সাগর-রুনি আমাদের বন্ধ্যা সময়েরই প্রতিচ্ছবি

0

সুপ্রীতি ধর:

নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান লিখেছেন, “৪৮ ঘন্টার ফলাফল = ৭ বছর; তিনটি তদন্তকারি সংস্থা; ৬জন তদন্তকারি কর্মকর্তা; আদালতে তদন্তের অগ্রগতি প্রদানে ৬২ বার সময় নেয়া; পরিবারকে চরম হয়রানি করা; বেশকিছু মানুষের আখের গুছানো; কিছু মানুষের ঘটনার উষ্ণতা কমা-বাড়ার সাথে ওঠানামা করা ইমোশন; অসীম সময় ধরে চলতে থাকা DNA পরীক্ষা; লাশ উত্তোলন, হরেক রকম মানুষকে গ্রেফতার ইত্যাদি নানারকম নাটক মঞ্চায়ন; পেইড সাংবাদিকদের দিয়ে মিথ্যে রিপোর্ট করে পরিবারকে জড়ানোর চেষ্টা; তদন্তকারী সংস্থা, মন্ত্রীদের ৭ বছর ধরে অক্লান্তভাবে একই স্লোগান “তদন্তে অগ্রগতি আছে, আমরা চেষ্টা করছি”; ৭ বছর ধরে তদন্ত করতে করতে তদন্তকারি সংস্থার ক্লান্ত হয়ে গায়ের জোরে চুপ হয়ে যাওয়া; বিচারহীনতাকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করা; বাবা-মা হারানোর কষ্ট ও আদর ছাড়া মেঘের বেড়ে ওঠা; এতো এতো ঘটনার মধ্যে দিয়ে ৪৮ ঘন্টা ৭ বছর হয়ে গেলেও তদন্ত প্রক্রিয়ার ফলাফল ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তেই রয়ে গেছে, সুষ্ঠু বিচারতো কয়েক আলোক বর্ষ দূরে …
তারপরও আমরা বিচার চাইবো খুনিদের এবং তাদের সবধরনের সকল সহযোগীদের…”।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড আমাদের অনেকের জীবনই স্তব্ধ করে দিয়েছে, মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার আখের গুছিয়েছে তাদের, আবার কেউ বন্ধুহত্যার প্রতিবাদে নিস্ফল আক্রোশে কেবলই রক্তাক্ত হয়েছি ভিতরে ভিতরে। সেইদিন থেকে এক অজানা ভয় আর ক্রোধ ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গী হয়েছে।

মূলত এই একটি হত্যাকাণ্ড আমাদের চরম বন্ধ্যা সময়েরই যেন প্রতিচ্ছবি, যে সময়টাতে আমরা সবাই আটকে গেছি, চারপাশের নানান অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, বিচারহীনতার যুগে যারা প্রাণে বেঁচে আছি কোনরকমে, তারা নি:শ্বাস নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই নি:শ্বাসে প্রশান্তি নেই। আছে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।

বাবা-মায়ের সাথে ছোট্ট মেঘ

সাদামাটা চোখে মনে হতে পারে যে, আমরা কেবল ১১ ফেব্রুয়ারি এলেই স্মরণ করি আমাদের সহকর্মীদের। তা নয়। ওরা দুজনই আমাদের মনে থাকে, প্রতিদিনের যতো ব্যথা, যতো কষ্ট আছে, সবকিছুতেই তারা মিশে থাকে। যেমন ওদের সন্তান মেঘকে দেখে নিজের অজান্তেই একটা বুকচাপা কষ্ট বেরিয়ে আসে! যতোবার ওর ছবি দেখি, নিজেই অনুশোচনায় মুষড়ে পড়ি। ওরা দুজন শুধুই সহকর্মী ছিল না আমাদের, আরও অনেক বেশি কিছু ছিল। পথে-ঘাটে-অফিসে একসাথে কাজ করতে গিয়ে, পথ চলতে গিয়ে কতোদিনের কতো স্মৃতি আজ কেবলই বিস্মৃতি!

সবশেষ মেঘের ছবি দেখেছি এইতো কিছুদিন আগেই, রোমান শেয়ার দিয়েছিল ওর ছোটবেলার আর বড়বেলার সাইকেল আর মোটর সাইকেলে বসা ছবি। দিন দিন লম্বা, বড় হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। একজন মায়ের চোখ দিয়ে দেখি, মনে মনে বলি, ‘বেঁচে থাকিস বাবা, ভালো থাকিস’।
তারও আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছিল মেঘ। ওর ছবি থেকে চোখ সরে না আমাদের অনেকেরই। হয়তো দেখা হয় না, কথাও হয় না, কিন্তু ওর প্রতি একটা সস্নেহ মন আশীর্বাদ করে যায় অনুক্ষণ। বলা চলে, ২০১২ সালের ওই ঘটনার পর আজতক মেঘের মুখোমুখি হবার সাহসও সঞ্চয় করতে পারিনি, নিজেকে এতোটাই অপরাধী মনে হয়েছে।

সাগর-রুনিকে কে বা কারা মেরেছে? এই সামান্য সত্যটুকু জানারও অধিকার আমাদের নেই! এমনই এক সময়ের পরিক্রমায় পথ চলেছি আমরা! কেন মেরেছে? সেই উত্তরটা তো আরও সুদূর পরাহত! তার মানে কখনও জানাই হবে না? মেঘ কোনদিন জানতেও পারবে না কেন বা কারা মেরেছে তার বাবা-মাকে? কী এমন কারণে সে বাবা-মায়ের আদর পেলো না জীবনে! আমার নিজেরই যখন এসব প্রশ্ন মনে পড়ে, রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে। ভেঙে চৌচির করে দিতে ইচ্ছে করে বেশকিছু জীবন, যারা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। যারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এমন একটা নির্মম ঘটনাকে কেবল পায়ে ঠেলে দিল, তাদেরকে আমার চুরমার করে দিতে ইচ্ছা করে। আর তাদের সাথে হাত মেলালো যারা, তাদের প্রতিও চরম ঘৃণা দলা পাকিয়ে আসে।

সাত বছর হয়ে গেল ওদের হত্যার, কোনো সুরাহা তো হয়ইনি, আদৌ হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় বদ্ধমূল হয়। বার বার একই মূলা দেখানো হচ্ছে আমাদের মতোন আমজনতাকে। মাঝখানে যে সাংবাদিকেরা খুব বেশি তৎপর ছিলেন এই ঘটনার রহস্য অনুসন্ধানে, তাদেরকেও হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়া গেছে। তাদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে নানারকম উপঢৌকনের, কখনও বস্তুগত, কখনও বা পারিবারিক ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। তলে তলে আরও কী কী হয়েছে, সেটা জানা আমাদের মতোন মানুষের কর্ম্মো নয়। তবে কিছু খবর তো আসেই কানে, মানুষ যদি আমাদেরকে আবাল ভেবে থাকে, তাহলে করণীয় কিছুই নেই। আমরা তো বুঝি কোন ধানে কতো চাল হয়, কখন মানুষ নিজে থেকে নিস্তেজ হয়, কখন তাদের নিস্তেজ করা হয়! আমি বলবো, এক্ষেত্রে দুপক্ষই সমান খেলোয়াড়। মাঝখান থেকে মেঘ বড় হতে থাকে একাকিত্বকে সঙ্গে নিয়ে, রুনি-সাগরের মায়েরা একা জীবনে বড়বেশি দ্রুত বার্ধক্যে পৌঁছাতে থাকেন, তাদের কাছে জীবনটা ঠেলে নেয়াই যেন এখন সবচেয়ে দুর্বিষহ, দুর্বোধ্য ঠেকে।

আমি রুনির মায়ের ছবিও দেখি ফেসবুকে। রোমান মাঝে মাঝে শেয়ার দেয়। আমি খুব সহজেই এই মায়ের মুখটা পড়তে পারি, মুখের প্রতিটি বলিরেখা পড়তে পারি, পড়তে পারি তাঁর দীর্ঘশ্বাসটুকুও। খালি মনে হয়, এতো এতো অভিশাপ এমনি এমনি যাবে না, এর একটা বিহিত কখনও না কখনও হবেই। কর্মফল বলে কিছু একটা আছে তো নাকি!

#sagar_runi #সাগর_রুনি #we_want_justice

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 179
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    179
    Shares

লেখাটি ৪২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.