বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক শেষ ঠিকানা

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

অতি দারিদ্র্য, সন্তান বা পরিজনবিহীন, বা অন্য কোন বিশেষ অবস্থা ছাড়া আমি বৃদ্ধাশ্রমকে সমর্থন করি না। আমার চোখে সে পুত্র এবং সে কন্যা দুজনকেই মানুষ নয় কিন্তু মানুষের মত কিছু প্রাণী মনে হয়। আমাদের প্রজন্মের অনেকে বলে, আমিও বলি, সন্তানের উপর নির্ভরশীলতা নয় ! আমরা কেউ ঠিক করি দূর গ্রামে যাবো, কেউ বলি শেষ সময়টা ট্রাভেল করবো, কেউ বলি ওল্ড এজ হোম দেব বা সেখানেই চলে যাবো। কিন্তু সেটা কি করতেই হবে, বাধ্যতামূলক? সন্তানের উপর নির্ভরশীল হওয়া কি অন্যায় কিছু?

আজকের যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন ,বাবা মা হয়েছেন, তাদের বৃদ্ধ পিতামাতা, যারা এখন অর্থনৈতিক দায় থেকে মুক্তি নিয়েছেন আর ভেবেছেন এবার সন্তানেরা দেখুক। ধরুন, তাদের সন্তান তাদের দায়িত্বটি চাইছে না। তবে? আমরা কী তাদের (বৃদ্ধদের) দোষারোপ করবো, কেন বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান না? নাকি নিজের ব্যতিক্রমী অহমিকায় দাঁড়িয়ে বলবো, আমরা আপনাদের মতো না, সন্তানের উপর নির্ভর করবো না, আমার জন্য ওল্ড হোমই ভালো!

বৃদ্ধ পিতামাতার প্রতি দায়িত্বের প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় আছে, দায়িত্বটি কার, সন্তানের নিজের না সন্তানের স্ত্রীর ?
আমি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। একটি পক্ষ আছে যারা অল্পশিক্ষিত, কখনো বা শিক্ষিত চতুর শ্রেণির পুরুষ, যাদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিষোদ্গার থাকে। সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যণীয় হলো বৃদ্ধাশ্রম বিষয়ক। মা বড় না বউ বড়, বউ এর কথায় মাকে করলি পর, শাশুড়ির জন্য করে মার জন্য নয়, ভাই বড় ধন পৃথক হয় নারীর কারণ, এরকম নানা চটুল কথা আত্মীয়-অনাত্মীয়, চেনা-অচেনা, বন্ধু-অবন্ধু অনেকের ওয়ালে শোভা পাচ্ছে।

আমি বরাবরেই এই বিষয়ে আপত্তি রাখি, সেটা হচ্ছে স্ত্রীর উপর স্বামীর প্যারেন্টাল পরিবারের কাজকর্মের দায় আরোপ করা। এবং সেখানে যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়, স্ত্রী পারে না বা পারতে চায় না দুটো অবস্থাতেই স্ত্রীকে দোষারোপ করা যায় না। কারণ এটি করতে তিনি বাধ্য নন। পিতামাতা যার, দায়িত্ব তার।

যদি কোন স্বামী বা স্ত্রী তার স্পাউসের মা-বাবার জন্য আর্থিক বা শ্রমসাধ্য কিছু করেন, সেটার অবশ্যই মূল্যায়ন হওয়া উচিত। যদি এটিকে দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হয়, তবে সেটা পরস্পরের প্রতি হওয়া উচিত। বরের প্যারেন্টস সম্মানিত, কনেরটা নয়, এই ধারণা বীভৎস, আর এটি মূলত ‘নিজেরটা বোঝা’ টাইপের স্থুল মানসিকতা। এতে আসলেই বাবা মার প্রতি ভালবাসা নয়, বা বয়োবৃদ্ধদের প্রতি সম্মানও নয়, উঠে আসে স্বার্থপরতা আর অন্যের শ্রমে নিজের ফায়দা লোটার ফন্দি।

বৃদ্ধাশ্রমকে সমর্থন করা আর এর উদারনৈতিক ব্যখ্যায় কিছু শব্দ চলে আসে যেমন- আজকের ব্যস্ত জীবনব্যবস্থা, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ, স্বামী-স্ত্রী একক পরিবারের চাপ, অর্থনৈতিক অপারগতা ইত্যাদি। এ শব্দগুলো নিয়ামক বৃদ্ধাশ্রমকে প্রমোট করার। শব্দগুলোতে আমি ঘৃণা মেখে দিই প্রতিদিন।
আজ যারা বৃদ্ধাশ্রমে আঁচলে চোখ মোছেন, কিছু বলতেই ভেঙ্গে পড়েন, সারাক্ষণ পরিবার আর সন্তানের সঙ্গে থাকার সময়টাকেই ধরে রাখেন কথায়, আঁচলে।

মানুষ শুধু খেতে পরতে বাঁচে না, শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তাই সব না। শোক আর সুখ একটা নিয়ামক। পরিবার একটা কেন্দ্র, সুখের শান্তির শোকের । যিনি ঘর বেঁধেছিলেন সেখানে নিঃশর্ত শ্রম ভালবাসা আর সমস্তটা সময়, পুরো যৌবন, সবটুকু আয় ঢেলেছেন সন্তান মানুষ করতে সেখানে থাকা যাবে না ভাবা বা সন্তানের কাছে থাকতে চাবার আকুতি বা নির্ভরশীলতাও, অন্যায় কীভাবে হয়?

ভালবাসা, শ্রদ্ধা, যত্ন ও জীবনের অনেক মৌলিক প্রয়োজনের প্রাথমিক সোর্স হচ্ছে পরিবার। বৃদ্ধ, শিশু বা পরিবারের একজন অসুস্থ সদস্য পরিবারের অন্য সক্ষম সদস্যের উপর নির্ভর করেন। সন্তান সেটি খুব নৈতিক দায়িত্ব থেকে করবেন তা নয় বরং এটি যেন হয় আবেগ এবং দায়িত্ববোধ থেকে।

সামাজিক জীবন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, আধুনিকতা এগুলো মানুষের জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিলেও বৃদ্ধ জনগণ সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এবং এই বিচ্ছিন্নতা ক্রমবর্ধমান। বৃদ্ধাশ্রম কন্সেপ্টটা তাদের আরো বিচ্ছিন্ন করবে। যদিও সেটি কোন আরামপ্রদ স্থান নয়, তবুও ধরে নিলাম আধুনিক, সুন্দর, মনোরম তবুও এটা পরিবার বিচ্ছিন্নতা তো? ঠিক এই ব্যপারটি নিষ্ঠুর।

পরিবার প্রথায় যারা নিঃশব্দ বা সশব্দ আপত্তি করেন, যারা ভাংতে চান, তাদের বলি, আগে নিজেই বয়কট করেন পরিবার কন্সেপ্টকে। তারপর না হয় অন্যদের উদ্বুদ্ধ করবেন। না, আমি একটুও খোঁচাচ্ছি না, একটুও না। যে কোনো বিশ্বাসের মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে, থাকবেও। খেয়াল রাখতে হবে একজনের বিশ্বাস যেন অন্য একজনকে অফেন্ডেড ফিল না করায়। পরিবার প্রথা ভাঙ্গার প্রথম গিনিপিগ যেন বৃদ্ধরা না হোন।

তাদের জন্যও দিবাযত্নকেন্দ্র হতে পারে, হতে পারে সমবয়সীদের সামাজিক ক্লাব, তাদের অবকাশকেন্দ্র (গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউসের মত) থাকতে পারে। বৃদ্ধাশ্রম বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া ভালো অনেককিছু করা যায়।

বার্ধক্য সুন্দর, বার্ধক্য স্বাভাবিক আমরা প্রতিনিয়ত বার্ধক্যের দিকেই যাচ্ছি। সবাইকে এই শারিরীক বার্ধক্যর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে। মানুষের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার মানুষ সবসময় বৃদ্ধ থাকবে। একদল যুবক হবে অন্যদল বৃদ্ধ।

এই জীবনটা সুখের হোক, দুশ্চিন্তামুক্ত হোক, ভালবাসাময় হোক। বয়োবৃদ্ধরা আমাদের এই ব্যস্ত জীবনের সাথে, আধুনিকতার সাথে আমাদের সবকিছুর সাথে যুক্ত থাকুক। কখনো বিচ্ছিন্ন না হোন। নিজেকে কখনো পরিত্যক্ত না ভাবুক। সববয়সের মানুষের সংযুক্তি থাকুক ভালবাসায়, বন্ধনে।

শেয়ার করুন:
  • 542
  •  
  •  
  •  
  •  
    542
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.