ধর্ম নিয়ে মূল রাজনীতিটা আসলে ‘তিনি’ই করছেন

দিলশানা পারুল:

আমি ধর্ম নিয়ে রাজনীতির শতকরা একশ ভাগ বিরোধী। কোন রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই আমি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলকে প্রত্যাখ্যান করি। এই যে আমি রাজনীতি এবং ধর্ম এই দুইটাকে একসাথে করার বিরোধীতা করি এবং মনে করি এইটা সম্পূর্ণ ভুল অবস্থান, সেইটা কোন আবেগীয় অবস্থান না। কিংবা যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থীরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরোধিতা করছে, তাই আমিও করছি, বিষয়টা এরকম না। অথবা দিনের শেষে আওয়ামী লীগিয় প্রগতিতে বিশ্বাস করি, তাই ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরোধিতা করছি, সেইটা তো নয়ই।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতিকে আমি সম্পূর্ণ যৌক্তিকভাবে প্রত্যাখ্যান করি। সেই যুক্তিটা কী?

দেখেন, রাষ্ট্র এবং সমাজ এই দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যদিও একই সময়ে একই অবস্থানে রাষ্ট্র এবং সমাজ যুগপৎভাবে অবস্থান করে, কিন্তু এই দুইটার কাযর্ক্রম, পরিসর, পরিমণ্ডল সম্পূর্ণ আলাদা। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ আলাদা। একটু সহজ উদাহরণ দেই।

ধরেন একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি একটা রাষ্ট্রের সুপ্রিম লিডার, রাইট? এখন ঈদের দিনের জামাত একটা ধর্মীয় সামাজিক ব্যাপার। সেই জামাতে নামাজ পড়তে যেয়ে সেই সুপ্রিম লিডার রাষ্ট্রপতি কিন্তু নামাজের ইমামতিতে নেতৃত্ব দেন না, সেখানে কিন্তু একজন ইমামই নেতৃত্ব দেন। নামাজের ইমামতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের আওতায় পড়ে না।
তেমনি একটা রাষ্ট্রের অর্থ সচিব, যিনি তিনি কিন্তু রাষ্ট্রীয় একটা দায়িত্ব যেমন পালন করেন, তেমনি সমাজে এবং পরিবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা রোলও প্লে করেন।
তার মানে ধর্মের অবস্থান সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ পর্যায়ে। কেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্ম আসা ঠিক না, তার কারণ হচ্ছে, ধর্ম ডিল করে আবেগ দিয়ে। মানে ধর্ম আবেগীয় বিষয়, আর রাজনীতি যৌক্তিক বিষয়। পৃথিবীর যেকোনো ধর্মের প্রথম শর্ত হচ্ছে বিশ্বাস। প্রথম তোমার বিশ্বাস স্থাপন করো স্ব স্ব ধর্মের প্রভুর প্রতি, তারপর স্ব স্ব ধমের্র্ গ্রন্থের প্রতি, তারপর স্ব স্ব ধর্মের প্রচারকের প্রতি, তারপর সেই বিশ্বাস মোতাবেক জীবন ধারণ করো। বিশ্বাস এর উৎপত্তি এবং স্থায়িত্ব মস্তিষ্কের আবেগীয় স্তরে। আমি পৃথিবীর এমন কোন ধর্মের কথা জানি না যারা যুক্তির উপর নির্ভর করে তাদের ধর্মকে বিশ্লেষণ করে। যেইখানে যুক্তিবিহীন কোন রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড়াতে পারে না।

এখন ধরেন, আপনি বলতেই পারেন আওয়ামী লীগ যে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে, তার চেয়ে যেকোনো ধর্মনির্ভর শাসন ব্যবস্থা অবশ্যই ভালো। এই যুক্তি এবং মন্দের ভালো যুক্তির মধ্যে কোনো পাথর্ক্য নাই। যেহেতু আওয়ামী শাসন ব্যবস্থা খারাপ, অতএব ইসলামী শরীয়া ভালো। এইটা কোন যুক্তি না। এইটা সঠিক যুক্তি করতে না পারা।

পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদ যেমন ভালো না, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী শাসনতন্ত্রও ভালো না। আপনি পশ্চিমের গণতন্ত্র চর্চার যেমন ১০১টা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের শরীয়া আইন চর্চারও ৩০২ টা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারবেন। কেউ আপনাকে বলেনি পশ্চিমের অনুকরণে গণতন্ত্র চালু করো, বা তাদের পাতা ফাঁদে পা দাও, তার মানে এই না শরীয়া আইন চালু করে নিজের পাতা ফাঁদে নিজে পড়বেন।

কেন ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ঠিক না? কারণ ধর্মীয় আবেগ দিয়ে রাজনীতির নামে মানুষকে মেনিপুলেট করা সবচেয়ে সহজ। ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে এই ভূখণ্ডে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, সে দায় আমার না। সে দায় কেবলই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির। পলিটিক্যাল ডিসকোর্স, নিওপলিটিক্যাল ইম্পেরিয়ালিজম এইসব শক্ত শক্ত কথা পড়লে দাঁত ভেঙে যায়, বুঝি না। আমি সরল মানুষ, তাই সবকিছু খুব সরলভাবেই বুঝি।

জামায়াত ছিলো, এখন মাঠে নাই। মাঝখানে হেফাজত আসলো, আবার প্রায় চলেও গেলো। এখন নতুন করে মাঠে আসছে চরমোনাই এর পীর। ওই একজন ‘তিনি’ যখন চাইবেন, তখন এরা একজন করে মাঠে নামবেন, একটু-আধটু খেলাধুলা করবেন, তারপর আবার তিনি যখন চাইবেন, তারা চলেও যাবেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতিটা আসলে করছেন তিনিই। সবই তাঁর ইচ্ছা!

শেয়ার করুন:
  • 128
  •  
  •  
  •  
  •  
    128
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.