নারীর প্রতি কতোটা সহিংস, কতোটা অসহিষ্ণু এই সমাজ!

0

সামিনা আখতার:

ডা. আকাশ এবং ডা. মিতুর ঘটনার পর মিতুর বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে গালিগালাজ আর মানববন্ধনের মতো কাজগুলো থেকে আর একবার বোঝা যায়, নারীর প্রতি কতোটা সহিংস, কতোটা অসহিষ্ণু এবং কতোটা ক্ষুব্ধ এই সমাজ।
মিতু যেন এই সমাজের সবচাইতে বড় অপরাধী!

প্রতিদিন যে অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, কই, কাউকে তো মানববন্ধন করতে দেখি না। কোন কোন অনলাইন পত্রিকার শিরোনামে মিতুর নামের সাথে অনেক বিশেষণ লাগানো হয়েছে। অথচ কিছুদিন আগে একটা খবর ছাপা হয়েছিল কোন এক পত্রিকায়, একজন পুরুষ ৯৪ বা এরকম অনেকগুলো বিয়ে করেছে। আমার যতদূর মনে পড়ে ওই পুরুষটির হাস্যরত একটি মুখ ছাপা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে কোন বিশেষণ লাগানো হয়নি।

তা থাকবে কেন! সেতো পুরুষ! এমন তো করতেই পারে! সমাজের সমস্ত ভোগবিলাস তো পুরুষের জন্য।
তার এই এতোগুলো বিয়ের মাধ্যমে কতগুলো নারীর জীবন কোথায়, কী হোলো, কতজন সন্তানকে প্রাণে বাঁচাবার জন্য ভয়াবহ জীবন যুদ্ধে নামলো, কতজনকে আশ্রয় নিতে হলো পতিতা পল্লীতে, তার হিসেব এই সমাজ রাখতে চায় না।

তা রাখবে কেন! বড় মুখোশধারী এই সমাজ!

সামিনা আখতার

অন্যদিকে মিতু কতটুকু অপরাধী তা কিন্তু এখনও প্রমাণিত হয়নি, অথচ একদল মানুষ সুযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এনজিওতে কাজ করার সুবাদে বহুবার এই সমাজের সবচাইতে নিগৃহিত যেসব নারী, যাদেরকে এই সমাজ পতিতা বলে ডাকে, তদের সাথে কাজ করার/কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সিডরের পর মোংলা পতিতা পল্লীতে গিয়েছিলাম মনোসামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের জন্য। কথা হয়েছিল অসংখ্য কিশোরী, যুবতী, বৃদ্ধা নারীর সাথে। এই নোংরা সমাজ আর মুখোশধারী পুরুষগুলোর আসল চেহারার জলন্ত দলিল হলো ঐসব এক একজন নারী।

ওইসময় একদিন পতিতা পল্লী থেকে বের হওয়ার মুখে দেখলাম কয়েকজন কিশোর ছোট্ট একটি উঠোনে খেলছে। অথচ অদূরেই দেখা যাচ্ছিল একটা খেলার মাঠ। ওদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। যখন ওদেরকে নিয়ে গোল করে বসলাম, দেখলাম ৪/৫ জনের সবাই মাটির দিকে তাকিয়ে মাটি খুঁটছে। এতোদিন পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করা আমিও যেন খেই হারিয়ে ফেললাম।
বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কোথা থেকে শুরু করা যায়! যাহোক, ওদের সাথে কথা বলে জানলাম, ওই অদূরের মাঠে ওরা খেলতে যেতে পারে না, ওদেরকে লাথি দিয়ে বের করে দেয়া হয়, কারণ ওরা ‘খারাপ সন্তান’। ওই ৪/৫ জনের প্রত্যেকেই খুলনা বা বাংলাদেশের অন্য শহরগুলোতে নিজেদের পরিচয় গোপন করে বোর্ডিং বা হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে, যার খরচ চালায় এই মায়েরা। কিন্তু সিডরের পর উপার্জন শূন্যের কোঠায় নেমে আসলে ওদেরকে ফিরিয়ে আনা হয়।
আমরা সবাই জানি, এই ‘খারাপ সন্তান’ বলে পরিচিত মানব সন্তানগুলো আসলে কার! এই সাজানো সমাজেরই কারও, যাদের আছে সুন্দর সাজানো সংসার। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চপদ দামি গাড়ি। সুন্দর পোশাক পরে যারা দিনের আলোতে বুক টান টান করে ঘুরে বেড়ান।

অন্যদিকে পতিতা পল্লীগুলো হলো এক একটা খোঁয়াড়, যেখানে পশুদের মতো থাকে নারীরা। এই বিশাল ব্যবসা চালানোর জন্য একদল পুরুষ এই নারীদেরকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এর ক্রেতারা ভালো করেই জানে এই দুর্বল নারীরা কোনদিনও তাদের নাম প্রকাশের ক্ষমতা রাখে না। আর তাই এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য কিন্তু হয় না। ভোগবিলাসের এই বলিষ্ঠ ব্যবস্থাকেই বা নষ্ট করতে চায়, বলুন!

শুধু বিপত্তি বাঁধে তখন, যখন প্রচণ্ড নির্যাতনের চাপে হলেও মিতুর মতো একজন নারী স্পষ্ট ভাষায় বলে, হ্যাঁ শোভনের সাথে, মাহবুবের সাথে হোটেলে গেছি, প্যাটেলের সাথে যৌন সম্পর্ক করছি, যাহ!
এই পূতপবিত্র ব্রাহ্মণ্য সমাজ কি এতোটা চপেটাঘাত সহ্য করতে পারে, বলেন! তাই তো স্লোগান উঠে ‘মিতুর ফাঁসি চাই’।
নারীর এতো বড় স্পর্ধা! স্বামী থাকতে নিজের ইচ্ছায় দু’তিনজন পুরুষের সাথে রাত কাটাবে!
নারী সবসময় চলবে পুরুষের ইচ্ছায়। যেমন অনেক শিক্ষার দরকার নেই, ক্লাস ফোর-ফাইভ পড়লেই হলো, যাতে ৬০/৭০ বছরের এক বৃদ্ধ চাইলেও তাকে যে কোনো সময় বিয়ে করতে পারে। নির্যাতনের চরমসীমায় পৌঁছে সে পারলে চলে যাবে পতিতালয়ে; চুপচাপ, যাতে পুরুষের ভোগবিলাসের কোনো ব্যত্যয় না ঘটে।

অবাক লাগে, এই মুখোশরূপী সমাজটার সমর্থক একদল মানুষ, কিন্তু মিতুর সাথে সাথে নারীবাদ এবং নারীবাদীদের উপরও একচোট নিয়ে নিচ্ছেন। সেটা তো হবেই, কারণ এমন মওকা তো আর সহসা পাওয়া যায় না তাই না!

আমি জানি না এরা জানে কিনা যে নারীবাদ শুধু নারীর কথাই বলে না। নারীবাদ পুরুষের কথাও বলে। দীর্ঘদিন একসাথে বাস করা প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুতে একজন পুরুষ প্রাণ খুলে কাঁদতেও পারে না এই ভয়ে যে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ব্যাঙ্গ করবে, বলবে ‘মেয়েলী’। সুতরাং বুক ফেটে গেলেও কেঁদো না, বরং বিশ্বাস করো, ‘ভাগ্যবানের বউ মরে’। নারীবাদ এই হতভাগ্য পুরুষটির পক্ষে দাঁড়িয়ে বলে, এই সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একটাবার প্রাণ খুলে কাঁদো!

নারীবাদ বিবাহ নামক সামাজিক সম্পর্ককে দেখে পূর্ণবয়স্ক দুটি মানুষের স্বাধীন এবং সজ্ঞান সম্মতির ভিত্তিতে। টাকায় কেনাবেচা নয়। মিতু আর আকাশের বিয়েতে ছিল বিশাল অঙ্কের এক দেনমোহর।
কিন্তু যারা দেনমোহরের পক্ষে বলবেন, তারা তো জানেন দেনমোহর শোধ করতে হয়, সুতরাং সাধ্য অনুযায়ীই দেনমোহর ধার্য্য হবে। তাহলে আকাশ ৩৫ লক্ষ টাকা দেনমোহর করেছিলেন কেন? তিনি কি প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন? যেভাবে অন্য হাজার হাজার নারীকে এই প্রতারণা করা হয়, তেমন!
আর যদি সামর্থ্য থেকেই থাকে, তবে বিচ্ছেদ করেননি কেন! তার মানে মিতুকে শায়েস্তা করাও কি তার অভিপ্রায় ছিল? কেউ কেউ অবশ্য মিতুর প্রতি তার অগাধ ভালবাসার কথা বলছেন! কিন্তু নির্যাতন করে বের করা মিতুর স্বীকারোক্তির ভিডিও কিন্তু সে প্রমাণ দেয় না। বরং মিতুকে অত্যাচারের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়। এবং এরকম একটা ভিডিও করার পর আত্মহত্যা করাটা কেমন যেন বেখাপ্পা লাগে।

তবুও ওই একটা ভিডিও বা সামাজিক মাধ্যমে আসা মতামতগুলিই সবকিছু নয়। বিষয়টি আরও চুলচেরা অনুসন্ধানের দরকার বলে মনে করি।

আর যে কথাটি বেঁচে থাকা মানুষের জন্য না বললেই নয়, এই সমাজে বেঁচে থাকতে হলে আপনি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস বা অন্য যে কোনখানে ঠিক আপনার মনের মতো সবকিছু পাবেন না, সে কথাটি মনে রাখতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে, অসংখ্য প্রতিকূলতার মুখোমুখি আপনি হবেন, তাই বলে আত্মহত্যাকে সমাধান হিসাবে দেখা যাবে না। আপনি যে এঙ্গেল থেকে একটি বিষয়কে দেখছেন, তা হয়তো আরও অনেক এঙ্গেল থেকে দেখা সম্ভব!

অথবা আজ যে বিষয়কে নিয়ে আত্মহননের পথ খুঁজছেন, সময় নিন, দেখবেন এই বিষয়গুলোকে মনে করেই একদিন হয়তো আপনার হাসি পাবে। জীবন এরকমই!

আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া যে কোনো ঘটনার চাইতে আপনার জীবন অনেক মূল্যবান!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 720
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    720
    Shares

লেখাটি ২,৩১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.