দেনমোহরের অপব্যবহার নিয়ে সচেতনতা কেন জরুরি!

0

জাকিয়া সুলতানা মুক্তা:

প্রেমের বিয়েতে দেনমোহর ৩৫ লাখ হয় কীভাবে, ভাই? আর সেই ৩৫ লাখ টাকা যদি দেয়ার ক্ষমতা না থাকে তো সেই দেনমোহর দিয়ে বিয়ে করতে রাজি হওয়াই বা কেন? (তার উপর নাকি আগে থেকেই জানতো কনে বহুগামী!)

যাই হোক, সেই আলোচনায় যেতে চাই না। কারণ কারোর ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর কোন কারণ দেখছি না।
হতেও পারে, কেউ বহুগামী সঙ্গীই পছন্দ করেন বা অন্য কোন কারণও থাকতে পারে।
ওসব আলোচনা থাক।

কিন্তু যে বিষয়টি এখানে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ, তা হলো ‘দেনমোহরের পরিমাণ-৩৫ লক্ষ’ ছিলো!
যা পরিশোধ করার ক্ষমতা ব্যক্তির ছিলো না, তাই সে বিবাহবিচ্ছেদ করার উদ্যোগটা নিজ থেকে নিতে পারেননি বলে সংবাদে জানা যাচ্ছে।

এখন কথা হলো, মুসলিম বিবাহ রীতিতে দেনমোহর তো পরিশোধযোগ্য বলেই জানতাম। এর অন্যথায় বৌ’য়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে তার শয্যাসঙ্গী হতে হয়, এমনটাই জেনে এসেছি(!)।

এদেশের বেশিরভাগ পুরুষেরই তার বৌ’য়ের দেনমোহর ঠিকঠাক পরিশোধ করেন, এমন নজির নেই বলেই শুনি আশপাশের গল্প থেকে। তাই এই ‘ক্ষমাপ্রার্থনা-ভিত্তিক বৈবাহিক শয্যা’ এদেশের অনেক সংসারেই সত্য।

অনেক সময়েই জানা যায়, স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর কাছে এ বিষয়ক কোন দাবি-দাওয়া আছে কিনা লোকে জানতে আসে; অতঃপর স্ত্রীর ‘অপরিশোধিত দেনমোহর’র দাবি ছেড়ে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মৃতের খাটিয়া উঠান থেকে ওঠে।

কথা হলো, দেনমোহর নারীর ভবিষ্যৎ জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা বলে লোকে মেনে থাকেন। ভালো কথা। তাই যদি হয়, তবে যে নারী যত ভালো থাকার সামর্থ্য রাখেন তার রূপ-যৌবন-যোগ্যতা-পারিবারিক ঐতিহ্য সাপেক্ষে, তার দাম তো আকাশচুম্বীই হবে।
৩৫ লক্ষ সেখানে বিস্ময়ের কিছু নাও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যীয় রীতি অনুযায়ী, ঘটনাতো তাইই।
এতে অবাক হওয়ার তো কিছু দেখি না।

এই রীতির কারণে তো শোনা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তির সামর্থ্য থাকা সাপেক্ষে প্রথাগত চার সুন্নতী বহুবিবাহের চেয়েও মাত্রাতিরিক্ত বহুবিবাহের প্রচলন আছে;
অথচ তারই ছেলেসন্তানের যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য না থাকার দরুণ বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরেও অবিবাহিত থাকার রেকর্ড অহরহ।

সেখানেও চুটিয়ে পরকীয়া প্রেমের সংবাদ বহুমুখে প্রায়শই জানা যায় এবং সেসব পরকীয়া অনেকক্ষেত্রে নিজ ঘরে সৎ যুবতী মায়ের সাথেই কখনো কখনো! কী চমৎকার রীতি(!) ওখানকার।
কারণ, নারীকে গৃহবন্দী রাখাই শ্রেয় জ্ঞান করা হয় ওখানে। নারীর ঐ বন্দী জীবনযাপন এবং ঊন মানুষ হয়ে থাকার প্রেক্ষিতেই প্রাসঙ্গিকভাবে আসে এই ‘দেনমোহর’-র গ্রহণযোগ্যতা।

কারণ, নারীরা মধ্যপ্রাচ্যে স্বাধীন জীবন যাপন করে না। তালাকপ্রাপ্ত নারীর একলা জীবন যাপনের সুযোগ তো ওখানে নেইই, থাকে না কোন সামর্থ্যও। কারণ, তাদের এক শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্যতা ব্যতীত আর থাকে ঘরকন্নার যোগ্যতা।

তালাকপ্রাপ্ত হলে সে নারীর একলা জীবন যাপনের সুযোগ-সামর্থ্য কোনটাই না থাকায়, বাবার কিংবা ভাইয়ের বাড়িতে ফিরলে তার নিজের জন্য থাকে কেবল ঐ ‘দেনমোহর’-এর অর্থ।

যা তার বৈবাহিক চুক্তি অনুযায়ী অর্জিত সম্বল এবং বলা যায় তার বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানে দেয়া শ্রমের মূল্য!
ওখানে তাই ‘দেনমোহর’-প্রথার গুরুত্ব রয়েছে এবং তার উপযোগিতাও সেখানে স্বীকৃত।
তাই ঐ রীতিতে কেউ বিয়ে করলে, তাকে এসব মানতে হবে।

এজন্য দেনমোহর স্বীকার করে কোন মেয়ে যদি বিয়েই করেন এবং কোন ব্যক্তি যদি উক্ত দেনমোহর পরিশোধ করে সেই মেয়েকে তার ঘরের বৌ করে আনার সামর্থ রাখেন;
তবে ধর্মীয় আইন অনুসারে শুধু নয়, নৈতিকভাবেই সেই বৌ’য়ের ঐ স্বামীর দাসী (বিশেষ করে যৌনদাসী) হওয়া ব্যতিরেকে আর কোন গত্যন্তর নেই।
কারণ,’দেনমোহর’-র চুক্তিটাই এরকম।

কিন্তু এই মধ্যপ্রাচ্যীয় সিস্টেমের বাহ্যিক আবরণটা লোকে এখনও ধরে আছে, অথচ ভেতরটা জীবনযাপনের প্রথা থেকে বর্তমানে দিয়েছে ছুঁড়ে ফেলে।
দেনমোহর প্রথাটি রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারীকে দিয়েছে তথাকথিত পাশ্চাত্যের স্বাধীনতা!

কেন দিয়েছে?
কারণ, এদেশীয় পুরুষদের নাতিশীতোষ্ণ সামর্থ্য ও যোগ্যতায় মধ্যপ্রাচ্যীয় তেলতেলে সামর্থের জোর নেই।
শুনেছি~
নারীর দৈহিক ওজনে ওখানে ‘দেনমোহর’ হাঁকানো হয়।
এদেশের অধিকাংশ পুরুষেরই সুযোগ নেই মধ্যপ্রাচ্যীয় পন্থায় নারীকে তার মধ্যপ্রাচ্যীয় যোগ্যতার নিক্তিতে মাপা ওজনদার দাম চুকিয়ে ‘ঘরের অলংকার কিংবা দাসী-বাঁদি’ করে ওরকমভাবে রাখার।

তাই এখানে নারীকে দিতে হয়েছে দৃশ্যত পাশ্চাত্যের স্বাধীনতা। (যদিও সত্যিকার অর্থে নারী এখানে মোটেও স্বাধীন নয়।
সে আরেক আলোচনা!)

যাই হোক।
উক্ত নামমাত্র নারী স্বাধীনতার বিনিময়ে পুরুষকেও দেয়া হয় ‘দেনমোহর’ নামমাত্র উল্লেখ করেই নারীসঙ্গমের সামাজিক বৈধতা।
আর তা করা হয় ‘বিয়ে’ নামক একটি সার্টিফিকেটের মাধ্যমে।

যেহেতু অধিকাংশজনেরই ‘দেনমোহর’ পরিশোধহীন অবস্থায় রেখে,
উভয়পক্ষের সম্মতিতেই সংসার নামক ভেলায় চড়ে জীবনযাপনের সুযোগ আছে এখানে;
তাই পুরুষ এই ফাঁকির সুযোগ নেয় প্রায়শই এবং নারীও তার দাম নিশ্চিত করে সেই ফাঁকিবাজির সুযোগটা নেয়।

এক্ষেত্রে নারী পুরুষকে শোনায় পাশ্চাত্যের গান আর পুরুষ নারীকে শোনায় প্রাচ্যের গান।
যেহেতু উভয়রীতিই আংশিক অবলম্বিত হয় উভয়পক্ষের থেকে সেহেতু উভয়পক্ষই গায় এক মিশ্র সংগীত এবং সুর তোলে সেই মিশ্র সুরে।
যার জোর বেশি সুরের প্রাধান্য পায় তার অনুসৃত রীতির বেশি।

তাই তো ‘দেনমোহর’-এর মধ্যপ্রাচ্যীয় রীতিও এখানে আংশিকভাবে অনুসরণ করে উভয়পক্ষ, ‘নারী স্বাধীনতা’-র পাশ্চাত্যরীতিও এখানে আংশিকভাবেই অনুসৃত হয় উভয়পক্ষের পক্ষ থেকে।

এক অদ্ভুতুরে অবস্থা এই দেশের ‘বিবাহ’ ও ‘যাপিত সংসার’ নামক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যের!

দেখা যাচ্ছে,’দেনমোহর’ এই বাংলাদেশে বরপক্ষের পক্ষ থেকে একটা ফাঁকিবাজি প্রক্রিয়া হিসেবেই চর্চিত হচ্ছে প্রায়শ। আর তাই কনেপক্ষও যথাসাধ্য চেষ্টায় থাকে এই ফাঁকিবাজি প্রক্রিয়া ঠেকাতে এবং যার ফলে তারা দানবীয় সব দাম হাঁকে তাদের কন্যাদের!!!
(ওজনদার দাম তো হাঁকাতে পারে না সঙ্গত কারণেই, কারণ সেক্ষেত্রে বিয়ের পাত্র খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হবে আর কনেও ঘরে তোলা বেশিরভাগ বরের অসাধ্য হবে!)

তাই উভয়পক্ষই সুবিধাজনক এই আধাআধি প্রাচ্য-পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে দাঁড় করানো মধ্যপ্রাচ্যীয় অবকাঠামোতে গঠিত প্রথাকে স্বীকৃতি দেয় হরহামেশাই।

যদিও মূল সিস্টেম অনুযায়ী কনেপক্ষের এই জাতীয় ভূমিকা নেয়া অবান্তরও নয়। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে ঐ ফাঁকিবাজিতে কিংবা পাশ্চাত্যরীতির আংশিক অনুসরণে যাপিত জীবনে এক জগাখিচুড়ি রীতি অনুসরণ করতে গিয়ে।

এমনিতেই ‘দেনমোহর’ প্রথাটাই একটা অসুস্থ মধ্যপ্রাচীয় সিস্টেম বলে মনে করি। তবুও যারা এটা মানেন, তাদের তো পুরোটাই মানা উচিৎ। এভাবে আধাখেচড়া মানতে গিয়েই বাঁধে যতসব গোলমাল।

একবার এই সিস্টেম নিয়ে লিখেছিলাম বলে, কত যে গালি খেয়েছিলাম তার ইয়ত্তা নেই। আমার কিছু বন্ধুদের সাথে সম্পর্কই শেষ হয়ে গিয়েছিলো সেসময় সেই লেখার প্রেক্ষিতে!

যৌতুক প্রথা, দেনমোহর… এসব বন্ধ হওয়াটা জরুরি।

আধুনিক যুগে এসেও লোকে কেন এখনও এই মধ্যযুগীয় প্রথাগুলো আঁকড়ে ধরে রাখতে সচেষ্ট থাকে, সেটা আমার বোধগম্য হয় না আজকাল।

এসব কুপ্রথা বন্ধ হোক, এটাই কাম্য।

শেয়ার করুন:
  • 175
  •  
  •  
  •  
  •  
    175
    Shares

লেখাটি ১,১০১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.