ফেমিনিজমের ভ্রান্ত বিশ্লেষণে ‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দটি যখন কাঠগড়ায়

0

সাবিরা শাওন:

আমার লেখার টাইটেলের বিশ্লেষণ করার আগে চলুন একবার পুরনো কিছু কথা মনে করি।
মালালা ইউসুফজাইকে মনে আছে তো? সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে কিনা পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষার অধিকারে সোচ্চার হওয়ার অপরাধে তালেবানদের বুলেটের শিকার হয়েছিলো!

অথবা তামিমিকে মনে পড়ে? ফিলিস্তিনের জোয়ান আর্ক, যে কিনা ইসরাইলী সৈন্যদের সহিংসতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করার সময় সপাটে চড় বসিয়েছিলো এক ইসরাইলি সৈন্যের গালে!

এবার বলি রাহাফ মোহাম্মদের কথা। যে মেয়েটা সৌদি আরবের মতো জায়গায় জন্মগ্রহণ করে শুধুমাত্র নিজের জন্য, নিজের অধিকারের জন্য পালিয়ে এসেছে অন্য রাষ্ট্রে। অথচ যে কিনা একবার শুধুমাত্র ছোট করে চুল কাটার অপরাধে ছয় মাস গৃহবন্দী ছিলো, এবং তার ভাই তাকে প্রতিদিন রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত আঘাত করে যেত। এতোটা যন্ত্রণা সহ্য করেও সে শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছের জন্য লড়াই করে গেছে।

এতোক্ষণ যাদের কথা বললাম তারা প্রত্যেকেই বর্তমানে স্বাধীনতার আইকন, নিজেদের বা পুরো জাতির জন্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার এবং নিঃসন্দেহে ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী। আমাদের প্রচলিত সমাজে অনেকের কাছে এরা অপরাধী, এবং কারো মতে একটু বেশি বেশিই।

এবার তবে চলুন আবার একটু ফেমিনিজমের সংজ্ঞাটা রিভাইস করি। আমার অল্পজ্ঞানে হয়তো অজ্ঞতাটাই বেশি প্রকাশ পাবে রথী মহারথীদের কাছে, তবু চেষ্টা করতে দোষ কী?

ফেমিনিজম সম্পর্কে আমাদের সবার ধারণা (অদ্ভুত ধারণা) হলো, নারীবাদে বিশ্বাসী বা ফেমিনিস্ট মানেই হলো নিয়ম (সমাজ না প্রথার) না মানা ছোট চুল, রাগান্বিত চেহারার মেয়ে, পুরুষ বিদ্বেষী, সেক্স বিদ্বেষী এবং অবশ্যই অতি প্রত্যাশী; আরো বহুত কিছু, যা ভদ্র ভাষায় বলার মতো আমি প্রক্রিয়াজাত করতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সমাজে ফেমিনিজম হলো মারাত্মক অপরাধ।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? কেউ যখন শুনে তার পরিচিত মেয়েটি নারীবাদের তত্ত্বে বিশ্বাসী, ব্যস হয়ে গেল সবকিছু থেকে ব্ল্যাকলিস্টেড!

আমেরিকান লেখিকা রোক্সানে গে তাঁর “Bad Feminism” বইতে বলেছেন, “I am trying to become better in how I think and what I say and What I do, without abandoning everything that makes me human.”

নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া বা নিজের মতো জীবনযাপন করতে চাওয়াটা কিংবা নিজের ভাবনাগুলোকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে চাওয়াটা কখনোই খারাপ কিছু নয়; মানুষ হিসেবে এতোটুকু স্বাধীনতা শুধু মেয়েদের নয়, প্রত্যেকের অধিকার, অপরাধ নয়।

হয়রানি ও হিংস্রতামুক্ত একটা পরিবেশে নিজের মতো চলার অধিকার চাওয়া, নিজের ব্যক্তিগত মতামত ও নিজেকে মানুষ ভাবতে চাওয়া যদি মেয়েটির চারিত্রিক সনদে অযোগ্যতা হিসেবে যোগ হয়, তবে ২০১৪ সালের MTV Music Awards এ সংগীত শিল্পী বিয়ন্সে নিজেকে একজন ফেমিনিস্ট বলার অপরাধে তার গান শোনা বন্ধ করুন।

লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা বা নারীর পক্ষে কথা বলা আপনার সামনে, পিছনে, ডাইনে-বাঁয়ে যাকেই পাবেন সে ছেলে হোক অথবা মেয়ে, তাকে ফেমিনিস্ট ট্যাগ লাগিয়ে সমাজ থেকে একঘরে করে দেন।

প্রতিটা মানুষ চায় নিজেকে রক্ত-মাংসের দলা না ভেবে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে। হ্যাঁ, মেয়েরা নারী-পুরুষ সমতায় বিশ্বাসী। কারণ নারী-পুরুষ সমান কাজ করে সমান মজুরি পাওয়ার অধিকারে মেয়েরা পুরুষের সমকক্ষ। মনে রাখার মতো ছোট্ট একটা কথা হলো, আমরা শুধু মেয়ে নই, একটা আলাদা-স্বতন্ত্র মানুষ। আমাদের অভিব্যক্তি আছে, বিশ্বাস আছে, সামর্থ্য আছে।

মোট কথা, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে যা প্রয়োজন সব আছে। তবুও আমাদেরকে সমাজ মানুষ নয়, দুর্বল প্রকৃতির মানুষ ভাবতেই ভালোবাসে। কেন? উত্তর নেই কারো কাছে। তবু অযুক্তি আর অশ্লীল কথার জালে জড়িয়ে একটা মেয়েকে অসম্মান করতে কারো বাঁধে না।

অথচ উপরোল্লিখিত তিনজন সম্পর্কে ভেবে দেখলেই পাওয়া যাবে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর। তাঁরা তিনজন তিনটি ভিন্ন জায়গা, পরিস্থিতি থেকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছে সবার সামনে।

ফেমিনিজমের ধারণায় কোথাও বলা নেই, স্বাধীনতা মানেই বাইরের জগতে পা রাখা। কেউ যদি চায় তার সঙ্গীর ইচ্ছেতে জীবন চালাবে, উচ্চশিক্ষিত হয়েও ঘরে থাকবে, ঘরের কাজগুলো করবে ভালোবেসে, সেখানে নারীবাদ কখনোই বাধ সাধে না। ঝামেলা বাঁধে যখন এর বিপরীত ঘটে।

যদি কোনও নারী তার গুরুত্বহীন জীবন, দিনরাতের কঠোর পরিশ্রম, অন্যায়, অবিচারের শিকার হয়ে, একঘেঁয়ে ঘরের কাজকর্ম এবং যন্ত্রণাবিদ্ধ সন্তান প্রসবের মতো কাজগুলোতে যখন হাঁপিয়ে উঠে ও প্রতিবাদ করে, তখন কি তাকে আপনারা সংসারবিদ্বেষী বা সংসারবিধ্বংসী বা উচ্ছৃঙ্খল নারী বলবেন? যে নারী স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না, যে তার স্বকীয়তা নিয়ে বাঁচতে চায়, মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়, ক্যারিয়ার গড়তে চায়, আর এসবের জন্য যখন সে নতজানু হতে অস্বীকৃতি জানায়, তাকে কি আমরা সমস্যা সৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করবো? নাকি তার আকাঙ্খা পূরণে সহায়ক হবো, পথ খুলে দেবো তার জন্য? কোনটা?

কাজেই বলছিলাম কী, নিজের ইচ্ছা বা নিজের শরীর নিয়ে কারো ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি কখনোই ফেমিনিজম মতবাদের অংশ হতে পারে না। মোট কথা ফেমিনিজম কখনোই ব্যক্তিগত মতামতের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি সামষ্টিক একটি ধারণা। এর ব্যাখ্যা সুবিশাল। শুধুমাত্র পুরুষদের জেনারালাইজ করে আক্রমণ করা যেমন ফেমিনিজমের অংশ নয়, আবার তেমনি সবকিছু মুখ বুঁজে সয়ে যাওয়াটাও এর শিক্ষা নয়।

দ্বন্দ্ব ও অবিচারে পূর্ণ পরিবারগুলোর ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে নারীবাদীরা চেষ্টা করছেন পরিবারে সুখ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার, এটা আপনারা মানুন বা নাই মানুন, এটাই সত্যি।

তাই যারা ফেমিনিজমের গোষ্ঠী উদ্ধারে উঠে-পড়ে লেগেছেন, তাদের বলবো, সমালোচনা করার জন্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রমণকে নিজের সুড়সুড়ির উপলক্ষ্য না করে আগে বিষয়টি সম্পর্কে ন্যূনতম জানুন।

শেষ করছি রোক্সানে গে এর কথা দিয়েই, তিনি তাঁর বইয়ে নিজের পরিচয় সম্পর্কে বলেছেন, “ I am a bad feminist. I am a good woman.”
ফেমিনিস্ট মানেই কুলটা, এমনটা নয়, কখনও কখনও তাঁরা সমাজের আয়না, সমাজকে এগিয়ে নেয় তারাই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 391
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    391
    Shares

লেখাটি ১,০০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.