অনুর্বরা

0

লাবণ্য সায়মা রহমান:

পর্ব – ১

আম্বিয়া ম্যাটার্নিটি সেন্টার ঢাকার গোপীবাগের একটা অতিশয় চিপা গলির ভিতরে অবস্থিত। রাস্তার মোড়ে বড় সাইনবোর্ডটায় লালের মধ্যে শাদা রংয়ে লেখাটা ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, একটা তীর চিহ্ন দিয়ে গলির দিক নির্দেশ করে যে অংশটা সে দিকটাই কাত হয়ে নুয়ে আছে। চোখ পড়লে মনে হয় এই বুঝি মাথার ওপর খুলে পড়বে।

আজকের দিনে যখন ওদের দুজনকে আসতেই হলো এখানে, আর অমনি আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। কোত্থেকে ঝম ঝম বৃষ্টি এসে রিকশার পর্দা টানা অবস্থায়ও ভিজিয়ে চুপ চুপা করে দিলো দুজন যাত্রীকে। রিকশাচালক তো ভিজে পুরো নেয়ে উঠলো। তবু কাজটা জরুরি, ওদেরকে আজকে কাজটা সেরে যেতেই হবে, নইলে বিপদ!

স্যাঁতস্যাঁতে ভাঙ্গা গলিটা পেরিয়ে মরিচা পড়া লোহার গেইটটা ঠক ঠক করলে, ভেতর থেকে আয়ার মতো একজন এসে দরোজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। শাহজাদী বেগম জানতে চায় ডাক্তার আছেন কিনা। কেইস কী? প্রশ্ন আসে গেইটের ওপ্রান্ত থেকে-‘জ্বি আমরা এ্যাবরেশন করাইতে আসছি’।

পর্ব – ২

লাবণ্য সায়মা রহমান

বামদিকে কাউন্টার, ওইখানে গিয়ে নাম রেজিষ্ট্রি করানো হলে পরে সিরিয়ালে দুই নাম্বার পান শাহজাদী বেগম, সঙ্গে করে যে ফুটফুটে মেয়েটা ও হাৎস্নাহেনা, শাহজাদী বেগমের ছোট বোনের মেয়ে। বৃষ্টি ভেজা গায়ে থরথর করে কাঁপছিলো মেয়েটা, কোনমতে ওড়না দিয়ে ভেজা শরীরটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিলো। চোয়াল শক্ত করে গোমড়া মুখে বসেছিলেন ওর খালা আর একটু পর পর দোয়া দরুদ পড়ছিলেন মনে মনে। ফ্যাকাসে ধূসর মেঘে ঢাকা এই দিনটা মানুষ দুজনকে আরো বেচাইন করে দেয় যেন।

হাৎস্নাহেনা এই কেবল আই এ পড়ে, আপন মামাতো ভাইয়ের সাথে প্রেম ভালোবাসা সেই এগারো বারো বছর বয়স থেকে। মামাতো ভাই বিয়ে করবে বলে কথা দেয়, যথারীতি শয্যায় নিয়ে গর্ভবতী বানিয়ে ছাড়ে মেয়েটাকে। ছেলের মা, যে হলো হাৎস্নাহেনার মামী, তার কানে কথাটা পৌঁছলে ছি চিৎকারে নাকচ করে দেয় ওদের বিয়ের সম্ভাবনা। মামাতো ভাইটি তখন মায়ের লক্ষ্মী পুত্র বনে যায়, অস্বীকার করে সবকিছু। এতোসব হিসেব নিকেশ করতে করতে হাৎস্নাহেনার শরীরের ভেতর বড় হতে থাকা মানুষটার বয়স হয়ে যায় তিন মাসের একটু বেশি।

গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলে ওরা। হাৎস্নাহেনার মা সামাল দিতে পারবেন না তাই তার ডাকাবুকো বড় বোন শাহজাদী বেগম দায়িত্বটা নেন। আর যেখানে সেখানে তো যাওয়া যাবে না, পরিবারের সম্মানের ব্যাপার এখানে জড়িত। অনেক খোঁজ খবর করে আম্বিয়া ম্যাটার্নিটি সেন্টারটাই নিরাপদ মনে হয় তাদের। যখন হাৎস্নাহেনা নামে ডাক আসে ভেতর থেকে তখনি প্রবল কাঁপুনি দিয়ে হিচকি ওঠা কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে থাকে সপ্তদশী মেয়েটা।

পর্ব – ৩

ভিন্ন নামে এবং একদমই আলাদা ঠিকানায় নাম রেজিস্ট্রি করানো হয় হাস্নাহেনার, যেন কোথাও প্রমাণ থেকে না যায়, শাহজাদী বেগম এ কাজ দাপটের সঙ্গে করে ফেলেন। শত হোক নিজের পরিবারের মান সম্মান জড়িত, মেয়েটাকে ভবিষ্যতে কোথাও গছাতেও তো হবে! ডাক্তার নাকি নার্স ছিলো জানতো না এ বিষয়ে অজ্ঞ মানুষ দুটো। শুরুতে স্যালাইন আর ঘুমের ইনজেকশন দিলো, তারপর কুঁড়ে কুঁড়ে ভেতর থেকে অবাঞ্ছিত বাচ্চাটাকে মেরে ফেলা হলো। হায় মানুষ! হায় জীবন!

অ্যাবরশনের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রচণ্ড ব্যথা আর রক্তপাতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা হাস্নাহেনার। যখন মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারালো, অগত্যা এম্বুলেন্স ডেকে বড় হাসপাতাল্ নিয়ে যাওয়া হলো হাস্নাহেনাকে। পরদিন সকালে এই যে জ্বর এলো, টানা পাঁচদিন পর জ্বর নামলো। অবশেষে প্রাণটা হাতে করে নিয়ে বাড়ি ফিরলো হাস্নাহেনা। মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য ফিরে পেতে দুটো বছর লেগেছিলো মেয়েটার।

আই এ এবং বি এ পাশও করে হাস্নাহেনা এতো সবকিছুর পরেও। গুনধর মামাতো ভাইটি চাকুরী নিয়ে অন্য শহরে চলে যায়, আর তুমুল ধার্মিক বনে যায়, বিশাল পর্দা করা একটা মেয়েকে বিয়েও করে। হাস্নাহেনারও বিয়ে হয় মহা ধুমধামে, অনেক যৌতুক দিয়ে একটি মাঝারি মানের সম্পন্ন পরিবারে। বিয়ের পর দুবছর আনন্দেই কেটেছিলো, কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও গর্ভবতী হয় না হাস্নাহেনা, আর তখন থেকে শুরু হয় ওর সত্যিকারের জটিলতা।

পর্ব – ৪

বাতেন আলী যিনি হাস্নাহেনার স্বামী তিনি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। বাচ্চা তো দরকার, বংশের বাতি যে জ্বলতেই হবে। হাক্কানী হুজুরের পানি পড়া ও তাবিজ কবচ দিয়ে চেষ্টার শুরু, উহু, কাজ তো হলো না। হোমিপ্যাথি করলে নাকি কাজ হয়, তাই সে চেষ্টারও ত্রুটি রইলো না। নাহ্, কার্যসিদ্ধি হলো না এসবে। এবারে গাইনীর বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। বিশাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তেমন কোনো সমস্যা পাওয়া গেলো না।

আর হাস্নাহেনা? আহা জীবনের পথে চলতে চলতে মেয়েটা ভুলেই গেছে নিজের কথা। প্রতারিত হয়ে কতোটা ভেঙ্গে গেছিলো অন্তরটা তার! বিয়ে করতে একটুও চায়নি তো মেয়েটা। পুরুষের প্রতি ক্যামন যে ঘেন্না ঘেন্না অনুভূতি এখনো আছে ওর ভেতরে। এ কথা কি কোনোদিন কাউকে বলা যায়! বিয়ে করাই তো নিয়ম, সংসার আর বাচ্চা পয়দা না করলে মেয়েমানুষের জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না?

আহা, পরিবার সমাজের সকলেই চুক চুক শব্দে সান্ত্বনা দেয়। আল্লা আল্লা করলে, সারাক্ষণ দোয়া দরুদ পড়লে নাকি ফল হয়? তাই করে হাস্নাহেনা। মাঝরাতে উঠে নফল নামাজ পড়লে সাথে বিশেষ বিশেষ দোয়া পড়লেও নাকি কাজ হয়? মেয়েটা তাই করে। বাতেন আলীকে কে যেনো উপদেশ দেয় যখন তখন উপগত হতে। অনাকাঙ্খার সঙ্গমে সঙ্গমে কতবার ধর্ষিত হয় মেয়েটা সে কথা কে বোঝে? জান যায় তবু বাচ্চা পয়দা করতে হবে, মেয়ে মানুষের জানের কী দাম নইলে?

(ক্রমশ:)

শেয়ার করুন:
  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
    121
    Shares

লেখাটি ৯৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.