আরোপিত দাম্পত্য এবং পরকীয়া

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

দাম্পত্য সম্পর্কের মতো জটিল আর ঠুনকো সম্পর্ক পৃথিবীতে আর একটিও নেই। অথচ প্রাচ্যের অনেক সমাজেই এই সম্পর্কটিকে ইনিয়ে বিনিয়ে পবিত্র বন্ধন, সাত জন্মের সম্পক্ক, জনম জনমের সাথী এইসব নানবিধ উপমায় ভূষিত করা হয়।এর মূল উদ্দেশ্যই হলো একবার কাগজে সই করেছ কি সারাজীবনের জন্য গলার ফাঁস হয়ে ঝুলে থাকো। এই ঝুলে থাকার নামই প্রেম, ঝুলে ঝুলে ছিঁড়ে যেতে যেতে বেঁচে থাকার নামই ভালোবাসা, এই ছেঁড়া তারকে প্রতিদিন একটু একটু তেল জল দিয়ে জোড়া লাগানোর নামই জীবন!

সাত জন্মের এই সঙ্গীর সাথে থাকাকালীন অন্য কোনো পুরুষকে কিংবা অন্যকোনো নারীর সাথে কোনোরূপ সম্পর্কে একমাত্র আদিম সমাজ ছাড়া অন্যকোনো সমাজ গ্রহণ করেনি। দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই পলিগ্যামাস। আপাত দৃষ্টিতে খুব সুখী দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে থেকেও একজন নারী কিংবা একজন পুরুষ অন্য একটি সম্পর্কে জড়াতে পারেন। মানুষ বৈচিত্র্যময়তা ভালোবাসে, যৌন আনন্দের ক্ষেত্রে অনেক বেশি চায় বৈচিত্র্য! আমরা একই পোশাক যেমন প্রতিদিন পরতে চাই না, একই খাবারও প্রতিদিন খেতে ভালোবাসি না, একই জায়গায় প্রতিদিন বেড়াতেও যাই না। এই ব্যাপারটিও তেমন। কিন্তু সমাজের আরোপিত নিয়মে আমাদেরকে একই মানুষের সাথেই থাকতে হয় আমৃত্যু! এটি তো গেল সহজাত প্রবৃত্তির কথা।

আমাদের সমাজে অসুখী দাম্পত্যজীবন, অযৌন জীবন যাপন করা নারী-পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেক নারীই সারাজীবন বিবাহিত থেকেও হিন্দু বিধবার মতো জীবন যাপন করে, এদের নিয়ে কোনো গবেষণা হলে এর সংখ্যাও আহত হবার মতোই! একইভাবে কোনোরূপ পরিসংখ্যান ছাড়াই পুরুষের অযৌন জীবন? একথা পুরুষ নিজেই কখনও ভাবতে পারবে?

সম্পত্তির অধিকার, সন্তানের উত্তরাধিকার, বংশ পরিচয় ও সুরক্ষার ক্ষেত্রেই একদিন সমাজে বিবাহ প্রথা এবং একগামিতার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠান চলমান রয়েছে সমাজের হিতকররূপেই আবর্তিত হয়ে, পাশাপাশি আমাদের সমাজ সামাজিকভাবেই বহুগামিতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বহুবিবাহের মাধ্যমে। যেখানে সম্পদশালী পুরুষেরা কারণে অকারণে বহুবিবাহ করতেন ডাল-ভাতের মতো। রাজ- রাজা, জমিদারদের কথাতো ইতিহাস জানে! বাগানবাড়ি আর নারীর গল্প ছাড়া আমাদের রাজাদের, জমিদারদের নিষ্কলঙ্ক শাসনামল ভাবা যায়?

বলাই বাহুল্য এই বহুবিবাহ ছিল পুরুষের জন্য জায়েজ! অর্থাৎ, সমাজ পুরুষের যৌন তৃষ্ণা নিবারণে একাধিক নারীকে বৈধতা দিয়েছিল ধর্মের নামে, পরিবারে প্রয়োজনে কিংবা উত্তরাধিকারের প্রয়োজনে। নারীকে সেই স্বাধীনতা দেয়নি! রাজাদের মতো অন্তপুরে রানীমাতাদের অবাধ যৌনাচারের রেওয়াজ ছিল না। যদিওবা দু’একটি ঘটনা মাথাচারা দিয়ে উঠেছে তৎক্ষণাত তার ন্যায্য বিচারও হয়েছে, হয় মৃত্যুদণ্ড নয় বনবাস! আর সে কারণেই আজ মিতুর বিরুদ্ধে ডাক্তারসহ সারাদেশের জনতার এতো আক্রোশ!

আকাশের মৃত্যুতে সারাদেশ ফুঁসে উঠছে, কারণ, এই ধৃষ্টতা দেখিয়েছে এই সমাজের এক নারী! অবশ্যই মিতু অন্যায় করেছে, সে বিবাহ চুক্তির শর্তাবলী ভঙ্গ করেছে, সেকারণে তাঁর পার্টনারশিপ বাতিল হতে পারে। বিচ্ছেদ হতে পারে। তবে পরকীয়া করার জন্য আইনত সে কোনো শাস্তি পেতে পারে না। দুজন নর-নারী স্বেচ্ছায় যৌন আনন্দ ভোগের লক্ষ্যে একত্রবাস করলে আমাদের সমাজে সেটা অন্যায় হলেও আইনত এর জন্য কোনোরুপ পেনাল কোড নেই।

আমাদের সমাজে এই পরকীয়া আদি থেকেই ছিল, এখনো আছে, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই! সমাজ বহুগামী হয়ে গেল, জাত গেল জাত গেল বলেও হা হুতাশ করার কিছু নেই। কারণ দুজন ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত রুচি, এবং মনের ইচ্ছার ব্যপার এটি! আপনার-আমার এই বিষয়ে নাক গলানোর আদতেই কিচ্ছু নেই। রাষ্ট্রেরও কিছুই নেই যে সেটার প্রমাণ পেনাল কোডেই এই বিষয়ে শাস্তির বিধান নেই!

এবার প্রশ্ন করি তাহলে আমরা কেনো এই বিষয়ে এতো উত্তেজিত হচ্ছি? মিতু একজন নারী বলেই কি? আকাশ সাহেব মিতুকে কেনো তালাক দিলেন না? আত্মহত্যা কি তিনি করলেন একজন নারীকে অবদমিত না করতে পারার লজ্জায়? না কি স্ত্রীর জন্য ভালোবাসায়? মরে গিয়েই কি তিনি মহান হয়ে গেলেন? এসব প্রশ্ন অবান্তর নয় একেবারেই।

এবার নিশ্চয়ই বলবেন আমি পরকীয়াকে সমর্থন করছি! তার আগে আরেকটি প্রশ্ন করবো, আপনারা যারা চিল্লাচ্ছেন, জাত গেছে জাত গেছে বলে, তাঁদের ক’জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আপনারা আপনাদের জীবনে কেবল একজন নারীতেই আছেন! আমাকে নয়, নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন। জবাব পেয়ে যাবেন। সুতরাং শান্ত থাকুন।

বলছি আবারও, কে, কেনো কার সাথে বিছানায় যাবেন এবং যাবেন না সত্যিই এতে আমার-আপনার কিছুই বলার নেই! নারী বলেই কাউকে নেংটো করার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই! এই বৃত্ত থেকে বের হতেই হবে! ভারতীয় উচ্চ আদালত কিছুদিন আগে পরকীয়া সংক্রান্ত রায়ে বলেছে- এই বিষয়ে রাষ্ট্রের দায় নেই, এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার! আমিও তাই বলি- আমাদের নয়, এটা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 348
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    348
    Shares

লেখাটি ২,৩৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.