদানিং টুকটাক যা লিখছে, তা বাঁহাতেই লিখছে। কোনো দিকে পাশ ফিরে শুতে পারছে না সে। কারো সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকে উঠে বসাও কঠিন হয়ে পড়েছে ওর।

লাইলীর অপারেশান করানোটা দরকার, ডাক্তাররা এমনটাই বলছেন। তবে ডাক্তাররাই ওকে বলছেন, ‘ব্যথাটা ঘাড়ের নিচে না হয়ে পেটে হলে আমরা আপনাকে এতোদিন কষ্ট পেতে দিতাম না। অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিতাম। কিন্তু এই জায়গাটায় এক্সপেরিমেন্টালি অপারেশন করা তো ডাক্তার হিসেবে এথিক্যাল হবে না। তাতে ভালো না হয়ে অন্য কিছু হয়ে যেতে পারে।’

এই অবস্থায় লাইলীর ছেলেমেয়েরা চিকিৎসার জন্য ওকে ভারতে নিয়ে যেতে চায়। লাইলীর কোনো সঞ্চয় নেই। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা ওর ছেলে উজ্জ্বল আর মেয়ে বৃষ্টির সামর্থ্য অনেক সীমিত। উজ্জ্বল মাত্র কিছুদিন হলো একটা ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বৃষ্টি ঢাকায় এসেছে কাজ খুঁজবে বলে। অবশ্য গত এক মাস বৃষ্টিও মায়ের সঙ্গে হাসপাতালবন্দি হয়ে আছে।

ছেলেমেয়ে দুটি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে, ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর অপারেশন করাতে হলে আট থেকে ১০ লাখ টাকা লাগতে পারে।
জাকিয়া শিশির, লীনা হাসিনা হক, তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে আলাপ হলো, ওঁরা সবাই বললেন, আমরা উদ্যোগী হলে এটা খুব বেশি টাকা নয়, আমারও তাই মনে হচ্ছে। আসুন না, লাইলীর পাশে দাঁড়াই, একজন সংগ্রামী মানুষের লড়াই যেন এমন অসময়ে থেমে না পড়ে।

লাইলীকে সহযোগিতা করতে চাইলে তার ব্যাংক হিসাব নম্বর : লাইলী বেগম, একাউন্ট নং- ০৪৮-৩০১০০০৪৩৫২, যমুনা ব্যাংক, রংপুর ব্রাঞ্চ (In English Laili Begum, Acount No- 048-3010004352, Jamuna Bank, Rangpur Branch)
বিকাশ একাউন্ট : 01712633237

সম্পাদকের নোট: সালেহা ইয়াসমীন লাইলী আমাদের উইমেন চ্যাপ্টারের অন্যতম বন্ধু, সুহৃদ। তার অনেক লেখাই উইমেন চ্যাপ্টারে বহুল পঠিত হয়েছে। পাঠক হিসেবে, লেখক হিসেবে লাইলী আমাদের সহায়তা অবশ্যই পেতে পারে। সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি।

শেয়ার করুন:
  • 169
  •  
  •  
  •  
  •  
    169
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.