ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে, রোধ হবে কবে?

সাজু বিশ্বাস:

গত তিন দিনে তিনটে নিউজ দেখেছি যৌন নির্যাতনের। একটি পনেরো বছরের মেয়ে যৌন নির্যাতনের ফলে সন্তানসম্ভবা হয়েছে। খবর পেয়ে এলাকার ওসি সাহেব নিজে উদ্যোগ নিয়ে ঐ ধর্ষণকারীর সাথেই ঐ মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি একটি গ্রুপ রেইপ। একটি কলেজে পড়ুয়া মেয়ে গ্যাঙ রেপের শিকার হয়েছে। তো এইক্ষেত্রে মেয়েটিকে কার সাথে বিয়ে দিয়ে ফয়সালা করা সম্ভব! তৃতীয় ঘটনাটি উপর্যুপরি করুণ। একটি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া কিশোরী মেয়েকে গ্রামের এক বখাটে শারীরিক নির্যাতন করে এবং ঐ মেয়েটির পরিবার তাই নিয়ে থানায় অভিযোগ করলে বখাটে ছেলেটিকে জেল হাজতে পাঠানো হয়। এদিকে ঐ নির্যাতনের ফলে মেয়েটি গর্ভধারণ করে। গত সতেরো তারিখ মেয়েটির প্রসব বেদনা উঠলে তাকে হাসপাতালে এনে অপারেশন করা হয়। একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মেয়েটি পথের মধ্যেই মারা যায়। নিউজ হেডলাইন দিয়েছে,— জন্মের পরে মাকে হারালো শিশুটি, তার বাবাও তার মাকে ধর্ষণের দায়ে জেলে।

কথা হলো, ধর্ষকের সাথে বিয়ের দায়িত্ব ওসিকে দিল কে! একটা লোক একটা চরম অপরাধ করেছিল। পৃথিবীর কোনও কোনও দেশ এখন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত করছে। সেইখানে আমরা ঐ লোকটির সাথে ভিকটিম মেয়েটিকে সারাজীবনের জন্য জুড়ে দিতে চাইছি।

সাজু বিশ্বাস

একজন যৌন নির্যাতনকারী লোক, সে বড় বা ছোট যে কোনোও প্রকার যৌন নির্যাতনই হোক না কেন,— সেই নির্যাতনকারী নিঃসন্দেহে মানসিকভাবে অসুস্থ। যে মানুষ নিজের পশুবৃত্তি নিজের আয়ত্বে রাখতে পারে না, সে অন্যতম পশুই। এবং যে কোনও রকম যৌন নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধের গুরুত্ব হিসেবে ধর্ষণ একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ হবার কথা।

আমরা সারাজীবন মেয়ের মুখের দিকেই তাকিয়ে গেলাম! তাই মেয়ে যখন একটা অপদার্থ মানুষরূপী পশুর দ্বারা বলাৎকারের শিকার হলো,— আমরা ভাবতে বসলাম, মেয়েটা তো অশুচি হয়ে গেছে! ঐ ছেলের সাথেই এবার মেয়েটির বিয়ে দিলে দুই কূল রক্ষা হলো! মানে, আমরা এবার লোকটিকে ইচ্ছে মতো ঐ মেয়েটিকে ব্যবহার করার একটি বৈধতা দিয়ে নিশ্চিত হলাম। একটি মেয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবে একটি নিকৃষ্ট পশুবৃত্তির লোক দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। সেই ব্যাপারটাকে সারিয়ে তোলার বদলে কী চমৎকার একটি বিবাহ নামক সামাজিক ঢালাইয়ের বন্দোবস্ত করা হলো!

তা, বিবাহ কী তাহলে! প্রেম ভালবাসা এবং সম্মানের সাথে সংসার করার ব্যবস্থা নয়! এই লোকটির মধ্যে ওই মেয়েটির জন্য যদি প্রেমই থাকতো,— তাহলে বিষয়টা নির্যাতন হতো কেমনে!

পথে পড়ে যে মেয়েটি মারা গেছে তার মোটে পনেরো বছর বয়স। পনেরো বছরের একটি কিশোরী কেবল ফ্রক ছেড়ে কামিজ পরা ধরেছে হয়তো। তার একটি নিরাপদ সমাজে বসে স্কুলে যাবার কথা, ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে পড়ালেখা করার কথা, ছোট ছোট চোখে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা কবি হবার স্বপ্ন দেখার কথা। সেই মেয়েটি যখন নিজের কোনও দোষ ছাড়াই একদিন আবিস্কার করে যে একটি পশু জোর করে তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল এবং সেই ঘটনার জের ধরে তাকে অপারেশনের টেবিলে গিয়ে নিজের শরীর কেটে একটি মানুষের বাচ্চা বের করতে হচ্ছে,— তখন স্বাভাবিকভাবেই এই পৃথিবীতে বাঁচার সমস্ত ইচ্ছা সেই মেয়েটির চলে যাবার কথাই।

একটা লোক একটি নিকৃষ্ট অন্যায় করেছে। আগে তার শাস্তি পাবার কথা। এটাই তো নিয়ম হওয়া উচিত। আমাদের সমাজ আগে ভাবে, — মেয়ে বাদ দিয়ে থোও তুমি, পেটের বাচ্চাটার কী হবে! তার তো পরিচয় চাই! কেন! পৃথিবীতে আসতে হলে কি পরিচয় ট্রেডমার্ক করেই আসতে হবে যে ধর্ষণকারী হইলেও সে জন্মদাতা!

যে মানুষ নিজে প্রত্যাশা করে একটি সন্তানের জন্ম দেয়, পিতা তারই হওয়া উচিত। পশুরাও প্রজনন করে, বংশবৃদ্ধি করে,— কিন্তু বাবা হয় না। মানুষের সেই সৌভাগ্য আছে, পিতা হবার। নিজের উত্তরসূরি রেখে যাবার। এটি স্বাভাবিক বিচারবোধের কথা। যৌন নির্যাতনকারী লোকটা কীভাবে ঐ সন্তানের জনক হয়!

ধর্মত; এবং নৈতিক দিক দিয়ে কোনও ভাবেই এই রকম একটি লোক একটি নিষ্পাপ শিশুর পিতা এবং এই নির্যাতিতা মেয়েটির স্বামী হতে পারে না। যদি পবিত্রতার দোহাই পাড়েন, — তবুও নয়। পবিত্রতা কেবল মেয়ের বেলাতেই যথেচ্ছ চলে যায় এ কেমন কথা!

বাকি থাকে শিশুটি। তার কোনও দোষ নাই। জন্মের সময় এমনকি কেউ জানেও না যে সে গোয়ালঘরে জন্মালো,— নাকি রাজপ্রাসাদে! কাজেই জন্মদোষ মানুষের হতে পারে না। আমাদের দেশে যে এতো এতো এতিমখানা আছে, এতো এতো নিঃসন্তান বাবা-মা আছে, তারা কেউ হয়তো নিয়ে নেবে বাচ্চাটি! পেট থেকে বের করার কারণে মেয়েটির মনে যদি মাতৃভাব জন্মায়, — রাষ্ট্র তো কত মানুষের জন্য কত রকম বৃত্তির ব্যবস্থা করে। এমন একটি বৃত্তিই না হয় থাকুক এই সব হতভাগ্য মায়েদের জন্য! কিন্তু তাই বলে একটি শিশুর কেবলমাত্র বাপের পরিচয় নিশ্চিত করতে গিয়ে একজন রেপিস্ট লোককে তার পাওনা সাজা দেবার বদলে তাকে পিতৃত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করে মেয়েটিকে সারাজীবনের জন্য ঐ যৌন নির্যাতনকারীর গলায় ঝুলিয়ে সর্বত্র লাভেলাভ ধরনের একটা সামাজিক সমাধান করার কাজটি অত্যন্ত খারাপ রকমের উদাহরণ তৈরি করবে ভবিষ্যতের জন্য।

২০১৯ সালের প্রথম দিন শুরু হয়েছে মেয়ে নির্যাতনের খবর দিয়ে। দিন বাদ যায় নাই। এমনকি যখন এই লেখা লিখছি, তখনও আজকের নির্যাতনের ঘটনা চোখে পড়েছে। ঘরের টিনের বেড়া কেটে ঘরে ঢুকে এক গৃহবধুকে নির্যাতন করা হয়েছে।

কাজে কাজেই যে যেখানে আছেন, সেখান থেকেই এই মানুষরূপী পশুদের প্রতিহত করুন। শুধুমাত্র মেয়েটির ভরণপোষণের দায়িত্ব গছিয়ে দেবার জন্য একজন যৌন নির্যাতনকারীর শাস্তিবিধানের বিষয়টির সাথে আপোস করবেন না।

শেয়ার করুন:
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.