জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে জানুন, প্রতিরোধ করুন

0

ডা. রাহনূমা পারভীন:

মেডিকেল অনকোলজির আউটডোর এ প্রচণ্ড ভীড় আর রোগীর চাপ। এক সারিতে বসে একের পর এক রোগী দেখে যাচ্ছি সবাই। রুমের ভিতর তীব্র এমোনিয়া স্মেল। প্রথমে অস্বস্তি হলেও কিছুক্ষণ পর নাকে সয়ে যায়। কিন্তু যারা নতুন প্রবেশ করছে তারা নাক কুঁচকে ও বিভিন্ন শব্দ করে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করছে। ভাবলাম হয়তো কোন পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা স্ট্রোকের রোগী আছে রুমে।

একটু পর পরবর্তী রোগীকে ডাকতেই গন্ধ তীব্র আকার ধারণ করলো। রোগী একজন মধ্যবয়ষ্ক নারী, সঙ্গে আরো একজন সমবয়সী নারী, যিনি রোগীকে নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় আছেন।

রোগীর বর্তমান অবস্থা জিজ্ঞেস করতে জানালেন, শরীরে পানি চলে এসেছে, শরীর ফুলে যাচ্ছে। কিডনির সমস্যা মনে হচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম …
– প্রস্রাব কী পরিমাণে হয় আপনার?
– জানি না মা
– অল্প হয় না ঠিক পরিমাণেই হয়?
– কইতে পারি না মা, প্রস্রাব তো সারাক্ষণই ঝরে…

রোগীর ক্যান্সারের নামটি আরেকবার পড়তেই ঘটনা পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে, কারণ দু’একদিন আগেই পারভীন ম্যাডাম এই ক্যান্সারের রোগী কীভাবে মারা যায় সেটা বোঝাচ্ছিলেন, শুনে শিউরে উঠেছিলাম। আজকে একেবারে চাক্ষুষ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কারণ বেশিদিন হয়নি ক্যান্সার হাসপাতালে জয়েন করেছি।

রোগীর ও রোগীর পরিবারের টার্মিনাল কাউন্সেলিং করতে হবে। মনে মনে তার প্রস্তুতি নিয়ে সঙ্গে যিনি এসেছেন তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
– রোগী আপনার কে হয়?
– কেউ না, পরিচিত।
– মানে! ওনার আপনজন, আত্মীয় কেউ আসেনি?
– যা বলার আমারেই বলেন, হ্যার আর কেউ দেহনের নাই, বাড়ির থেইকা বাইর কইরা দিসে।

খুবই স্বাভাবিক ঘটনা বাংলাদেশে। কোনো নারী অসুস্থ হলে তাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি দিয়ে আসা হয়, চিকিৎসা করে ভালো হতে পারলে আবার স্বামীর ঘরে আশ্রয় জোটে। আর রোগটি যদি ক্যান্সার হয়, বিশেষত স্তন বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার, তাহলে তো কথাই নেই, স্বামীর বাড়ি চিরদিনের জন্য ত্যাগ করে আশ্রয় জোটে বাবা বা ভাইয়ের বাড়িতে, এরপর দুর্বিষহ শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণা … স্বামী খুশিমনে আরেকটি বিয়ে করে নেয়।

এমনই কিছু একটা এই রোগীর ক্ষেত্রেও ভেবে নিয়ে বললাম,
– মা-বাবা, ভাই কেউ নেই?
– আছে সবই, এদ্দিন চিকিৎসাও করসে, অহন আর সহ্য করতে না পাইরা বাড়ির বাইরে বাইর কইরা দিসে।
– তো আপনি কে?
– আমি এগো পাশেই থাকি, বহুদিন ধইরা দেখতেসি কষ্ট পাইতেসে, মায়ায় পড়সি আপা … এতো কষ্ট, কেউ ঘরে জায়গা দেয় না, কই যাইবো? আমি বিধবা মানুষ, ছাওয়া-পাওয়া(ছেলে-মেয়ে) নাই, একলা ভাঙ্গা ঘরে থাকি, আমার উঠানে আইনা রাখসি। মাঝে মাঝে আপনেগো কাছে নিয়া আসি, কিন্তু কোন লাভ তো হয় না…

কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম।

ভদ্রমহিলা জরায়ুমুখ (সারভিক্স)-এর ক্যান্সারের টার্মিনাল স্টেজের রোগী। এই রোগের সর্বশেষ পরিণতি মূত্রনালীগুলো বন্ধ হয়ে কিডনিতে পানি জমে যাওয়া(হাইড্রোনেফ্রোসিস) এবং অনিরাময়যোগ্য কিডনি বা রেনাল ফেইলিউর হয়ে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর সাথে যদি ক্যান্সারের আগ্রাসন ও চিকিৎসাজনিত জটিলতা যুক্ত হয়, যা এনার ক্ষেত্রে হয়েছে, তাহলে তা আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

ওনার ক্ষেত্রে ক্যান্সারের কারণে মূত্রথলি ও যোনিদ্বারের মধ্যে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে; এখন সেই ছিদ্রপথে ক্রমাগত প্রস্রাব ঝরতে থাকে, কখনোই বন্ধ হয় না। একে বলে ভেসিকো-ভেজাইনাল ফিস্টুলা (Vesico Vaginal Fistula- VVF)। ক্যান্সারের টারমিনাল স্টেজে এসে এই ছিদ্র মেরামতের কোন উপায় থাকে না, তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুর্বিষহ এই যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। বেশির ভাগ সময়ই পরিবারের সদস্যদের পক্ষে দিনরাত ২৪ ঘন্টা প্রস্রাবের তীব্র গন্ধ সহ্য করা সম্ভব হয় না। তখন হতভাগ্য নারীটির স্থান হয় পথের পাশে।

জানুয়ারি মাসটি হচ্ছে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সচেতনতার মাস। বাংলাদেশে নারীদের স্তন ক্যান্সারের পরেই জরায়ুমুখের ক্যান্সারে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ হচ্ছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) সংক্রমণ। আসুন আজকে জেনে নিই এইচপিভি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

১। এইচপিভি একটি ডিএনএ ভাইরাস যার ১০০ এরও বেশি প্রজাতি আছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি প্রজাতি যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এবং যৌনাঙ্গের সাধারণ আঁচিল থেকে শুরু করে জরায়ুমুখের ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩ প্রজাতির এইচপিভি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যার মধ্যে এইচপিভি-১৬ আর এইচপিভি-১৮ শতকরা ৭০ ভাগ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

২। এইচপিভি সংক্রমণ খুবই সাধারণ একটি ছোঁয়াচে রোগ, পৃথিবীর অধিকাংশ নারী-পুরুষ (প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন) তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও এইচপিভি এর কোন একটি প্রজাতি দ্বারা আক্রান্ত হয়। এইচপিভি আক্রান্ত হলে কোন শারীরিক উপসর্গ প্রকাশ পায় না। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সংক্রমণ আমাদের অগোচরে ঘটে।

৩। এইচপিভি দ্বারা সংক্রমিত হলেই যে সবার ক্যান্সার হবে এমন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হওয়ার দু’এক বছরের মধ্যে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্বারা ভাইরাসটি সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। আর যদি তা না হয়, তাহলে সংক্রমণের পর ক্যান্সার তৈরি হতে ১০-৩০ বছর সময় লাগে।

৪। যৌনমিলন ছাড়াও অন্যান্য যৌনক্রিয়ার সময় যৌনাঙ্গের সংস্পর্শে এইচপিভি এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়, যেমন ওরাল বা এনাল সেক্স। সংক্রমণের জন্য এটি অন্যান্য যৌনবাহিত ভাইরাসের মতো সিমেন বা ভ্যাজাইনাল ফ্লুইডের উপর নির্ভর করে না। একারণেই এইচপিভি দ্বারা সহজেই নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার ছাড়াও নারী ও পুরুষ উভয়ের পায়ুপথ, যৌনাঙ্গ ও মুখ গহবরের বিভিন্ন অংশের ক্যান্সার হতে পারে।

৫। অল্প বয়সে যৌনক্রিয়ায় সক্রিয়তা (যেমন বাল্যবিবাহ), নারী ও পুরুষ উভয়ের বহুগামিতা এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৬। এইচপিভি এর কোন চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে এইচপিভি দ্বারা সৃষ্ট রোগ সমূহ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।

৭। এইচপিভি এর সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে হলে যৌনক্রিয়ায় সক্রিয় হবার পূর্বেই এইচপিভি এর টিকা নিতে হবে। এই টিকা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।

ডা. রেহনুমা পারভীন

বর্তমানে বাংলাদেশে সারভারিক্স নামে যে এইচপিভি এর টিকা পাওয়া যায় তা শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য এবং এটি কেবল এইচপিভি ১৬ ও ১৮ এর বিরুদ্ধে কার্যকরি। এছাড়াও গারডাসিল এবং গারডাসিল-৯ (ছেলেরাও নিতে পারে) নামে আরো দুটি টিকা পশ্চিমা দেশগুলোতে পাওয়া যায়।

৮। নিয়মিত কনডম ব্যবহার করে এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়, তবে পুরোপুরি রোধ করা যায় না।

৯। টিকা নিলেও প্রত্যেক নারীকে (যৌনক্রিয়ায় সক্রিয় হওয়ার পর) ২১ বছর বয়স থেকে নিয়মিত তিন বছর পর পর প্যাপ টেস্ট/স্মেয়ার করতে হবে। যদি ২১ বছরের পূর্বেই যৌনক্রিয়ায় সক্রিয় হয় তাহলেও ২১ বছরের পর থেকেই প্যাপ টেস্ট করতে হবে, তার আগে নয়। এছাড়াও এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট করা যায়।

১০। বাংলাদেশে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক স্ক্রিনিং এর জন্য সরকারীভাবে প্রায় সকল জেলা ও উপজেলায় ভায়া (VIA-Visual Inspection with Acetic acid) টেস্ট এর সুবিধা আছে। কিন্তু এই ভায়া টেস্টই শেষ কথা নয়। যদি এই টেস্টে জরায়ুমুখের কোন অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে তবে অবশ্যই আরো কিছু অত্যাবশ্যকীয় টেস্টের মাধ্যমে ক্যান্সার আছে কি নেই তা নিশ্চিত হতে হবে।

ঝুঁকির কারণ সমূহ:

এইচপিভি আক্রান্তদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়ে যায় যদি আরো কিছু ক্ষতির কারণ এর সাথে যুক্ত হয়।

যেমন:

**ধূমপান জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি দ্বিগুণ করে।

**দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্যও ঝুঁকি বাড়ে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন, এইচআইভি ইনফেকশন ও আরো কিছু রোগ আছে যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে, যেমন, অটো ইমিউন ডিজিস।

**অন্যান্য ইনফেকশন যা জননতন্ত্রকে আক্রান্ত করে, ক্ল্যামাইডিয়া ইনফেকশনসহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

**খাদ্য তালিকায় ফলমূল ও শাক সব্জির স্বল্পতার ফলে দেহে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস এর অভাব হয়, যা জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

**দৈহিক স্থূলতা, দীর্ঘমেয়াদে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি গ্রহণ, তিন বা ততোধিক সন্তানের জন্মদান জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ১৭ বছরের নিচে প্রথম সন্তানের জন্মগ্রহণ — ঝুঁকি দ্বিগুণ করে।

**দরিদ্র আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবারের নিকটজনদের কারো জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারকে রুখতে হলে প্রয়োজন

১। এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে আনা—
– বাল্যবিবাহ প্রতিহত করা
– ১৮ বছরের পূর্বে সন্তান না নেয়া
– যৌনসঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, যৌনসঙ্গীর সংখ্যা সীমিত রাখা
– যৌনমিলনে নিয়মিত কনডম ব্যবহার করা
– যৌনকার্যে সক্রিয় হওয়ার আগেই এইচপিভি এর টিকা নেয়া

২। ধূমপানে আসক্ত না হওয়া

৩। অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের ব্যাপারে সচেতনতা ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া

৪। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল ও শাক সবজি রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা

৫। টিকা দেয়া থাক বা না থাক, অবশ্যই নিয়মিত জরায়ুমুখের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং টেস্ট করানো।

ডা. রাহনূমা পারভীন: মেডিসিন ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন:
  • 414
  •  
  •  
  •  
  •  
    414
    Shares

লেখাটি ১,২৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.