ভালোবাসা কি শুধু দিবস যাপনেই পূর্ণতা পায়?

0

শাহরিয়া দিনা:

তোমার জন্য মরতে পারি, তোমার জন্য দুনিয়া ছাড়তে পারি, যদি তুমি একবার বিশ্বাস করে হাত ধরো আজীবন বুক দিয়ে আগলে রাখবো। এমনতর প্রতিশ্রুতিতে বাড়িয়েছিলেন হাত। পথ চলা শুরু হলো। পুরো জার্নিটা শেষ হলো না কী জানি হলো, মাঝপথেই থেমে গেল।

নিজের দিক থেকে শতভাগ দিয়েও যখন আপনার নিজেকে প্রতারিত কিংবা বঞ্চিত মনে হয়, তখন আপনি বলতেই পারেন এই পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই!

প্রেমেও বিশ্বাস উঠে যাওয়াও অস্বাভাবিক না। এমনও ভাবনা আসে, ভালোবাসা নয়, আসলে সবই প্রয়োজন। একজন মানুষের আরেকজন মানুষকে যতক্ষণ প্রয়োজন, ততক্ষণই টিকে থাকে সম্পর্ক। এবার জীবনের একেক মুহূর্তে মানুষের একেকজনকে প্রয়োজন হয়। তখন সেই সম্পর্ককেই লোকে প্রেম বলে গুলিয়ে ফেলে। পরে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সেই মানুষটির প্রয়োজন একজনের জীবন থেকে মিটে গেলে, শেষ হয়ে যায় সেই সম্পর্ক।

অনেক সময় আমরা ফিজিক্যাল এট্রাকশন কিংবা স্যোসাল কন্ডিশনকে প্রেম বুঝি। অমুক দেখতে সুন্দর, ফিগার ভালো অথবা তার অনেক টাকাপয়সা সুনাম-সম্মান আছে, আমি যেমন পছন্দ করি তেমনই। এটাকে প্রেম নাম দেই। এরপর অফিশিয়ালি বিয়ে হয়ে গেল। তো, বিয়ে যেহেতু হয়েছে জবরদস্তি প্রেম করতেই হয়। যেখানে ভালোবাসতে চেষ্টা থাকে সেখানে প্রেম নাই, যেখানে বিচ্ছেদ থাকে সেখানে প্রেম নেই, যেখানে দুইজন সেখানে প্রেম নেই, যেখানে সেনসেশন সেখানে প্রেম নেই। মস্তিষ্ক থেকে কিছু হরমোন রিলিজ হয় আমার বলি প্রেম!

আসলে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জীবনটা এক্সপেরিয়েন্স করবার। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে, অন্য মানুষ, নিজেকে এবং প্রেম সবকিছুই অনুভবের। আর এই এক্সপেরিয়েন্স করার জন্য প্রথমেই দরকার দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা। আর পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন স্থিরতা। খুব তাড়াহুড়া অথবা খুব অস্থিরতা নিয়ে কি আমরা কিছু লক্ষ্য করতে পারি?

পারি না। ছুটি কাটাতে কোথাও বসে আছেন সামনে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি, ওই দূরে আকাশ আর জলের মিতালী, উড়ে যাওয়া গাংচিল, ঝাউবন কিংবা বয়ে চলা এক বাতাস সবমিলিয়ে একটা অন্যরকম ব্যাপার খুব ধীর-স্থির হয়ে বসুন দেখবেন আপনি সবকিছুর সাথেই একাত্ম হয়ে গেছেন। এই একাত্ম হওয়ার অনুভবটাই প্রেম।

প্রেম সবসময়ই একতরফা। এই পৃথিবীর জীবনকে ভালোবেসেই আমাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের যতো আয়োজন। অথচ যেদিন আমি/আপনি থাকবো না পৃথিবীর তাতে কি কিছু যাবে আসবে! প্রতিদিন সূর্য উঠবে, পাখি গান গাইবে সবকিছু চলবে যেমন চলছিল এতোদিন। কারো শোকে এক মুহূর্ত থামবার অবকাশ তার নেই। কখনো আমরা কোন বস্তুর প্রেমে পড়ি। সে বস্তু কি আমাদের ভালোবাসে? তো, ভালোবাসাটা তৈরি করি আমরা আমাদের মনে।

মনে যে ভালোবাসার জন্ম দেই আমরা, সেটা আমার ব্যাপার, অন্য পাশের কন্ট্রোল তো আর আমার হাতে নেই। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকেও ভালোবাসা পায় যারা, তারা সৌভাগ্যবান। প্রতিটি মুহূর্ত অনুভবের।

কোন একজন মানুষকে ভালোলাগে তাকে ভাবলেই মন কেমন করে, সারাক্ষণ তাকেই মনে পড়ে। অস্থিরতা ভরা তনু-মন জরুরি না তার সাথে সম্পর্ক হোক।
আসলে আমি নিজের মধ্যে তোমাকে দেখি তখন সেটা প্রেম। এখানে কোন সেপারেশন নেই। দুইজন না এখানে ব্যক্তি একজনই। আমি/তুমি না, হয়ে যায় আমরা। ওটা তুমি, এটা আমি এর মধ্যে কোন প্রেম নেই। হতে পারে এটা এটাচমেন্ট, হতে পারে রিলেশনশিপ। কিন্তু যখন ওই দুজনে যা চাওয়ার তা পেয়ে গেলে প্রেমও শেষ।

তার কাছে কিছু চাওয়ার থাকবে না, তার আর আমার মাঝখানে কিছু আসবে না প্রেম সেটা। তোমাকে প্রিয়জন ভাবি বলেই তুমি আমার প্রয়োজন। প্রয়োজন বলেই তুমি আমার প্রিয়জন না। সারাক্ষণ ইঁদুরকে চিন্তা করে বিড়াল। কারণটা প্রয়োজন প্রেম না। খিদা মিটানো প্রেম না। খিদা মিটে যাওয়াটা প্রেম। কিছু চাই না ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে তাকিয়ে নামবে প্রশান্তি। সে চোখেই আমি দেখবো আমাকে। হ্যাঁ, শারীরিক সম্পর্ক চাই। পিপাসা লাগে পানি খাই তেমন। এটা জীবনভর জুড়ে যাওয়া আত্মা থেকে। এখানে বিচ্ছেদ নেই।

কিন্তু অন্যের চোখে নিজেকে দেখা এবং আমার চোখে তাকে দেখা। এটা কি সম্ভব? সন্দীপ মহেশ্বরীর দেয়া একটা উদাহরণ টানা যায় এখানে – “আমরা জানি চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। আমরা যা দেখি পুরোটাই আলোর প্রতিফলন। সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে ট্রাভেল করে এই আলো। অথচ পৃথিবী আর সূর্যের মাঝখানটা অন্ধকার। মানে অন্ধকারই আলো, আলোই অন্ধকার। তো, এই ট্রাভে
ল করা আলো যা ছিল অন্ধকার হয়ে যখন পৌঁছে সেই চাঁদের উপর যা ছিলই না ঠিক তখনই আমরা চাঁদ এক্সপ্রিয়েন্স করি।

প্রেমটা হচ্ছে সেই আলো। যা ছিল অন্ধকার হয়ে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝে আর চাঁদ বলতে কিছুই ছিলনা যদি সেই আলোটা না আসতো। ‘তুই না থাকলে আমি আমি হতাম না, আমি আমাকে চিনতাম না — এটাই প্রেম!”

প্রেম মানেই আমরা। কখনও আত্মা থেকে আমাদের মিল কিন্তু বাইরে আমাদের অমিল। আলাদা হয়ে যেতে হয় তখনও আমাদের জন্যই আমরা আলাদা হবো যদি সাথে থাকি তাও আমাদের জন্যই। তুমি আমার সাথে অন্যায় করেছো সমস্যা শুধু এটাই নয়, আমিও হয়তো অন্যায় করেছি, যা আমাকেই আত্মগ্লানিতে রেখেছে এমনও তো হয়। সেখান থেকেও আমাদের পথ ভিন্ন হতে পারে। এই আমরা বোধটাই প্রেম। সত্যিকারের প্রেম। তুমি আমি থেকে আমরা এটাই ছড়িয়ে দেয়া যায় পরিবার, সমাজ, দেশে এমনকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডব্যাপী। আগে আমরা মানুষ, আমরা সবাই একসাথে জুড়ে থাকা দল একটাই পৃথিবীতে।

ভালোবাসায় বাঁচি, ভালোবেসে বাঁচি। বিশেষ একটা দিনে আয়োজন করেই নাহয় বলি “ভালোবাসি” ক্ষতি কি তাতে! ঘৃণার প্রকাশ ক্ষতিকর ভালোবাসার প্রকাশ প্রশান্তিকর।

জালাল উদ্দীন রুমি’র কথাটাই বলি পরিশেষে —
Love is the bridge between you and everything.

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares

লেখাটি ২৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.