কারও পরিচয় কেন ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হবে?

0

লিপিকা তাপসী:

হিজড়াদের নমিনেশন সংগ্রহ নিয়ে মিডিয়ায় নিউজ এসেছে, তৃতীয় লিঙ্গের এতোজন নমিনেশন সংগ্রহ করেছেন। আবার রাষ্ট্র হিজড়াদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে।

একজন মানুষের পরিচয় কীভাবে লিঙ্গ দিয়ে হয়? পুরুষ এবং নারীর ক্ষেত্রে এরকম শিরোনাম তো হয় না ‘প্রথম লিঙ্গের অথবা দ্বিতীয় লিঙ্গের এতজন এই কাজটি করেছে।’ তাহলে হিজড়াদের বেলায় লিঙ্গীয় পরিচয় ধরেই একজনকে পরিচয় করাতে হবে কেন? এটিতো শরীরে একটি অংশ ছাড়া কিছু নয়।

একটি অংশ গোটা মানুষের পরিচয় নির্ধারণ তো করতে পারে না। তাছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ থাকলে প্রথম লিঙ্গ, দ্বিতীয় লিঙ্গ আছে। হিজড়ারা যদি তৃতীয় লিঙ্গ হয়, তবে দ্বিতীয়, প্রথম লিঙ্গ কারা কারা? সংবিধান যেখানে বলছে ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ করা যাবে না। আবার লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বলে দিচ্ছে তুমি তৃতীয়।

লিপিকা তাপসী

নারী, পুরুষ, হিজড়াকে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এভাবে র‌্যাংক করে দিয়ে কিভাবে লিঙ্গীয় বৈষম্য দূর করা সম্ভব? বৈষম্য থেকে যে নির্যাতন, শোষণ সেটা কিভাবে বন্ধ হবে? কারণ রাষ্ট্র যখন নির্ধারন করে দেয় এভাবে, তখন মানুষের মনোজগত তাই ধারণ করে এবং সেভাবে সে আচরণ করে। প্রথম লিঙ্গ তখন দ্বিতীয়, তৃতীয় লিঙ্গের উপর, কর্তৃত্ব করে, বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আর এই বিষয়টি একটি রাষ্ট্রে সবাই সমান, রাষ্ট্র সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করবে এই ধারণার সাথেও যায় না।

এখন প্রশ্ন হতে পারে তাদেরকে কোন নামে তাহলে ডাকা হবে?

বাংলা ডিকশনারিতে হিজড়াদেরকে এভাবে সঙ্গায়িত করা হয়েছে ‘একই দেহে পুরুষ বা নারী চিহ্নবিশিষ্ট মানুষ বা প্রাণী’। তাহলে তাদেরকে তো হিজড়া নামেই ডাকা সম্ভব। যদিও সমাজ এই শব্দটাকে সম্মানজনকভাবে ব্যবহার করে না। সমাজে হিজড়া একটা গালি, হাসির পাত্র। সেটি তো সমাজের সমস্যা। সেটাকে তো দূর করার জন্যে কাজ করতে হবে, সেটাতে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। লিঙ্গ পরিচয়ের জায়গায় নারী, পুরুষ, হিজড়া অপশন থাকবে সেখানে যে যেটা সে সেইটা লিখবে।

তাদেরকে নারী বা পুরুষ হিসেবে ভাবার প্রয়োজন কেন পড়ে? তারা নারীর মতোও নয়, আবার পুরুষের মতোও নয়, তারা তাদের মতো, তারা আলাদা মানুষ, জোর করে নারী বা পুরুষ বানানোর দরকার নেই তো। এই দুই এর বাইরেও আলাদা কোনো মানুষ থাকতে পারে, তাদেরকে সেভাবেই পরিচিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্যেও সবখানে সমান সুযোগ, সুবিধা রাখতে হবে। তাদের জন্যে শিক্ষায়, চাকুরীতে, রাজনীতিতে আলাদা কোটা রেখে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সবখানেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে নারী আর পুরুষকে মাথায় রেখে। বাসের সিটে, সংসদীয় আসনে, পাবলিক টয়লেটে, ভোটের নারী-পুরুষের লাইনে তাদেরকে এই ঠেলাঠিলির মধ্যে ফেলার সিস্টেম রয়েছে। হিজড়ারা কোথাও কোথাও বেসরকারী চাকুরী করে জীবিকা চালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো কারো চাকরিকে টা টা বলতে হয়েছে, খুঁজতে হয়েছে অন্য পেশা। কারণ টয়লেট ব্যবহার নিয়েই তাদেরকে যে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, তা বেদনাদায়ক। তাদের জন্যে আলাদা টয়লেট নেই, নারীদেরদের টয়লেটে গেলে নারীরা তাদেরকে বের করে দেয়, আর পুরুষদের টয়লেটে গেলে তারা বের করে দেয়। তাছাড়া তাদের নিয়ে হাসাহাসি, ঠাট্টা তো আছেই। একই কারণে হিজড়াদেরকে সংরক্ষিত নারী আসনেই নমিনেশন ফরম কিনতে হচ্ছে।

কথা হলো হিজড়ারা তো তৃতীয় লিঙ্গ, নারী নয়, তাহলে নারী আসনে কীভাবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে? নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, যারা ভোটার তালিকায় নারী হিসেবে নিবন্ধিত, তারা প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারবেন। যারা পুরুষ হিসেবে নিবন্ধিত, তারা পারবেন না। সুতরাং সিস্টেম পরিবর্তন ভীষণ জরুরী।

সবখানেই তাদের যে এই অধিকারহীনতা, অমানবিক ব্যবস্থা, তা জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবেন, পরিবর্তন আনতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখতে পারবেন যদি সংসদে যেতে পারেন তারা। কারণ বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা তাদেরকেই বাঁধতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares

লেখাটি ৩৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.