আমরা যেন মিতুকে ভুলে না থাকি!

0

সুপ্রীতি ধর:

হাজারও ইস্যুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এখানে ভোর হতে না হতেই ইস্যুর শুরু হয়, দিন গড়িয়ে রাত শেষ হতে হতে অনেক ইস্যুর ভিড়ে ভোরের ইস্যুটি ম্লান হয়ে যায়। প্রতিদিন নতুন নতুন ইস্যুর ভিড়ে আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব হয় না কোনো একটাতে লেগে থাকতে। আমরা মহা উৎসাহেই হোক বা দু:স্বপ্ন নিয়েই হোক, আরেকটি নতুন দিন শুরু করি আরও নতুন কোনো ইস্যু নিয়ে ভেবে ভেবে, হাত নিশপিশ করতে করতে, নিজের জীবনকে অভিসম্পাত করতে করতে, কিছুই করতে না পারার হা-হুতাশের মধ্য দিয়ে। এই তো জীবন!

কিন্তু যার যায় সেই জানে কী যায়! যার আপনজন হারিয়ে যায় বা আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠে নানা কারণে, বা ইস্যু হয়ে উঠে, সে যেমন সেই হারানোর বা পরিস্থিতির কষ্ট-বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়, তেমনি যারা দূরের থাকেন, যারা সাময়িক কষ্ট পান, তারাও ঝাঁকের কই হয়ে থাকতেই বাধ্য হোন। এছাড়া অন্য কোনো পথও যে নেই!

সুপ্রীতি ধর

লুতফুন নাহার লতা’পা ঠিকই বলেছেন, “প্রতিদিন মনে হয় ওর কথা। কেউ এখন আর কিচ্ছু বলে না। রিমান্ডে নেবার কথা শুনেছিলাম — ফেসবুক হলো সেই কবিতার লাইনগুলোর মতো, “খাচ্ছি দাচ্ছি ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি”। “ওকে নিয়ে অত্যাচার করে কী পেলো! মানুষ খুন হয়ে যায় যেখানে সেখানে, বই মেলার সামনে। খুনিকে খুঁজে পায় না এরা। একটা সাইকোপ্যাথ, প্রতিহিংসাপরায়ণ, অসুস্থ মূর্খের আত্মহত্যার এতো দাম! শেইম এই ব্যবস্থাকে!” একদম সত্যি কথা।

ওর ছোট বোনের সাথে কথা হচ্ছিল, একজন আত্মীয়ও কথা বললেন। তারা অস্থির হয়ে আছেন ভালো কোনো খবর শোনার জন্য। কিন্তু কে শোনাবে সেই কথা? যতোদূর জেনেছি, বুধবার মানে ৬ তারিখ থেকে ওর রিমান্ড শুরু হয়েছিল তিনদিনের, শুক্রবারে শেষ হয়েছে। কেমন আছে মেয়েটি? ওর মানসিক অবস্থা কি আমরা বিন্দুমাত্রও বুঝতে পারছি? ওতো রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষই। নাকি নারী বলে তার আলাদা কোনো পরিচয় আছে? যেভাবে জনরোষ তৈরি হয়েছে ওর বিরুদ্ধে, মানে একটা শ্রেণি পেরেছে এটা সৃষ্টি করতে, তাদের ঔদ্ধত্য দেখে নিজেই ভীতসন্ত্রস্ত বোধ করি। মিতু আজ নারী বলেই এতো রাগ সবার? এতোটাই রাগ? কিন্তু কেন? এতোদিন ধরে পুরুষের গড়ে তোলা অভয়ারণ্য বুঝি আজ হাতছাড়া হয়ে গেল, এই ভয়ে?

একেকটি ঘটনা ঘটে, আর আমরা কিছু আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে যেমন জানতে পারি, তেমনি আইনের বরখেলাপ বা অপপ্রয়োগ কোথায় কোথায় হচ্ছে, তাও জানতে পারি। অন্তত পড়ে কিছুটা বুঝতে পারি। এই যেমন মিতুর ঘটনায় আমাদের দেশের পরকীয়া সংক্রান্ত আইনে কী বলা আছে, তা জানলাম। এও জানলাম যে, আইনি কোনো ভিত্তিই নেই পরকীয়ার কারণে মামলা দায়ের করা, গ্রেপ্তার তো আরও পরের বিষয়। অথচ ধর্ষণের বেলায় কিন্তু আইনে স্পষ্ট লেখা আছে সব। বাস্তবে আমরা এর কোনো প্রয়োগ কি দেখতে পাই?

মিতুর বেলায় কী দেখলাম আমরা? দেখলাম যে মিতুকে মামলার আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেখানে আইনেই স্পষ্টত বলা হয়েছে এই বিষয়ে, তারপরও দেখা যাচ্ছে, শুধু যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাই না, সেইসাথে পুলিশের জব্দ করা মোবাইল ফোন থেকে একের পর এক তথ্য চলে আসছে সাধারণ মানুষের হাতে। এটা কী করে সম্ভব? পুলিশ তো এটা করতেই পারে না। কোনো তথ্যই তারা দিতে পারে না, কাউকেই না।

আবার একটা বিষয় দেখুন, এই এক মিতু-আকাশের ঘটনায় যেভাবে সবাই একাট্টা হয়ে মিতুর বিরুদ্ধে লেগেছে, দিনের পর দিন ‘ফাঁসি চাই’ ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করে যাচ্ছে, তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট যে নারীর বিরুদ্ধে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ক্ষোভ বা রাগ কতোটা ভয়াবহ ও প্রকট আকার নিয়েছে!

ডা. আকাশের নিজ স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ এনে আত্মহত্যা করার দায় মূলত আকাশের একারই। মিতুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে আকাশ, তা যদি সত্যিও হয়, তারপরও মিতুকে দায়ী করা যায় না তার মৃত্যুর জন্য। অথবা করলেও সেটা খুবই ব্যক্তিগত একটা বিষয়, মোটেও সে পুরো দেশ তথা মানবজাতিকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলার অধিকার রাখে না। এটা তার কোনো শিক্ষা হতে পারে না। আবার ডা. মিতুও যদি সত্যিই অভিযুক্ত হয়েই থাকে, তারও উচিত ছিল বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবেই মিটিয়ে ফেলা। এখানে আমরা ধরে নিতে পারি যে, মিতু নিজেও বুঝতে পারেনি এতোদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে পুরো ঘটনা। এমন একটি অভিযোগ প্রমাণের সপক্ষে যুক্তি দিতে হলেও আকাশের উচিত ছিল বেঁচে থেকে তা মোকাবিলা করা, কাপুরুষের মতোন চলে গিয়ে নয়। সে মরে গিয়ে তার জন্মদাত্রী মা এবং ছোট দুই ভাইকেই কেবল শোকের সাগরে ও শূন্যতায় ভাসায়নি, আমাদের মধ্যে যারা আমরা নারী স্বাধীনতা নিয়ে একটু-আধটু কাজ করি, কথা বলি, তাদেরকে সে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে গেছে। সভ্যতাকে সে কলংকিত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়ে গেছে। এটা তার অনুচিত কাজ হয়েছে।

আমরা কিন্তু বার বার বলছি, আকাশ বা মিতু কারও কোনো এক্টই সমর্থনযোগ্য নয়, দুজনই অন্যায় করেছেন আমাদের চোখে। তাদের জন্য আমরা ভুক্তভোগী কেন আজ? আবার আকাশ এর এই বোকামিপূর্ণ কাজের জের টানছে আজ মিতু। তার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে সবদিক থেকেই। এটা কোনো সভ্যদেশের উদাহরণ হতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে মিতুকে ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে, তা আমাদের নিরেট মূর্খতা আর শিক্ষাহীনতাকেই প্রমাণ করছে। আমি সত্যিই মিতুকে নিয়ে চিন্তিত, আমি চিন্তিত তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া নিয়ে, চিন্তিত তাকে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে এভাবে দোষীসাব্যস্ত করায় পরবর্তিতে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়ে।

এখানে বলে রাখি, আকাশ চিকিৎসক ছিল বলে শুধু যে চিকিৎসকেরাই মানববন্ধন করছে, তা না, আইনজীবীরাও করছেন। তাদের সমস্যাটা কোথায় হলো, সেটা যদিও খালি চোখে বুঝতে পারছি না, তারপরও বুঝতে পারি, এর মধ্য দিয়ে একটা দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। সেই স্বার্থটা কী? আমি জানি না, আপনারা জানলেও জানতে পারেন।

মিতুও তো চিকিৎসক। সেটা কিন্তু বেমালুম ভুলে গিয়ে সবাই তাকে ‘একজন নারী’ হিসেবেই ট্রিট করছে। আর এতেই কি অনুমান হয় না যে, নারী তার সবরকম অগ্রযাত্রা দিয়ে পুরুষকে আজ বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে! নারীর এই এগিয়ে আসার ঘটনায় পুরুষ জাতি আজ বিপন্ন বোধ করছে, তারা সত্যি সত্যিই পিছিয়ে পড়ছে মানবিক উন্নয়নের ধারা থেকে, তারা জানে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই তারা একটা ‘কারণ’ খুঁজে পেয়েছে নারী জাতির গোষ্ঠী উদ্ধারের জন্য, যেমন প্রতিটি ওয়াজেই নারীকে তীক্ষ্ণ ও অশ্লীল বাক্যবাণে জর্জরিত করা হয়, তেমনি যেন এই পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম কোন পরকীয়ার ঘটনা ঘটলো, যেন পুরুষ জানেই যে পরকীয়া শব্দটি আসলে কী, কীইবা এর রকম-সকম! এদের উল্লম্ফন দেখে প্রায়শই মনে শংকা জাগে, প্রয়োজনে কাঠমোল্লাদের সহায়তা নিয়ে আবারও নারীদের হেঁশেলে ঠেলে দিতেও এরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। কে জানে হয়তো তলে তলে সেই ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে কীনা নারীদের জন্য!

খুব ভয়ে আছি, আতংকে আছি, এক পরকীয়া শব্দের কারণে বাংলার তাবৎ প্রগতিশীলকুল যেভাবে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন, নারী সংগঠনগুলো পর্যন্ত টুঁ শব্দটি করছে না, তাতে করে মিতুর কোনো বড় রকমের বিপদ না হয়ে যায়!

সাদা চোখেই তো নারী-পুরুষের প্রতি সমাজের বা একটি রাষ্ট্রের মনোভাব স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে।

মিতুর ঘটনার রেশ মিলিয়ে না যেতেই সামনে চলে এসেছে এক শিশুকন্যাকে পিতার ধর্ষণের ঘটনা। এখানে পিতা হলো ঘটনার মূলে, তাই সমাজ আবার শীতঘুমে চলে গেছে। এই কদিন তারা এক নারীর মূলোৎপাটনে এতোটাই নির্ঘুম রাত কাটিয়েছিল যে, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। এবার মামলা হওয়ার পরও সেই অভিযুক্ত বাবা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে মুক্ত হাওয়ায় আর দফায় দফায় ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অপরাধ ঢাকতে নানা কাহিনী বলে যাচ্ছে, নিজের সাবেক স্ত্রীর চরিত্রহনন করছে। একশ্রেণির মিডিয়া আবার সেই অভিযুক্তকে স্পেসও দিচ্ছে এগুলো বলার জন্য।

হায়রে নষ্ট সময়ের নষ্ট মানুষেরা! তারা জানেও না কী ধরনের পচা-গলা গন্ধ বেরুচ্ছে তাদের এই ধরনের পেশাগত আচরণে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 480
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    480
    Shares

লেখাটি ১,৬৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.