শিশুদের জন্য কী ভয়ংকর পৃথিবী!

0

মনিজা রহমান:

‘হ্যাভারহিলের অনূর্ধ্ব-১২ বালিকা বেসবল দল নিউইয়র্ক সিটিতে খেলতে যাচ্ছে’। খবরটার সঙ্গে একটা গ্রুপ ছবিও দেয়া হয়েছে।

আমেরিকার সর্ব উত্তরের স্টেট মেইন। সেখানে কদিন বেড়িয়ে নিউইয়র্ক সিটিতে নিজেদের বাড়িতে ফেরার পথে হ্যাভারহিলে যাত্রা বিরতি করেছিলাম। উদ্দেশ্য মধ্যাহ্নের ভোজ। ছোট্ট শহর হ্যাভারহিল দেখতে অনেকটা ছবির মতো। আমরা যে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম, সেটা ছবির চেয়েও সুন্দর। সবুজ ঘাসের দ্বীপে ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দা, তারপর পর্দা সরালেই রেস্টুরেন্ট। বারান্দায় কাঠের বেঞ্চিতে বসে স্থানীয় পত্রিকাটা হাতে নিয়েই খবরটা চোখে পড়লো। এটাই ছোট্ট শহরের প্রধান খবর। লিড নিউজের সঙ্গে লিড পিকচার। ধ্যানে-জ্ঞানে ক্রীড়া সাংবাদিক বলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবরটা পড়লাম। হ্যাভারহিলে ছোট্ট মেয়েরা বড় শহরে যাচ্ছে বেসবল খেলতে, সেখানে তাদের আবেগ উচ্ছাস আর প্রত্যাশার কথা লেখা হয়েছে। কেউ একজন কোচের মেয়ে। কেউ সেই মেয়ের বন্ধু। কীভাবে স্কুল থেকে, পাড়ার বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে বেসবল দলে ঢুকলো, সেই কাহিনী। তাদের কেউ কেউ আরো আগে থেকে মানে অনূর্ধ্ব-৮ বছর বয়স থেকে বেসবল দলে খেলছে, সেই কথাও লেখা ছিল।

মনিজা রহমান

পড়তে পড়তে মনটা কেমন অজানা আবেগে দ্রবীভূত হলো। অজানা-অচেনা ক্ষুদে বালিকাদের জন্য হৃদয়টা শুভকামনায় ভরে গেল। কত আনন্দময় শৈশব ওদের। সৃষ্টিকর্তা থেকে পাওয়া একটাই জীবনকে কত চমৎকারভাবেই না কাজে লাগাচ্ছে। এই দেশে আসার পরে থেকে দেখেছি, এখানে মেয়ে ও ছেলে শিশুদের মধ্যে কোন বিভেদ নেই। বরং মেয়ে শিশুরা যেন একটু বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত। তাদের একাগ্রতা, শৃঙ্খলা ও আদেশ পালনে নিষ্ঠা অনেক বেশি। বাংলাদেশেও ছোটবেলা থেকে দেখেছি, মেয়েরা শৈশবে যেটুকু সুযোগ পায়, তাই কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। যদিও সুযোগ সবসময় মেলে না। বাবা হারমোনিয়াম কিনে না দেবার জন্য আমার এক ছোট বোনের গান শেখা হয়নি। স্কুলের সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম মেয়েটিকে স্টেডিয়ামে নিয়ে যাবার মতো কেউ ছিল না বলে ওর খেলোয়াড় হওয়া হয়নি।

তবু মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে এখন সর্বত্র। সম্মিলিত মেধা তালিকায় তাদের অবস্থান এখন ছেলেদের ওপরেও থাকছে। গ্রামের মেয়েরা রিক্সায়-ভ্যানে-বাসে করে কলেজে পড়তে যাচ্ছে। সমাজের অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু এই সব ঘটনার মধ্যে যখন দেখি, স্কুলে যাবার পথে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী কিংবা প্রাইভেট পড়ে আসার পথে ধর্ষণ ও পরে হত্যা, তখন শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে আসে। অবশ লাগে নিজের মধ্যে। মাঝে-মধ্যে মনে হয় যেন উঠে দাঁড়াতে পারি না। কোন মানুষ বা মানুষের চেহারা নিয়ে লুকিয়ে থাকা নরকের কিট এটা ঘটাতে পারে এটা ভাবতেই ঘৃণায় সারা শরীর রি রি করে ওঠে।

আমেরিকাতেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অনেকক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়েই এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী। শিশুদের ক্ষেত্রেও এটা ঘটছে। সৎ বাবা কিংবা মায়ের প্রেমিকের কাছে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অনেক শিশু বা কিশোরী। বাইরের লোক দ্বারাও হচ্ছে। কিন্তু সব খবরই সামনে আসছে। চাপা থাকছে না। বাংলাদেশে যত ধর্ষণ ঘটে, তার কতখানি প্রকাশিত হয়? আমাদের সমাজে বেশিরভাগ পরিবারেই কোন না কোন মেয়ে আছে যে আপন আত্মীয় দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিংবা যৌন নির্যাতিত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা চেপে যাওয়া হয়।

তবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগে এতটা প্রকট ছিল না এখনকার মতো। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দিনের পর দিন অপরাধীদের মানসিকতা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। মাদকের অবাধ বিস্তার এর পিছনে প্রধান কারণ বলে ধরা হচ্ছে। দুর্বল আইনের শাসন, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া, সম্পত্তির লোভ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন এই সব কারণ ধর্ষণের মতো ভয়ংকর কাজ করতে তরুণদের উৎসাহিত করছে।

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের দিন রাতে নোয়াখালির সুবর্ণচর উপজেলায় গণধর্ষণের শিকার হোন এক গৃহবধু। এই ঘটনায় দলমত নির্বিশেষে সারা দেশ নিন্দার ঝড় ওঠে। পরে পুলিশ সক্রিয় হয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করে। যদিও বাংলাদেশে সব সরকারের সময়ই দেখা যায়, অপরাধীরা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ সেভাবে থাকে না।

শিশুদের ক্ষেত্রে কেন এটা বার বার ঘটছে? প্রধান কারণ শিশুরা সরল, তারা প্রতিবাদ করতে পারে না ও শারীরিকভাবে তারা দুর্বল। তাদের একটা চকলেট, একটা খেলনার লোভ দেখিয়ে সহজেই বশ করা যায়। ১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবারের ঘটনাই দেখুন। রংপুরের পীরগঞ্জে আদিবাসী পল্লীতে ছয় বছরের শিশুকন্যা ধর্ষণের শিকার হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রুবেল তিরকি নামে তিন সন্তানের পিতা এক লম্পট আখ ভেঙ্গে দেবার লোভ দেখিয়ে ওই শিশুকন্যাকে আখক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে।
গত রবিবার সাতক্ষীরার আশাশুনিতে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রীকে কেবল ধর্ষণ করা হয়নি, ধর্ষণের পরে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার জন্ম যে এলাকায় সেই ঢাকার গেন্ডারিয়ায় দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর তিনতলা থেকে ফেলে দিয়েছে নাহিদ নামে এক বর্বর পশু। শুধু মেয়েরাই নয়, ছেলে শিশুও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। রাজন হত্যার ঘটনা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি।

তবে আশার কথা হলো, মানুষ প্রতিবাদ করতে শিখেছে। রুবেল তিরকিকে জুতার মালা পরিয়ে সারা গ্রাম ঘুরানো হয়েছে। আশাশুনিতে সর্বস্তরের মানুষ মানববন্ধন করেছে ধর্ষক জয়দেব সরকারের ফাঁসির দাবিতে। গেন্ডারিয়াতে অভিযুক্ত নাহিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্থানীয় থানার সামনে বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী। মানুষ যে জেগেছে এইটুকুই সান্ত্বনা।

আমেরিকায় যখন একটা শিশু খেলার মাঠে যায়, শীতে স্কেটিং, সামারে সাঁতার, ফল মৌসুমে সার্ভিং কিংবা বসন্তকালে ঘোড়া চালানো শেখে, এর বাইরে গিটার-পিয়ানো-আর্ট-ডিবেট ইত্যাদি করে, সেখানে বাংলাদেশের মেয়েরা ভয়ে জুবুথবু হয়ে থাকে। স্কুলে-কোচিংয়ে যাওয়ার সময়ও বাবা-মায়ের সাহায্য নেয়, নয়তো পথে ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হবার অনেক আশংকা। এভাবে জগতটা তার জন্য ছোট হয়ে যায়। শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী দেয়ার অঙ্গীকার হোক আজকের শপথ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares

লেখাটি ৬৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.