পুরুষ ‘অবুঝ’, নারীকেই সমঝে চলার উপদেশ

0

অর্পিতা শামস মিজান:

গতকাল সন্ধ্যায় ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি লেখা চোখে পড়লো। শিরোনাম “সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী”। লেখাটি শুরু হয়েছে আফসানা মিমি এবং বিপাশা হায়াতের কথা দিয়ে। তাঁদের নাম দেখে ভাবলাম, হয়তো আমাদের শৈশবের প্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লেখা।
লেখাটি পড়তে পড়তে আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। আসলে আজকাল এমন অনেক লেখা চোখে পড়ে, যেগুলো অত্যন্ত সুলিখিত এবং সুপাঠ্য। ভাব ও ভাষা দেখলে আপাতভাবে মনে হয় এক, কিন্তু ভালো করে পড়লেই দেখা যায়, আসল বক্তব্য আরেক। এমন লেখার সমস্যা হচ্ছে, এ লেখাগুলোতে খুব সুন্দর ভাষায় যা কিছু কথা বলা থাকে, তা কেবল একপেশেই নয়, উপরন্তু ভ্রান্তিমূলক।

যেমন এ লেখাটি। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, হয়তো লেখিকা বলবেন যে মিমি-বিপাশাদের মতো (তাঁর ভাষায় মার্জিত ভদ্রোচিত চেহারার) অভিনেত্রীদেরও যখন পাঠক/দর্শক পুরুষের কামুক দৃষ্টিতে পড়তে হয়, তার মানে নিশ্চয়ই আমাদের দেশে ছেলেদের বেড়ে ওঠায় কোন সমস্যা আছে, সে বিষয়ে দৃকপাত করা হবে।
কিন্তু তা না, অবাক হয়ে দেখলাম, লেখার সারমর্ম হলো, ভদ্র নায়িকারাও যেহেতু রেহাই পায় না, তার মানে হলো পর্দা প্রথা আসলেই প্রয়োজন এবং সেটাই সব সমস্যা আসান করবে।

এখন কথা হচ্ছে, আমাদের দেশে যে পুরুষেরা কামুক হিসেবে বড় হয়, তার কারণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবাইকেই যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের দীক্ষা দেয়া হয় না, স্বাভাবিক যৌন জ্ঞানার্জন করতে দেয়া হয় না, ফলে অনেক বিকৃত মানসিকতার মানুষ তৈরি হয়।

যৌনতা সব মানুষেরই থাকে। মেয়েরা কি ছেলেদের প্রতি কখনও আকৃষ্ট হয় না? তাই বলে কতজন মেয়ে পাবলিকলি বা দাওয়াতের টেবিলে বসে এমন বিকৃত আচরণ করে? অনেক কম, ইন ফ্যাক্ট চোখেই পড়ে না।
তার কারণ এই না যে মেয়েরাই ভালো, অন্যেরা খারাপ। মানুষ ভালো মন্দ মিশিয়ে, কোন বিশেষ লিঙ্গ অপর লিঙ্গ থেকে খারাপ/ভালো এ কথার কোন ভিত্তি নাই।

তাহলে মেয়েরা কেন করে না? কারণ সমাজে মেয়েদের স্বাধীনতা অনেক কম। মেয়েদের পদে পদে হুকুম দেয়া হয়। মেয়েরা চাইলেও তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে না, সেটা খাওয়ার ইচ্ছা, পড়ার ইচ্ছা, চাকুরির ইচ্ছা থেকে শুরু করে প্রেম, বিয়ে, যৌন ইচ্ছা সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

কাজেই ওখানে যে লেখা হলো পর্দার কথা, বিকৃত মানসিকতার ছেলেদের কথা, তখন কিন্তু এ দিকটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে কেবল দেখানো হলো যে, পুরুষেরা তো এমন করবেই, মেয়েদের-ই নিজেকে সামলে চলা উচিৎ।

কেন? কারণ, ছেলেদের স্বাধীনতা থাকাটাই স্বাভাবিক, মেয়েদের স্বাধীনতা কম। ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ কম এটাই স্বাভাবিক, তাই মেয়েদের-ই দায়িত্ব নিতে হবে। আহারে, ছেলেরা সব দুধের শিশু। মেয়েরা সব এতই সমঝদার যে সব দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। কারণ আমরা সর্বংসহা। আমরা ভুলে যাই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে খালি কথা বলা না, আমি কেমন পোশাক পরবো, তাও এ অধিকার দ্বারা সুরক্ষিত।

লেখাটি ইসলামের বিশাল দোহাই দিল। এ কথা বলা হলো না যে, খোদ পবিত্র কুরআন বলে দিচ্ছে যে পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার দায়িত্ব আছে। পর্দা যতো না শরীরের, তার চেয়ে বড় অংশ চোখে এবং মনে। তাই না, এও বলা আছে (সূরা আহজাব, আয়াত ৩২-৩৩) যে নারীরা যেন নরম কথা না বলে যাতে পুরুষেরা তাকে দুর্বল ভেবে সুযোগ নেয়, বরং উপযুক্ত ভাষায় কথা বলতে হবে।

আমি এমন মানুষ দেখেছি যাদের সামনে খাটো পোশাক বা বোরখা পরিহিতা মানুষ যেই দাঁড়িয়ে থাক না কেন, ভদ্রলোক মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। সামনের মানুষটার পোশাক বা চোখে না, ভদ্রলোকের দৃষ্টি সোজা মেঝেতে। তিনি নিজের ‘পর্দা’ রক্ষা করছেন, বেপর্দা (!) মেয়েদের সুযোগ নিচ্ছেন না।

এ ভদ্রমহিলার যুক্তি হলো তোমার সামনের পুরুষটি বাচ্চা, তাঁর কোন বিচারবুদ্ধি নাই। জেদী ডায়াবেটিকদের সামনে যেমন মিষ্টি রাখতে নেই, সিরিয়াল কিলারদের সামনে যেমন ভিক্টিমদের যেতে নেই, তেমনি মেয়েদের বেআব্রু হতে নেই। এবং এখানে আব্রু মানে পোশাক না, আব্রু মানে সোজা ভাষায় আবায়া, নিকাব, হিজাব এবং বোরখা। উনি এ শব্দগুলো লেখেননি অত্যন্ত চতুরতা করে, কিন্তু সমঝদারের জন্য ইশারাই কাফি।

কাজেই আইন পাল্টাতে হবে। ডাক্তার রোগীকে না, বরং রোগীর পরিবারকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করুক। সিরিয়াল কিলারদের সাজা দিয়ে কি লাভ বরং ভিক্টিমদের (বা মৃত ভিক্টিম হলে তাঁর পরিবারকে) শাস্তি দেই যে কেন তোমরা কিলারের সামনে আসলে?

যারা প্যাট্রিয়ার্কি বোঝেন না, তাদের জন্য এ ভদ্রমহিলার পোস্টটা প্যাট্রিয়ার্কি ১০১ হিসেবে কাজ করবে। এমন নারীরা নিজেদের এবং অন্য নারীদের সাজিয়ে গুছিয়ে পুতুল বানাতে চান। তাঁরা হেজিমনির চূড়ান্ত করেন এবং বলেন যে, বন্যেরা বনে সুন্দর, নারীরা পর্দার আড়ালে।

ধর্মের কারণে সমাজ রক্ষণশীল হয় না। রক্ষণশীল হয় এমন মানুষদের অপব্যাখ্যার কারণে, যারা একটি আয়াতকে প্রেক্ষাপটের বাইরে গিয়ে ‘ফেসভ্যালু’তে গ্রহণ করেন এবং অপরের ওপর চাপিয়ে দেন।
আর যে যে উচ্চশিক্ষিত(!) ব্যক্তিরা এমন লেখার সমর্থন করেন, আপনাদের প্রতি আমার সালাম। আপনাদেরকেই খুঁজছে তেঁতুল হুজুরের বাংলাদেশ।

লেখক অর্পিতা একজন সোশিও-লিগাল এনালিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক।
[email protected]

শেয়ার করুন:
  • 1.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.8K
    Shares

লেখাটি ৫,৬৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.