শিশু ধর্ষণ বন্ধে চাই আইনের সংশোধন ও প্রয়োগ

0

নায়না শাহ্‌রীন চৌধুরী:

অনেকদিন পর লিখতে বসলাম। লিখে লাভ হয় কিনা বা সমাজ, আইন পরিবর্তিত হয় কিনা জানি না। একটু আয়না দেখানো যায়, একটু ক্ষোভ, কষ্ট প্রকাশ করা যায়, এইটুকুই। আর দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে, মানুষ হসেবে অথবা একজন নারী হিসেবে বা একজন মা হিসেবে কিছু কথা বললে কারো কিছু যায় বা আসে না হয়তো, তবু একটা প্রচ্ছন্ন আশায় ভাবি, হয়তো আঁধারগুলো কাটবে, আমরা আবার নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে পারবো। আমাদের ফুলের মতো শিশুদের নিষ্পাপ হাসিতে স্বর্গ পৃথিবীতে নামবে।

বেশ কয়েক বছর যাবৎ লক্ষ্য করে আসছি, এদেশে শিশু নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি পত্রিকার পাতায় দগদগে ঘায়ের মতো উঠে আসছে।

এই তো দু’দিন আগে প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তার নিজ কন্যা শিশুটির প্রতি নির্মম আচরণের বিবরণ শুনে স্তম্ভিত হয়েছি। মর্মাহত হয়েছি। কিন্তু এ তো নতুন নয়। একটা শিশুকে কামনার দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা তো এদেশের অনেক পুরুষের মধ্যেই বিদ্যমান, তা কিছুদিন আগে ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায় ছাদ থেকে দুটি শিশুকে মেরে ফেলার ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। দেখায়, দুধের শিশুকে মায়ের পাশ থেকে চুরি করে ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করার ঘটনায়। পূর্ণিমা শীলের ঘটনা কি ভুলে যাওয়ার মতোন? এরপর আরও কতো হাজার হাজার পূর্ণিমা হয়েছে, তার হিসাবও তো ভয়াবহ। এই অসহায়ত্ব মেনে দিনের পর দিন মা বা মেয়েদের কেন চলতে হবে? কেন দিন দিন ধর্ষণের খবর, যৌন নির্যাতনের ক্লেদে ভেসে যাবে শৈশব?

মানুষের মনুষ্যত্ব বা নৈতিকতা তৈরিতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় বা আদর্শিক মূল্যবোধ বিশাল ভূমিকা রাখে। আমরা পুরুষ সন্তান জন্ম দিয়ে এতোটাই আত্মহারা হয়ে যাই যে, অনেক সময় এই শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিক আচার আচরণের ভিত গড়ে দেওয়ার সময়টায় ঢিল দিয়ে দেই।

একই সময় মেয়েদের উপর চাপাই এর অতিরিক্ত দায়। সমস্যা হচ্ছে, আপনার মেয়ের বয়স যদি ১০ এর কম হয়, তাহলে তার পরিষ্কার বোঝার কথা না কেন তাকে নির্দিষ্ট পোশাক পরতে বলা হচ্ছে, কেন পুরুষদের থেকে দূরে থাকতে হবে, কেন খেলতে যাওয়া যাবে না, কেন এটা করা যাবে না, কেন ওটা করা বারণ। আর এতো সব বারণ মানা সত্ত্বেও নোংরা স্পর্শ থেকে কতখানি বাঁচানো সম্ভব হয় বা হয়েছে বলতে পারেন?

এখন আপনার পুত্র সন্তানটিকে যদি ছোট থাকতেই মেয়েটির মতোই শেখান, সংযত হওয়া, পরিমিতিবোধ, দায়িত্ব নেওয়ার, পরিশ্রমী হওয়ার; ভদ্রঘরের মেয়ে যদি সন্ধ্যায় ফেরে তাহলে ছেলেটি কি ভদ্র ঘরের নয়? সে কেন গভীর রাতে ফিরছে, তার বন্ধু কে, তাদের বাসায় আসতে বলুন, বুঝুন ছেলেটির সঙ্গী কেমন, তার রুচি, আগ্রহ কোন দিকে! এগুলো খুব সাধারণ বিচার। অনেকেই হয়তো করেন। তারপরও কত ঘটনা ঘটছে চারদিকে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার (বিএমবিএস) মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের তথ্য মতে, ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫.১৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, শিশুর প্রতি সহিংসতামূলক অপরাধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক ও পরিচিতজন মাধ্যমে ঘটছে। তাই এসব ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সবার আরও তৎপর হওয়া উচিত বলে মনে করে সংস্থাটি।

নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। ২০০৩ সালের সংশোধিত আইনে ধারা ১০এ বর্ণিত-
“১০”। যৌন পীড়ন ইত্যাদির দণ্ড: যদি কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে তাহার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহা হইলে তাহার এই কাজ হইবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।

সেভ দ্য চিলড্রেনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যাচেষ্টার মূল শিকার হচ্ছে শিশুরাই। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এমন ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ৩০টি। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ২৮ শিশু। এই হিসাব বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে পাওয়া। প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি হতে পারে।
আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। এদেশে নিপীড়িতের লজ্জা, নিপীড়কের নয়। আর আমাদের আইন কি খুব জোরালো কিছু? আর এর এক্সিকিউশনের প্রতি পদে ভিক্টিমকে লাঞ্ছিত অপমানিত হতে হয়, আর শাস্তি?

আমরা কথায় কথায় উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টানি। ইন্দোনেশিয়ায় শিশু ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের সাথে ধর্ষণকারীকে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে নপুংসক করে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পাশের দেশ ভারতে বারো বছরের নিচে কোন শিশুকে ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। আমাদের সরকার কি পারে না এই ক্ষেত্রে আরেকটু কঠোর হতে? আইনের সংশোধনের সাথে সাথে তার প্রয়োগের প্রতিটি ধাপ প্রভাবশালীমুক্ত দুর্নীতিমুক্ত রাখতে? অন্তত একটি শিশুর জন্য হলেও মানবিক একটা রাষ্ট্র আমরা কি সত্যি আশা করতে পারি না?

শেয়ার করুন:
  • 163
  •  
  •  
  •  
  •  
    163
    Shares

লেখাটি ৩৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.