লৌকিক কথা

0

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

কাবিন নিয়ে কিয়েক্টা সরগরম অবস্থা! কিন্তু আমি এ আলাপে কোন উষ্ণতা পাচ্ছি না। কেন?

বিয়ের লৌকিক আলাপ থেকে বিয়ে পর্যন্ত আমার প্রচুর অভিজ্ঞতা। হেতুটাও বলে যাচ্ছি –
মনে করেন নানার বাড়ি এক জেলার এক গ্রামে, শ্বশুরবাড়ি, বাবার বাড়ি, দাদুর বাবারবাড়ি একই জেলার ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে। জামাই এর বোনগুলার বিয়ে হইসে বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। এছাড়াও চট্টগ্রাম এর উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সবখানেই ভয়াবহ সংখ্যার আত্মীয়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রফেশনের পরিচয় মনে করেন হিসাবেও নিলাম না।

আত্মীয় সংখ্যা নিয়ে চট্টগ্রামে অনেকের অবস্থা এরকমই। কারণ খুব সম্ভবতঃ এখানকার মানুষ এলাকার মধ্যেই সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল অতীতে। তার সুফল পেয়ে যাচ্ছি।

মূলকথা- বিয়ের বৈঠক আর কথাবার্তা নিয়ে আমার বিস্তর জ্ঞান, বিস্তর অভিজ্ঞতা। দেখতে যাওয়া, এনগেজমেন্ট, পানছল্লা, ঠিকফর্দ, আকদ, বিয়ে এগুলো মাসে অন্তত দশ বারটা করে দেখেছি। বিয়ে হবার পর থেকে বসছিও।

কাবিন জিনিসটা এতো বেশি নমিন্যাল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধুমাত্র নামে। খুব একটা এক্সিকিউশন নাই। সবাই জানেন আশা করি। আইনিভাবেও এটা নরম্যাল ডেবট এর মতো আদায়যোগ্য না।

ধর্মীয় লৌকিকতা-সহজ করে বলি কাবিন জামাই বউকে দিবে, বিয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে। ডিভোর্স হলেই নয়, না হলেও দিতে হবে। এমাউন্ট কেমন হবে? মিনিমাম আছে, ম্যক্সিমাম নাই। ম্যক্সিমাম যে কোনো কিছু হতে পারে। তবে হ্যাঁ পুরুষদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে তার সম্পদের তিনভাগের একভাগের বেশি পরিমাণ অর্থে বিয়ে না করতে।

সামাজিক লৌকিকতা-কিন্তু আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় এটা আদায় হয় ডিভোর্স হলে, না হলে সেই লিখিত প্রাপ্যটা পায় না। ততদিনে মেয়ের পরিবারের তাবৎ পুরুষ সদস্যের আয় আর নারী সদস্যের শ্রম খেয়ে তরতাজা হয় পাত্রপক্ষ। মেয়েটা পায় না অনেক কিছু। সে আলাপে যাচ্ছি না।

যারা বিয়ের এ কাবিন ব্যবস্থাকে বলছেন, বৈধ প্রস্টিটিউশন বা বিক্রি হয়ে যাওয়া, তাদের অনুরোধ করবো আপনার কাছের যে কোনো নারীকে প্রশ্ন৷ করেন দাদী নানী ভাবি চাচি আম্মা বোন যে কাউকে। কাবিনের অর্থ তাকে দেয়া হয়েছে কিনা? সাথে আরও জিজ্ঞেস করবেন, বিয়ের সময় তাকে গহনা দিয়েছে কিনা? দিলে কী পরিমাণ, আর সেটা তিনি কদিন গলায় কানে ঝুলাইতে পারছিলেন!

ঠিক একমাস, ছ মাস, বছর? এরপরেই জামাইর বিভিন্ন প্রয়োজনে সেটা বেচা হয়েছে। এরপর আপনার আমার কতজনের মা দাদী বোন ভাবী তিন কাপড়ে বছর কাটিয়েছে, সেটা জানেন না? সত্যি? রিয়েলি?

বিবাহের লেনদেনে মেয়ের পক্ষ যেটা দেয়, সেটা তখনি দেয়, বাকি না। বাবা না থাকলেও একটা বোনের বিয়ে দিতে তিনটা ভাই লন্ডভণ্ড হয়ে যায়। জানেন নাকি? আসবাবের বাইরে পাত্রকে স্যুটব্যুট দেয়া হয়, পাত্রের বাড়ির লোকজনের জন্য উপহার উপঢৌকন দেয়া হয়। সেটা কী পাত্রের বিক্রি হওয়া বলতে চাচ্ছেন?

তাইলে এগুলা কী?
চলমান লৌকিকতা। কেউ স্বতঃস্ফূর্ত করে। কেউ লাভ করতে চায়, কেউ মানতে চায় না।

অপছন্দ হলে করণীয় কী?
এক্সপ্রেস এন্ড ইম্পলাইড ডিনাই করেন, সোজা ‘নো’। আপনি যে এমাউন্ট- এর কাবিন দিতে চান না, সরাসরি না করে দিন। যদি রাজি না হয় ওই মেয়ে বা তার পরিবার, তবে তার চৌদ্দ গুষ্টিকে না করুন। রাজি হলে বিয়ে, নাইলে ভদ্র করে একটা বিদায়ী সালাম।

বিয়ের বাজারে কী নাই বলেন তো? ঘর জামাই, বিনা লেনদেনে, বউ কামাবে জামাইর চৌদ্দ গুষ্টিরে চালাবে টাইপ, জামাইর দেয়া গহনা টাকা নিয়ে অন্যজনের কাছে পলায়ন করা রুপসী টাইপ, পিডা খেয়ে ভর্তা হওয়া টাইপ। ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।

আরো কিছু টাইপ সামনে আসতেছে। মনে করেন জামাই থাকবে বিদেশ। জামাইর হেব্বি হেব্বি এমাউন্টগুলা মানে সর্বস্ব সম্পদ বউকে বিশ্বাস করে রাখতে দেয়। খরচ করতে দেয়, দিয়েও দেয়। তারপর কী হয়? বউ এর জামাইর দেয়া সবকিছু ফুয়াদ লাগে, গম লাগে, ভালা লাগে, কেবল জামাইটা ছাড়া। তো, সে করে কী? টাকা পয়সা নিয়ে দেয় সোজা পলায়ন এক্স ওয়াই জেড এর হাত ধরে।

যে ছেলে পাইলো, তার তো লাভই লাভ। সে কিছুতেই এটারে খারাপ ভাববে না। পুরুষ নির্যাতিত এরকম চিন্তাও সে করবে না।

এদিকে জামাই তখন নিঃস্ব। ক্ষুব্ধ। তখন মনে করেন তার ক্ষোভটা আসে নিপতিত নিরীহ মেয়েদের উপর। এমনকি অজানা অচেনা হইলেও। তার সাথে বুঝে না বুঝে জড়ো হয় আরো কিছু পুরুষ। ফলাফল কী? তাদের আম্মাও তাই হয়ে যাচ্ছে তাদের কমন ব্যখ্যায়।

সমাধান কী?
দুনিয়ার কিছু আপনার বা আমার বদলে দিতে হচ্ছে না। যে ধারণা পোষণ করেন, সেই ধারণার মানুষকেই নিজের সাথে জড়ান ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে। আরো সহজে বলি, আপনার নিজের টাইপকে খুঁজে নিন। যা দিতে চান না, তা বলুন, যা নিতে চান না, তাও বলুন।

সমস্যা শেষ।

যদি আপনি নিতে পছন্দ করেন, দিতে নয়, তার উপর বউ বিষয়ক বিদ্বেষ ছড়ান, আবার কাবিন ভাল্লাগে না, বউ এর শ্রম আর তাদের বাড়ির এটা ওটা ভাল্লাগে, তাইলে আর সমাধান নাই।

শেয়ার করুন:
  • 373
  •  
  •  
  •  
  •  
    373
    Shares

লেখাটি ২,৪৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.