নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার – ৩

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

আগের দুটো লেখা পড়েছেন, শেয়ার করেছেন কেউ কেউ। এবং একই সঙ্গে লিখিতভাবে আরো জানার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

প্রথম লেখাটির লিঙ্ক নিচে আরেকবার দেওয়া হলো সুতো হিসেবে,

https://womenchapter.com/views/29638

আমরা যদি নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার সনাক্ত করতেই না পারি, তাহলে সেটার সঙ্গে মোকাবেলা করা সম্ভব না।
সেই কারণে সচেতনতাই প্রথম ধাপ। ঘুমন্ত অবস্থায় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

আত্মকেন্দ্রিক মানুষও আছেন। কিন্তু তাঁরা হয়ত সকলেই নারসিসিস্ট নন। আত্মকেন্দ্রিক নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ, অথবা নিজেকে ঘুরেফিরে ফোকাস করতে ভালবাসেন, কিন্তু এটা শেষ পর্যন্ত অতোখানি ভারসাম্যহীনতা নাও হতে পারে, অন্তত ডিসঅর্ডার নয়। কিন্তু নারসিসিস্টদের সিগনেচার হল তারা অন্যদের ফালতু প্রতিপন্ন করতে ভালোবাসেন। তারা নিজেকে ছাড়া কাউকে প্রশংসা করতে পারেন না। কিছুতেই কৃতজ্ঞতা জানাতে পারেন না মন থেকে।

যেমন ধরুন, দৃষ্টান্তস্বরূপ, “ঝ” একটি সমাজহিতৈষণার কাজ করছেন মন খুলে। নারসিসিস্টরাই আগেভাগে সেই কাজে গিয়ে
ছাই ঢালবেন। “ঝ” এর প্রশংসা তো করবেনই না, উল্টো, তুলোধুনো করবেন।

নারসিসিস্ট এই তুলোধুনো করার কাজটা বিশেষ করে কোডিপেণ্ডেন্টদের ওপর করে থাকেন। কোডিপেন্ডেন্টরা খুব সহজেই তুলোধুনো হন। নারসিসিস্টের মতামতের ওপর তাঁদের অগাধ আস্থা। কোডিপেণ্ডেন্টরা সাধারণত পরমত-কাতর।

নারসিসিস্টরা সচরাচর নিজেদের চিহ্নিত করতে পারেন না। তাই তাঁরা এর চিকিৎসা করাতে গেলেও নিজের এই বিশেষ দিকগুলো সৎভাবে ডাক্তারের কাছে তুলে ধরবেন, এমন আশ্বাস নেই। তাঁদের আত্ম-সচেতনতার বিশেষ অভাব।

আপনার বাসায় আপনি হয়ত নিমন্ত্রণ করে, মাথায় তুলে, খাইয়ে, পাখা করে, পান গুঁজে টাটা করে দিলেন, চেষ্টার ত্রুটী করলেন না। আত্মকেন্দ্রিক বলবেন, ‘দেখলে আমাকে সেদিন কতো সুন্দর করে খাওয়াল? আমি বলেই করল!’ আর নারসিসিস্ট বলবেন, ‘হুম, সুন্দর করে খাওয়াতে চাইছিল কিনা জানি না, আসলে মাছ ভাজাটা খুব বিস্বাদ ছিল — এরা আসলে ফালতু পার্টি।’

অর্থাৎ নারসিসিস্টরা কারো মধ্যে খাঁটি সুন্দর জিনিস খুঁজে পান না, স্বীকার করেন না। নিজেদের বড়ো করে তোলার জন্য তাঁদের অন্যদের খুদে, তুচ্ছ হিসেবে দাখিল করার দরকার হয়।

নারসিসিস্টদের পাল্লায় যারা পড়েছেন তাঁদের সাধারণত অর্থ, বিত্ত, চেতনা, আত্মসম্মান, স্বাস্থ্য, আশা ভরসা, সাধ ও স্বপ্ন সব নিঃশেষ হয়ে গেছে। যারা তাঁদের সত্যি সত্যি পাল্লায় পড়েছেন, তাঁরাও এক ধরনের বিশেষ ব্যক্তিত্বের লোক — যাদের বলা হয় কোডিপেন্ডেন্ট।

গত লেখায় ওপরের লিঙ্কে কোডিপেন্ডেন্ট নিয়ে একটা লেখা দিয়েছিলাম, কারণ কোডিপেন্ডেন্স চিহ্নিত করতে না পারলে নারসিসিস্টদের সমস্যার কোনো সমাধান নেই। নিচের লেখায় সেই দ্বিতীয় দফার লেখা আবার দেওয়া হলো-

https://womenchapter.com/views/29671

যদি কেউ ভাবেন কোডিপেন্ডেন্সি না চিনে সোজা নারসিসিস্টদের নিয়ে লেখা সম্ভব, তাহলে সেটা ভুল। কোডিপেন্ডেন্টরা কোডিপেন্ডেন্ট বলেই নারসিসিস্টরা তাঁদের প্রতাপ খাটাতে পারেন। কাজেই প্রথমত কোডিপেন্ডেন্সি চিহ্নিত করে এবং দীর্ঘ অভ্যেসের মাধ্যমে ঘুচিয়ে ফেলতে হবে। কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। সারা জীবন চর্চার বিষয়।

নিজের কোডিপেন্ডেন্সিকে সামাল দেবার জন্য কয়েকটা টিপস হলো,

১। যেসব মানুষ অন্য মানুষকে হেয় করে কথা বলে, তাঁদের সঙ্গে কথা না বলা, অথবা সে ধরনের নেতিবাচক আলাপে না থাকা।

২। নিজের প্রতি ভালোবাসা অভ্যেস করা।

নিজের ব্যথা উপেক্ষা না করা। নিজের রাগের সঙ্গে ঝগড়া না করা। নিজেকে নিয়ে লজ্জা না পাওয়া। নিজের অতীত থেকে কোডিপেন্ডেন্সির বীজ কবে কীভাবে এসেছে তা বুঝতে পারা।

অনবরত নিজেকে ঠিক একটি কোমল শিশুর মত স্নেহ ভালোবাসা দেওয়া। নিজেকে নির্দয় ধমক না দেওয়া।

কেউ ব্যথা দিলে তাঁর সঙ্গে গলাগলিতে না যাওয়া। সে যেই হোক না কেন।

৩। অন্যদের বিষয়ে নাক না গলিয়ে, দুনিয়ার সব কিছু নিজের ঘাড়ে না নিয়ে, নিজে নিজের ঠিক কাজ, ঠিক চিন্তা ও সঠিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা।

৪। নিজে যে বোঝা নিতে পারবো না বলে মনে হয়, তা ঘাড়ে না নেওয়া। সহজভাবে কথা বলে সমস্যা মিটিয়ে নেওয়া। নিজের মতামত অন্যদের পরিষ্কার করে জানানো। নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে, সীমারেখা, বারবার সকলের সামনে সরল স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরা।

৪। ভালো থাকার একটা এসিড-টেস্ট হলো, ভালো ফিল করা, শরীরে কোনো অসুবিধে ভোগ না করা, প্রাণ খুলে হাসতে পারা, শান্ত থাকতে পারা। ভালো নেই, তার লক্ষণ, অক্ষমতা বোধ, রাগ ও ক্ষোভ, ও নিজের খারাপ থাকার দায় অন্যর কাঁধে চাপানো।

৫। এই সচেতন অভ্যেসের কাজগুলো সহজ না, কারণ মনের জোর আর নিজের কাছে দারুণ কমিট্মেন্ট লাগে।

৬। ভালো কথা হলো, নিজের শরীর, মন, আত্মার দেখভাল করলে বাইরে তার শুভ ছাপ পড়বে।

৭। যাদের সঙ্গে থাকলে ভালো ফিল করা যায়, নিজেকে অন্য কেউ হয়ে থাকতে হয় না, প্রাণ খুলে হাসতে পারা যায়, তেমন মানুষের সংগেই থাকা।

৮। সেরকম মানুষ না পেলে প্রকৃতির সাহচর্য ও ভালো ফিল করার মতো পরিবেশে অনেকটা সময় কাটানো।

৯। নেতিবাচক পরিবেশ থেকে, নেতিবাচক চিন্তা, অভ্যেস থেকে দূরে থাকা।

১০। নিজের হবি, ক্যারিয়ার, প্যাশন, স্বাস্থ্যচর্চা, নিজের পুরনো বন্ধু, এই সব যদি ভালো, উষ্ণ, ফিলিং দেয়, সেসবের কাছে (ফিরে) যাওয়া।

নারসিসিস্টদের সঙ্গে খুব কাছ থেকে মোকাবেলা যদি করতেই হয়, তাহলে উপায় হলো গ্রে-রক থাকা। এর অর্থ, নিজেকে একটা নিছক প্রাণহীন, রঙহীন পাথরের মতো একঘেঁয়ে করে তোলা (শুধু নারসিসিস্টদের কাছে)। অল্প কথা বলা, অল্প আলাপ করা, প্রশ্ন করলে খুব সাধাসিধে রংহীন উত্তর দেওয়া। এটা দীর্ঘ দিন করতে থাকলে নারসিসিস্টরা তাদের অসুস্থতা অর্থাৎ নারসিসিজমের খোরাক পাবেন না। কিন্তু এই অভ্যেসে লেগে থাকা চাই।

উদাহরণ:

না: আজ কী করলে?
কো: তেমন কিছু না। খেলাম, ঘুমালাম, কাজে গেলাম।
না: কাজে বস কিছু বললো?
কো: তেমন কিছু না। এই রোজকার মতোই।
না: কী গরম পড়েছে। এসি চালাও নাই এখনও!
কো: ও হ্যাঁ, ভুলে গেছি।
না: আজকাল যে গান শুনতেছো না, মন খারাপ?
কো: এমনি, অন্য কিছু শুনি।

নিজেকে কীভাবে বোরিং করে তোলা যায়, তার ঢের বুদ্ধি আছে নিশ্চয়ই। আসল ব্যাপার হলো, কোনো ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া না করা। বিশেষ আগ্রহ অথবা অনাগ্রহ কোনো কিছুই না দেখানো।

**এটি একটা একাডেমিক পোস্ট। লেখক একজন একাডেমিক, সজাগ ও অনুসন্ধানী মানুষ মাত্র। ভালো করে জানতে হলে এক্সপার্ট মতামত ও লেখা নেটে পাবেন। কাউকে উদ্দেশ্য করে এই লেখা হয়নি। দুঃখ পেয়ে থাকলে ক্ষমা চাই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 143
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    143
    Shares

লেখাটি ৮২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.