ভালো থাকুক আকাশ, আকাশের ওপারে…

0

ফারিহা ইসলাম মুনিয়া:

ঘটনাটার পর অনেক ব্যথিত হৃদয়ে অনেক কিছু লিখতে মন চাচ্ছে। কিন্তু অনেক অনেক কথা শোনার সময় কারো নেই। কী হয়েছে সবাই সব জানে। কয়েকটা ক্লিয়ারকাট পয়েন্ট বলি কেবল-

১। মিউচুয়াল এডজাস্ট না হলে মানুষ আলাদা হতেই পারে এবং সেটাই শ্রেয়। কিন্তু পরকীয়া বা এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার is never okay! Its a moral crime! There should be no compromise with him/her.

আপনার হাজবেন্ড/ ওয়াইফ কারো সাথে এডজাস্ট না হলে আলাদা হয়ে যান, বলে কয়েই হয়ে যান। জীবনের জন্য সম্পর্ক হয়, সম্পর্কের জন্য জীবন নয়। মেয়েদের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়াটা তুলনামূলক কঠিন হলেও ছেলেদের জন্যও যে খুব সহজ নয়, সেটা তো আমরা বুঝে গেলামই!

আর সমাজ? সমাজ কী বলবে সেইটা ভাবতে গিয়ে নিজের জীবন, আত্মাটাকে ধ্বংস করার মতো ব্রেইন ওয়াশড যেন আমরা কেউ না হই! কাউকে মানসিক অত্যাচার করার অধিকার কারো নেই! সেটা স্বামী হোক বা স্ত্রীই হোক! স্বামী স্ত্রী, ছেলেমেয়ে হবার আগে সবাই মানুষ! এটা মনে রাখতে হবে। একটু শান্তি নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষের বেসিক হিউম্যান রাইট!

তাকে চিনতো এমন মানু্ষদের কাছে তার পারসোনাল প্রোফাইল শুনে মনে হয়েছে, ডক্টর আকাশ সমাজকে ভয় পেতেন যতখানি, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসার কাঙাল হয়ে একজন ভুল মানুষকে চেয়েছিলেন। যেটা আমরা অনেকেই করি। কিন্তু সেটা ভুল। এই ভুল শোধরানির ক্ষমতা যেন আমরা নিজেদের মাঝে ডেভেলপ করতে শিখি।

২. ডক্টর আকাশের সুইসাইড ইনসিডেন্সের সাথে নারীবাদ, নারী স্বাধীনতার কী সম্পর্ক?? সেটি আমার ক্ষুদ্র মাথায় বোধগম্য নয়৷ এটার সাথে এটার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না! নারী স্বাধীনতা বা জেন্ডার ইকুইটি কী জিনিস সেগুলা সম্পর্কে না জেনে, পড়াশুনা না করে কেবলমাত্র মেয়েদের উপর অপরিমেয় ক্রোধ থেকে যারা এই ইস্যুকে ধরে “পাইছি একটা জিনিস মামা!” বলে এগুলাকে এটার সাথে রিলেট করছেন, জেনারালাইজ করছেন, মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছে তাই নোংরা লেখা লিখে যাচ্ছেন, এমনকি যেসব পোর্টালকে মানসম্মত বলে মনে করতাম, সেখানেও কুরুচিপূর্ণ লেখা লিখছেন, তারা পিওর মিসোজেনিস্ট প্রাণী, ভয়ংকর রকম আগ্রাসী, এবং এটা থেকেও পুরুষতান্ত্রিক ফায়দা নেবার মেলা চেষ্টা করছেন। ব্যাপারটি প্রচণ্ডরকমের দুঃখজনক।

কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভিক্টিম যে কেবল মেয়ে না, একজন ছেলেও হতে পারেন, ডক্টর আকাশ তার প্রমাণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের প্রতি ভয়ংকর অবিচার করার পর আস্তে আস্তে যে ছেলেদের উপরও প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে ধীরে ধীরে, তাদেরকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে, সেটার সিউডো ইফেক্টটা অনেকে টের পাচ্ছেন না! সেটা নিয়ে বিস্তারিত লেখা একদিন লিখবো। তখন ব্যাপারটি ক্লিয়ার হবে।

জেন্ডার ইকুয়ালিটি, রাইটস, gender based oppression আসলে কী জিনিস, আমার ধারণা সেগুলো তাদের ক্ষুদ্র মস্তিস্কে ঢুকবে না। ঢুকলে অনেক আগেই ঢুকতো!

নোংরামির একটা লেভেল থাকে। মানুষের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও লেখাগুলো প্রায় সহস্রবারের মতো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে এ দেশের মানুষ সভ্য নয়, কখনো হবে কিনা জানি না।

৩. চট্টগ্রাম জেলাসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের বিয়ের সময় প্রচণ্ড পরিমাণ শো অফ এর ব্যাপার আছে। কখনো কখনো সেটা নিজেদের লেভেল ছাড়িয়ে চলে যায়, যেটা খুব জঘন্য রীতি বলে আমার মনে হয়। বউকে ডিভোর্স না দিতে পারার কারণ হিসেবে ৩৫ লক্ষ টাকা দেনমোহর নির্ধারণের ব্যাপারটি উঠে এসেছে। ভরনপোষণ দেবার কেউ নেই বলে মেয়েদের অত্যাচারি স্বামীর কাছে থাকার ব্যাপারটি যেমন প্যাথেটিক, ডক্টর আকাশের এই কেসটাও তেমন প্যাথেটিক যদি কেবলমাত্র দেনমোহরের জন্য ডিভোর্স আটকে গিয়ে থাকে।

মুসলিম আইন অনুযায়ী দেনমোহর বিবাহ রাতের আগেই মেয়েকে দিতে হয়। আর সাধ্যের উপর গিয়ে শো অফ এর জাল থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি৷ সমাজ সেটা তাকে দেয়নি। সাধ্যের বাইরে গিয়ে এরকম কমিটমেন্ট এ যাওয়া যৌক্তিক না, এটা আমাদের মাথায় যেন থাকে। কেন আমাদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে শো অফ করতে হবে? শো অফ করে আমরা কি সুখটা পাই? অপর পক্ষ শো অফ করতে চাইলেই বা কেন রাজি হবেন?

অনেকের ধারণা ডাক্তার মানেই কাড়ি কাড়ি টাকা! ধারণাটা যে কতটুকু ভুল সেটি এই পেশায় নিজে না থাকলে বা কাছের কেউ না থাকলে বোঝা একেবারেই অসম্ভব।

৪. ডাক্তার আকাশ একজন ভালো মানুষ ছিলেন, হয়তো বা একটুখানি বোকাই! কিন্তু সে তো একা ছিল না। দুনিয়াতে তার মত আরো হাজার হাজার বোকা মানুষ আছে। একটুখানি ভালোবাসার জন্য মানুষ কত বোকামি আর পাগলামিই না করে। কতভাবে মানুষ প্রতারিত হয়, কষ্ট পায়।

কেউ ভালোবাসা না দিলে কষ্ট হয়। সবকিছু কেড়ে নিয়ে গেলে সব শূন্য হয়ে যায়,জানি।

তবুও হাজার হাজার মানুষ বেঁচে থাকে। ভালোবাসার হাজারটা রূপ থাকে..সেগুলো নিয়েই থাকে.. প্রতারক, কষ্ট দিয়ে ছেড়ে দেয়া মানুষগুলো কয়দিনই আর ভালো থাকতে পারে? আমার বিশ্বাস বেশিদিন পারে না। প্রকৃতির তো একটা ব্যালেন্স থাকতে হয়, তাই না? নিউটন কী বলে গেছেন? সব ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে! আমরা সবাই তো একটা রেফারেন্স ফ্রেমেরই অংশ! তাই না?

আমার বিশ্বাস ভালোবাসা শক্তির মতো, শক্তি যেমন এক রুপ থেকে আরেক রুপে চলে যেতে পারে, ভালোবাসাও পারে। যে প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা পায়নি, সে হয়তো বাবা মায়ের ভালোবাসা পায়, যে বাবা মায়ের ভালোবাসা পায় না, সে হয়তো খুব ভালো লাইফ পার্টনার খুঁজে পায়, কেউ সেগুলো না পেলে হয়তো সমাজের জন্য অনেক কিছু করে, সমাজের অনেক মানুষের ভালোবাসা পায়…সবাই হয়তো সবগুলো পায় না।

এমন মানুষগুলোও আজ বেঁচে আছে, যারা কোনটাই পায়নি এখনো। চেষ্টা করে যাচ্ছে…ভালোবাসা আসবে একদিন…কোন না কোন রুপে।

আমিও বিশ্বাস করি, আসবেই! না এসে পারে?

মন এতো বেশি খারাপ হয়ে আছে, আকাশের দিকে তাকাতেও আজ ইচ্ছে হচ্ছে না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares

লেখাটি ১,২১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.