ডা. আকাশের আত্মহত্যা এবং আমাদের অপরিমিতিবোধ

0

সেজান মাহমুদ:

আকাশ নামের এক তরুণ চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার আগে সে বিশদ পোস্ট দিয়েছে ফেসবুকে এই বলে যে তাঁর স্ত্রী তানজিলা হক মিতুর পরকীয়া প্রেমের জন্যেই তার আত্মহত্যা। শুধু তাই নয়, আকাশ আরও জানিয়েছে যে, মিতুকে সে খুব ভালবাসে, এমনকি মিতুর সঙ্গে অন্য ছেলের সম্পর্ক জেনেও সে বিয়ে না করে থাকতে পারেনি। ফেসবুক, ইন্টারনেট সবখানে মিতুর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি এবং ধিক্কার জানানো হচ্ছে।

আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষণা, মনোরোগ নিয়ে গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষিতে আমি অনেকবার এগুলো নিয়ে লিখেছি। এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য করতে চাই।

এক:
আত্মহত্যা একটি রোগ, এর পেছনে থাকে আরও ভয়ঙ্কর মানসিক অসুখ, যা একজন ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। পারিপার্শ্বিকতা অনেক সময় দায়ী হলেও মূল কারণ হয়তো মানসিক রোগ, যেমন সিভিয়ার ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিজর্ডার, স্কিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। আর এইসব মানসিক রোগ চিকিৎসা ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়, কোন কোনটি সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়; কিন্তু ওষুধ ও সাইকোথেরাপি দিয়ে প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।

দুই:
যতোটুকু আকাশের হিস্ট্রি পড়ছি বা শুনছি, তার যে মানসিক রোগ ছিল এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সে কি কোনদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছে? এইসব মানসিক রোগের মধ্যে লক্ষণ থাকে ‘প্যারানয়া’ বা অতিরিক্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা, অতিরিক্ত পজেসিভনেস ইত্যাদি। কারও অতিরিক্ত যৌন চাহিদা, আবার কারও এমনকি ইম্পোটেন্সও (পুরুষত্বহীনতা) থাকতে পারে। এগুলো না জেনে একজনকে একতরফাভাবে দোষ দিয়ে শাস্তি চাওয়া আরেকটি অন্যায়। আমারদের মনে রাখা উচিত দাম্পত্য জীবনে মানুষের অনেক জিনিস থাকে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। না জেনে, বুঝে কোন পক্ষের নিন্দা করাই আরেকটি অন্যায়।

তিন:
যারা ভীষণ পজেসিভ ধরনের মানুষ, এদের ভালোবাসাও প্রশ্নাতীত নয়। লক্ষ্য করুন, আকাশ মিতুকে অপছন্দ করলেও চক্ষুলজ্জায় বিয়ে ভাঙতে পারেনি। এইসব পুরুষতান্ত্রিক “ইগো” কোনদিনও মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। অন্যদিকে যদি সত্যিকারের ভালবাসবে সেখানে এতো ভিনডিক্টিভ বা প্রতিহিংসাপরায়ণ সে যে মৃত্যুর পরও মেয়েটির সর্বনাশের সব রকমের ব্যবস্থা করে গেছে। মেয়েটির ভিডিও ভাইরাল, ফটো ভাইরাল। বাহ, প্রেম বটে! মনোবিজ্ঞানীরা জানেন এটা প্রেম নাকি পুরুষতান্ত্রিক পজেসিভনেস!

চার:
মিতুকে নাকি এরেস্ট করা হয়েছে। পরকীয়া অনৈতিক হতে পারে, কিন্তু তা কি অপরাধ? সেই হিসাবে তো আত্মহত্যাও বাংলাদেশের আইনে অপরাধ ছিল। সেই বৃটিশ আমল থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে গেলে তাঁকে উল্টো শাস্তি দেয়া হতো; অথচ এঁদের দরকার চিকিৎসা এবং ভালো পরিবেশ দেয়া। এইসব বস্তাপচা আইন কবে বাতিল হবে বাংলাদেশে?

আকাশের মতো তরুণ চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছে; এর চেয়ে বেদনার আর কিছু নেই। তাঁকে আমরা আর ফেরাতে পারবো না। কিন্তু ভেতরের সকল খবর না জেনে আরেকজন জীবিত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া আরেকটা অন্যায়। ফেসবুকের এইসব তথাকথিত পণ্ডিতেরা না জানে মানসিক রোগ সম্পর্কে, না জানে সামাজিক মনস্তত্ব। নিজেদের ব্যক্তিগত ধারণা দিয়ে কোন উগ্র সিদ্ধান্ত দিতে যাবেন না। তাতে একটি অন্যায়ের প্রেক্ষিতে আরেকটি বড় অন্যায় হয়।

সেজান মাহমুদ

এখানে আমি কোনভাবেই পরকীয়া করার পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না; কিন্তু সম্পর্ক ভালো না থাকলে, না টিকলে সুস্থ উপায় হলো আলাদা হয়ে যাওয়া। যার সঙ্গে চলবে না তার থেকে দূরে থাকুন, নিজেও ভালো থাকবেন, অন্যকে ভালো রাখতে পারবেন। কিন্তু আত্মহত্যা বা হিংসায় অন্যকে হত্যার অধিকার কোন আইনে বা সামাজিক নিয়মে দেয়া হয়নি।

আমি বাংলাদেশের আইনের অনেক গলতির কথা বলতে পারি। কিন্তু সবচেয়ে স্টুপিড আইন হলো আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টাকে বেআইনি বলে বিচার করা এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্যে কাউকে শাস্তি দেয়া। প্ররোচনার সংজ্ঞা এবং প্রমাণ কীভাবে করবেন? যেখানে নিজেরাই জানে না আত্মহত্যা কী? মানুষ কেন আত্মহত্যা করে?

এইসব উন্মাদনা বন্ধ হওয়া দরকার। আকাশের মতো কেউ আত্মহত্যা করার আগের জন্যে চিকিৎসা ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করুন। মানসিক রোগকে স্বাভাবিক ভাবতে শিখুন এবং সকল স্টিগমা পরিহার করুন যাতে আকাশের মতো ছেলে বা মেয়ারা কোন সামাজিক ব্যাকল্যাশ ছাড়াই মানসিক চিকিৎসা নিতে পারে। পারলে সেগুলো নিয়ে ফেসবুকে শোরগোল তুলুন। না হলে পুরো সমাজের প্ররোচনাকারী হিসাবে বিচার হওয়া উচিত। তা কি ভেবে দেখেছেন?

শেয়ার করুন:
  • 6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6K
    Shares

লেখাটি ২৭,২৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.