নিজেকে ‘সীমাবদ্ধ’ করে ফেলা কেন!

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

শিশুরা ‘পারি না’ কথাটা শেখে পরিবেশ থেকে। ছেলেটা কিছু শেখাতে গেলে এবং কারো গুণপনা বর্ণনা করলে আগেভাগে বলে রাখে, ‘আমি তো অতো ভালো না।’ বা ‘আমি এটা পারি না’ বা ‘আমি কোনোদিন এটা পারবো না’

যে-সব জিনিস সে ঘোষণা করে পারবে না বলে, ঠিক সেগুলোকে পারে, কয়দিনের অভ্যেসের পরে।

পারিও না এ কথাটি বলিও না আর, দেখলাম দিদার কথায় এ ছড়াটা আওড়াচ্ছে সেদিন।

ছড়াটার সরলীকরণের জন্য এর মোক্ষম মেসেজ মার খেয়ে গেছে। করো অথবা করিও না — এই দুই ভাগে জীবনকে শাদা-কালো উপদেশে কি ভাগ করা যায়?

“কেন পারিবে না, তাহা ভাব বারবার” – দ্বিতীয় লাইনের ফাঁকে ঢুকে দেখলাম, এটাই আসল কথা।

কেন পারিবে না-র জবাব নাকি আছে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে সীমাবদ্ধ বিশ্বাসের মধ্যে।

“নিজের সম্পর্কে আপনার সীমিত ধারণা কী?” এ হেন প্রশ্নের সামনাসামনি হয়ে গুনতে বসলাম।

অনেক দিন নিজের সম্পর্কে ধারণা ছিল আমি ‘ইম্প্র্যাক্টিকাল’। কথাটা বলে বলে গল্পটাকে সত্যি করে তোলা গেছে মনে মনে। আমি অন্যমনস্ক এটা শুনেছি অনেকের কাছে। সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে দেখি যারা বলছেন, তাদের জরুরি ব্যাপার ভুলে যাবার প্রবণতা অনেক বেশি আমার চেয়ে। ভুলো বিজ্ঞানী বলে একটা কথা চালু আছে। বিজ্ঞানের পেপার লিখতে তাঁকে যা যা মনে রাখতে হয়, তা যদি সকলের হতো। তাহলে হয়েছিল।

এদিকে গরু চরানো, ঘাস খাওয়ানো, কতো ধানে কত চাল গুনে গুনে গুদামে রাখা, গুদাম থেকে বাজারে নেওয়া, বিক্রি করা, মহাজনের সুদ গুনে শোধ করা, চারাগাছের বীজতলা তৈরি, বৃষ্টিতে চাষ, জলরোদ ঠেঙিয়ে ধান আগলে রাখা, পঙ্গপাল ঠেকানো — সব করেও দেখি চাষীকে লোকে বলে ‘চাষা। ও কী জানে?’

চাষি শুনে বলেন, আমি মুখ্যুসুখ্যু বোকা মানুষ, কী আর জানি?

কারো কারো সীমাবদ্ধ ধারণা, তাঁরা পরীক্ষায় ফেল-করা টাইপের। সব পরীক্ষা পাশ করে এখনো তাঁরা ফেল করার ভয় পায়।

নিজের সম্পর্কে ‘সীমাবদ্ধ ধারণা’ গুনতে গিয়ে দেখি আঙুলে কুলাচ্ছে না। এতো গল্প আমাদের সঙ্গে চুম্বকের মতো আটকে গেছে।

ভেবে দেখি, মেয়েরা কেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানে পড়ে না। রকেট-বিজ্ঞানী হয় না। বিয়ের পরে পড়াশুনো ছেড়ে দেয়। মাইনে কম হলেও কাজ করতে থাকে। ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করে। নিজের বুদ্ধিকে পাশের সমস্ত ছেলের চেয়ে কম মনে করে। মেনে নেয় তাদের জীবনে আমোদ, খেলা, শরীরচর্চার কোনো জায়গা থাকা জরুরি না। তারা টেকনিকাল ব্যাপারে কম বুদ্ধি ধরে। তাদের কথার কোনো দাম নেই। তাদের দান সংসারে এমনিতেই প্রাপ্য। কৃতজ্ঞতা বা স্মরণে রাখার যোগ্য তারা নয়। চেহারা সুন্দর না হলে তাদের কেউ কদর করবে না। তাদের বিশ্রামের দরকার নেই। তাদের দুনিয়া উদ্ধার করতে হবে।

ইত্যাদি তালিকা একটু ওলটপালট করে নিলে সকলের হাতেই কিছু সীমাবদ্ধ ধারণা উঠে আসবে।

শিখছি, এগুলোর বীজ আমাদের চিন্তার মধ্যে উড়ে এসে পড়েছে আর লালিত হয়েছে। বিশ্বাসগুলোকে আমরা বাস্তব করে তুলেছি। এগুলো আমাদের দোষের নয়। এই গল্পগুলোকে সম্পাদনা করে পালটে প্রকাশ করা যায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 176
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    176
    Shares

লেখাটি ৮০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.