কো-ডিপেন্ডেন্ট, নারসিসিস্টরা যাদের সঙ্গ চান

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

নারসিসিস্ট পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার নিয়ে কিছু লিখেছিলাম। লেখাটা কেউ কেউ জরুরি মনে করেছেন। তাই সাহস করে আরেকটু লিখতে বসেছি।

নারসিসিস্টদের বুঝতে হলে তাঁদের সম্পূরক ব্যক্তিত্বকেও ভালোভাবে বুঝলে ভালো হয়।

নারসিসিজমের ইন্ধন জোগায় এবং টিকিয়ে রাখে আপাতভাবে বিপরীত এক অবস্থানের মানুষ, তারা কো-ডিপেন্ডেন্ট।

নারসিসিস্টরা একা একা থাকতে পারেন না, অন্যদের গৌন প্রতিপন্ন করা এবং নিজের বড়ত্ব, প্রভুত্ব জারি রাখার জন্য একজন সহকারির দরকার হয়।

তারা সাধারণত ‘কো-ডিপেন্ডেন্ট’ হন।

কোডিপেন্ডেন্টরা এমন যারা নারসিসিস্টদের চিহ্নিত করতে পারেন না। এবং নারসিসিস্টদের স্বভাবগত চাহিদা পুরন করে যেতে থাকেন অবিরত।

লেখক: আনন্দময়ী মজুমদার

নারসিসিস্টদের প্রায় প্রায় ড্রামা তৈরি করতে হয়। তাঁরা চান চেতে যেতে, চেতিয়ে দিতে। তাঁরা ঝামেলা উস্কে দিতে পছন্দ করেন। যেন একটা নাচের মতন। নারসিসিস্ট করবেন ‘তাতা থৈ’ আর কোডিপেন্ডেণ্ট সেই অনুসারে অজ্ঞাতসারেই দেবেন মুদ্রা ‘তা থৈ থৈ’।

নারসিসিস্টদের কাছে ড্রামা আগুনের জন্য ঘি এর মতো। নারসিসিস্ট আর কোডিপেন্ডেন্ট মিলে তাই একটা অচ্ছেদ্য নাচ তৈরি করেন। উভয়ের এই নাচ সচরাচর থামে না, চলতে থাকে। আসলে কেউ একজন ছেদ না টানলে নাচ থামতে পারে না। আর নিজেদের অবস্থা নিয়ে বুঝতে সক্ষম হননি বলে সকলেই একই মুদ্রায় বারবার নাচতে থাকেন।

কো-ডিপেন্ডেন্ট নারসিসিস্টদের চাহিদার আগুনে ঘী ঢালতে থাকেন।

কো-ডিপেন্ডেন্টদের অনেক সময় এম্প্যাথ বলা হয়। কারণ তারা নারসিসিস্টদের বিপ্রতীপ — বাইরে থেকে দেখলে তাঁদের মনে হয় তারা অনেক বেশি আবেগী, নরম, এবং চারিপাশের সকলের দুঃখকষ্ট আনন্দবেদনাকে তাঁরা বড়ো বেশি নিজের বলে মনে করেন।

যা পারেন না তেমন বোঝা কাঁধে নিয়ে ফেলেন প্রায়শ।

আশেপাশে একটি মানুষকে কাঁদতে দেখলে তাঁরা কাঁদতে পারেন। আশেপাশের মুডকে তিনি উপগ্রহের মত প্রতিফলিত করেন।

নিজের ও অন্যের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তিনি ঠাহর করতে পারেন না।

তাই কাছের মানুষের সঙ্গে তাঁরা একাকার বোধ করেন। তাঁদের সঙ্গে মতান্তর ঘটলে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। আবার তাঁদের অসুখবিসুখ হলে, মনে করেন মাথায় পৃথিবী ভেঙে পড়ছে। এক পর্যায়ে স্নেহমমতা ছাপিয়ে এই একাকার-বোধ পারস্পরিক সম্পর্কে হানিকর হয়ে ওঠে।

পরিবার ও সমাজের সকল দায়দায়িত্ব যে একান্তই তাঁদের, এমন কথা তাঁরা মনে করেন। তাঁদের যদি একটা রান্না করতে বলা হয়, তাঁরা সচরাচর দশটা পদ করবেন। তাঁরা সকলকে খুশি রাখতে চান। মনে করেন বেশি বেশি করলেই সেটা সম্ভব।

তাঁদের মধ্যে ভয় আছে, যদি বর্গের সঙ্গে এভাবে আঠার মত লেগে না থাকেন, তাহলে তাঁদের একদিন একঘরে হতে হবে, হয়ত তাঁরা খারিজ হয়ে যাবেন।

অপরের সেবা করতে নিয়োজিত হন বলেই তাঁরা নিজেদের আত্ম-রক্ষা ও আত্মসেবা করার সময় পান না।

তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য হয়ত তাই এক পর্যায়ে, ভেঙে পড়ে। তাঁরা নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পান না। অথবা আসলে হয়ত, চান না।

তাঁদের নিজেদের দিকে না তাকানোর একটা চমৎকার অজুহাত থাকে, যেহেতু তাঁরা আত্ম-ত্যাগ করে চলেছেন। যদিও তাঁরা প্রায়শ একে অজুহাত বলে চিহ্নিত করতে পারেন না।

তাঁদের যদি কোনো হার্দিক ভালোবাসার কাজ থাকে, যেমন বই পড়া, খেলাধুলা করা, বেড়াতে যাওয়া, ছবি আঁকা, গান শোনা, গান করা, স্বাস্থ্যচর্চা অথবা স্কুটি চালানো, যা তাঁদের মানসিকভাবে ভালো রাখে, অথবা যদি ভালো ক্যারিয়ার থাকে, এইসব তিনি কেমন করে যেন ছেড়ে দেন ‘অপরের সেবা করতে গিয়ে’ সময় পান না বলে।

কিন্তু এই নিয়ে তাঁদের মনের মধ্যে সচরাচর দুঃখকষ্ট জমে।

অনেক সময় সন্তান বা দুর্বল অবস্থানে আছে এমন কারো ওপর তাঁর এই কষ্টগুলো স্থানান্তরিত করেন।

এভাবে কো-ডিপেন্ডেন্ট অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের কো-ডিপেন্ডেন্ট হতে শেখান।

নিজেদের স্বপ্ন, সাধ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষিত না রেখে অন্যের স্বার্থে ছেড়ে-দেওয়াকেই সমাজ এগিয়ে দেয় বলে তাঁরা এই বিধানের উল্টো কিছু করার কথা ভাবতেই পারেন না।

বিশেষ করে সমাজের নানা চাহিদা ও চাপ কো-ডিপেন্ডেন্সিকে দস্তুর, এবং কখনো মহৎ বলে তুলে ধরে বলে তাঁরা একে সচরাচর চিহ্নিত করতে পারেন না।

যেহেতু কারো পক্ষে অতিরিক্ত স্ট্রেস নেওয় স্বাস্থ্যকর নয়, তাই এখান থেকে কিছু সমস্যার তৈরি হয় যা চারপাশকেই কলুষিত করে। কোডিপেন্ডেন্ট নিজে তো ক্ষতিগ্রস্ত হোনই।

অনেক সময় তিনি ক্লান্ত হোন। বিরক্ত হোন। মনের মধ্যে কষ্ট জমতে থাকে। এক পর্যায়ে নিজেকে তিনি অবস্থার জাঁতাকলে পড়া শিকার হিসেবে দেখতে পান।

নিজের আনন্দ কমে যাওয়ার ফলে, তাঁর উপস্থিতি অন্যদের আনন্দ দিতে পারে না।

নিজের স্বাস্থ্য ভালো না থাকার কারণে অন্যদের তিনি সুস্থ রাখতে সাহায্য করেন না।

ভালো না থাকার ফলস্বরূপ অভিযোগপরায়ন হয়ে ওঠার জন্য তাঁকে অনেকেই এড়িয়ে চলতে থাকে। এমন কী কাছের লোকজন।

কো-ডিপেন্ডেন্স আমাদের সমাজ শুধু নয়, প্রায় প্রত্যেকটি দেশের সমাজে বর্তমান, জোরদারভাবে।

সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে অধিকাংশ কো-ডিপেন্ডেন্ট নারী। পুরুষ কো-ডিপেন্ডেন্ট থাকলেও শতকরা হারে কম।

কো-ডিপেন্ডেন্সি অসুখ না, তবে এক ধরনের ব্যক্তিত্বের স্টাইল যা নিজের ও সমাজের কিছু অসুবিধে তৈরি করে। এসব কোনো দোষের নয়। যেহেতু সামাজিক শিক্ষা থেকে এবং পারিবারিক দৃষ্টান্ত থেকে এটা আসে। তাই অচেতন থাকলে, এ নিয়ে কিছু করার থাকে না।

কো-ডিপেন্ডেন্সি নিয়ে সচেতন হলেই একমাত্র কাজে দেয়। এসব ভালোভাবে বোঝার জন্য সচেতনতা তৈরি হতে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

নিজেদের স্বপ্ন, সাধ, স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার, সঠিক জীবনযাপনের সদিচ্ছা, ও গভীর আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখার চেষ্টাকে যেন হেয় না করা হয়। খারিজ না করা হয়।

বাইরের চাওয়া-পাওয়া থেকে চোখ ফিরিয়ে, যারা নিজেদের ভিতরের শান্তি স্বস্তি আর স্বাস্থ্যের দিকে তাকাচ্ছেন, তারা কোডিপেন্ডেন্সি থেকে মুক্ত হয়েছেন।

নিজের ঘট না ভরলে অন্যের ঘট ভরানো সম্ভব নয়। মায়া এঞ্জেলু বলেছেন, “যার পরনে কিছু নেই, সে যখন তোমাকে জামা দিতে চায়, সতর্ক থেকো।”

শান্তি স্বস্তি ও আশ্রয় সৃষ্টিকারী মানুষ হতে হলে আগে নিজের মধ্যে সেসব প্রয়োজন।

একজন কো-ডিপেন্ডেন্ট অন্যের ঘট ভরেন নিজের ঘট উজাড় করে দিয়ে। তাঁর কাছে আর কিছু বাকি থাকে না, রি-ফিল করার মত। খুব সহজেই তাই তিনি ফুরিয়ে যান। আর অন্যেরাও ভবিষ্যতে তাঁর কাছে কিছু পায় না।

দুনিয়ার সকলের দিকে লক্ষ রাখা আর নিজের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে সচেতন চোখ না-রাখাই সংক্ষেপে কো-ডিপেন্ডেন্সি।

কো-ডিপেন্ডেন্সিকে যেন বাহবা দিয়ে উস্কে না দেওয়া হয়। কো-ডিপেন্ডেন্টদের যে ‘শিকারে পরিণত হবার মানসিকতা’ তৈরি হয়, তাকে যেন ললাটের লিখন বলে মেনে নেওয়া না হয়, এইটুকু অনেকটা এগিয়ে দেয় আমাদের।

***এইটা একটা একাডেমিক পোস্ট। কাউকে দুঃখ দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাই।

শেয়ার করুন:

লেখাটি ২,১৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.