এক ‘বাবা’ ধর্ষক, আপনি তো নন!

0

আসমা খুশবু:

বাবা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার আর মা স্থপতি, এই আইডেনটিটি একজন দশ বছরের শিশুর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু না, হায়েনারা সব পরিবেশেই আছে এই সত্য আমাদের মনে থাকে না, অথবা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। মানবিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে বাবা মেয়ের, মা ছেলের সম্পর্কে আমরা খারাপ চিন্তা করতেও পারি না। কিন্তু হচ্ছে তো এসব আমাদের সমাজে।

এক একটি ঘটনা ঘটছে আর আমরা মায়েরা হয়ে যাচ্ছি সন্দেহবাতিকগ্রস্থ। কিন্তু এর জন্য দায়ী কে! একটু নিজেদের দিকে তাকান ভাইয়েরা। সেই সময় বোধহয় ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। নইলে আমাদের সত্যিই বোধহয় আর কোন ‘আগামী’ থাকবে না।

বছরখানেক আগে আমার ফেসবুকে লেখা একটি পোস্ট ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ পোর্টালে ছাপা হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিলো, ‘আশাকরি আপনাদের যেন মেয়ে সন্তান না হয়’। মজার ব্যাপার হলো, এই লেখাটি প্রকাশ হবার পর অনেকে কমেন্টে গালি গালাজ করেছে। এমন সব গালি ছিল যে আমি ভয়ে আর পাঠক প্রতিক্রিয়ার পথ মাড়াইনি।
দিন পনেরো আগে লেখাটি আবার রিপোস্ট হওয়াতে যখন আমার কাছে নোটিফিকেশন আসলো, কৌতূহলবশত পাঠক প্রতিক্রিয়া দেখতে গিয়ে দেখলাম এক বছর পরও একই অবস্থা! গালাগালি সমানে চলছে। তবে এবার নতুন সংযুক্তি, গালাগালিতে মেয়েরাও যুক্ত হয়েছে!

যাই হোক, এইসব ইস্যু নিয়ে কথা বলা বন্ধ করেছি বেশ কিছুদিন হলো। কিন্তু আজ এক ভিডিও সব ওলটপালট করে দিলো! আর লেখাটির প্রাসঙ্গিকতা তখনই মনে পড়লো।

এক ডাক্তার দম্পতির ব্যক্তিগত জীবনকে যেইভাবে সবাই মিলে পোস্টমর্টেম করছে, না জানি সিনেমার কাহিনী বর্ণনা করছে সবাই! ডাক্তার সাহেবরা যেভাবে মানববন্ধন করে একজন নারীর মৃত্যুদণ্ড চাইছেন, তাতে তো (পুরুষ) ডাক্তার সমাজের অধিকার সচেতনতায় চোখে পানি চলে আসার উপক্রম! কী আর করা, দ্যান ফাঁসি আপনারা! এই দেশের প্রথম পরকীয়া করা মানুষ ওই ডা. মিতু, যার জন্য কিনা একজন পুরুষ আত্নহত্যা করছে! ফাঁসি হইতেই হইবে।

ভাই, আজকে কয়জন বাবা মানববন্ধন করছেন দেশে! কই কোনো সংবাদ মিডিয়ায় দেখলাম না তো! তবে মিডিয়ায় একটা মজার ঘটনা দেখলাম। একাত্তর টেলিভিশন ‘একাত্তর জার্নাল’ নামে যে অনুষ্ঠান করে সেখানে ধর্ষণে অভিযুক্ত বাবাকে ফোনে নিয়ে আসে। বাবাও মোটামুটি জোশ নিয়ে তার এক্স বউকে দুশ্চরিত্র বলে অনেক বকাবকি করলো, আর সন্তানকে ভালোবাসার কথা বললো। ওদিকে মাকে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক যেইভাবে জেরা করেছে তাতে মনে হয়েছে উনি আসামি পক্ষের আইনজীবী!

বাংলাদেশের মিডিয়া যে পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, এইসব ট্র্যাশ বন্ধ করা এখন মনে হয় সময়ের দাবি। মাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তাঁর শিশু সন্তানের ধর্ষণের কাহিনী! একজন ধর্ষণের আসামী কীভাবে এরকম একটি প্রোগ্রামে এমন উচ্চকন্ঠে কথা বলার সাহস পায়, সেটা আমার মাথায় ঢুকলো না! অবশ্য মাথায় না ঢুকিয়েই বা কোথায় যাবো! এনারা এই একাত্তর টেলিভিশন সব সময়ই নির্যাতনকারীর পক্ষেই সাফাই গেয়ে থাকেন সাধারণত। একজন সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যখন একটি মেয়ে এবিউজের অভিযোগ আনলো, সেটারও কোনো সুরাহা হলো না। কমিটি কী সিদ্ধান্ত নিলো আমরা জানলামও না। আদৌ কমিটি হয়েছে কীনা, তাও জানতে পারিনি! মিডিয়া নীরবে তাকে বিজিত ঘোষণা করে তার পাশে সবাই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো! একাত্তর টেলিভিশন তাকে নিয়ে বেশ গরম টকশোও করছে দেখলাম। নিজের চ্যানেলেও ওই অভিযুক্ত বীরদর্পেই আছে! তো, এদের কাছে আসলেই আর কোনো আশা নেই।

আমার পার্টনার একটা কথা বলে, ‘Law favours mighty’ এই কথা বাংলাদেশের কনটেস্টে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। মানুষের মনে কোন ভয় নাই, অন্যায় করছে বুক ফুলিয়ে।

যাই হোক, আপাদের জন্য দুইটা কথা। চারদিকে অনেক পুরুষ। আপনার মেয়েটি হয়তো নিরাপদে আছে তাদের কাছ থেকে। কিন্তু পাশের বাড়ির মেয়েটির জীবনে যে দুঃস্বপ্নটি এসেছিল তাও কোন পুরুষই ঘটিয়েছিল। নিজের মেয়েকে নিরাপত্তা দেবার চেষ্টা করুন, কাউকে বিশ্বাস করতে গিয়ে নিজের সন্তানের ক্ষতি করেন না, মেয়েকে শেখান নিজেকে রক্ষা করতে। জন্ম যখন দিয়েছেন, আপনারই দায়িত্ব সন্তানকে রক্ষা করার। পাশের নির্যাতিত মেয়েটির পাশেও দাঁড়ান প্লিজ, বলা তো যায় না আপনার ঘরে এমন দুঃস্বপ্ন কখন হানা দেয়!

আর ভাইয়েরা, প্লিজ আপনারা এবার কিছু করেন। এক বাবা ধর্ষক হয়েছে, কিন্তু আপনি তো নন। তার বিচারের জন্য সোচ্চার আপনারাই হোন। আমরা মায়েরা – মেয়েরা যে ভীতি আর সন্দেহের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি, তা একমাত্র আপনারাই পারেন দূর করতে। মানবিক সম্পর্কগুলোকে সম্মান করেন অন্তত।

শেয়ার করুন:
  • 593
  •  
  •  
  •  
  •  
    593
    Shares

লেখাটি ৩,১১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.