একজন শাহনাজ যখন আজকের বাংলাদেশ

0

সুপ্রীতি ধর:

উবারের বাইকার শাহনাজ আক্তারের ছিনতাই হয়ে যাওয়া স্কুটিটি পুলিশ উদ্ধার করেছে। রাতভর অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে বাংলাদেশ সময় রাত তিনটায় এটি উদ্ধার করা হয়, সেইসাথে ছিনতাইকারীকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্কুটিটি শাহনাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পরিবার চালানোর একমাত্র অবলম্বনটি ফিরে পাওয়ায় স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছেন শাহনাজ। তিনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন এই ঘটনায়। বাইক হারিয়ে তার কান্নার যে ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল, আমরাও তা দেখে মুষড়ে পড়েছিলাম এই ভেবে যে, আহারে, মেয়েটা একটা কিছু করে খাচ্ছিল! তাও বুঝি সইলো না!
আমরা ফেসবুকের বাসিন্দারাও বাইক ফিরে পাবার খবরে একইসাথে স্বস্তি পেয়েছি।

গত কয়েকদিন ধরেই শাহনাজ আক্তার ছিলেন আমাদের খবরে, আমাদের মনে। কারণ কী? কারণ তিনি নারী। বাংলাদেশের মতোন প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, যেখানে আহমেদ শফীর মতোন ভণ্ডরা চারদিকে কিলবিল করে নারীকে ঘরে পোরার বাসনায়, যেখানে মেয়েদের প্রতিটি পদক্ষেপ খুব তীক্ষ্ণভাবে নজরদারিতে রাখা হয়, পান থেকে চুন খসার অপেক্ষায় থাকে একদল, সেখানে শাহনাজ আক্তারদের স্কুটি চালিয়ে দুই মেয়েসহ সমাজে মাথা তুলে লড়াইয়ের কথা আমাদের প্রাণিত করে। আমরা বিন্দু বিন্দু করে শাহনাজের কষ্ট এবং লড়াই দুটোই স্পর্শ করতে সচেষ্ট হই। শাহনাজ হয়ে উঠেন আমাদের মেয়েদের লড়াইয়ের অন্যতম প্রতিভু। আমরা ঠিক সেই মুহূর্তেই সবকিছু ভুলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। নাহ্, যাই হোক, এই মেয়েরাই পারবে আমাদের খোলনলচে পাল্টে দিতে, এই মেয়েরাই মোক্ষম জবাব শফী হুজুরের বক্তব্যের, এই মেয়েরাই আমাদের সমাজের অন্যকম কীট, ভণ্ড মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের মুখে চরম চপেটাঘাত।

আমরা যখন এই স্বস্তি নিয়ে পাশ ফিরে ঘুমাতে শুরু করেছিলাম, যদিও আমাদের ঘুমানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যকার নানা সংঘাত মোকাবিলা করতে গিয়ে, তারপরও শাহনাজ আশা জুগিয়েছিল যেই মুহূর্তে, ঠিক তখনই তার বাইকটি ছিনতাই হয়ে যাবার খবর পাই আমরা। সাথে সাথে ফেসবুক সমাজে আলোড়ন জাগে। দলমত নির্বিশেষে সবাই পাশে এসে দাঁড়ায় মেয়েটির। বাংলাদেশ হেরে যায় না এখানে এসেই। সবার সমান অংশগ্রহণে ফেসবুক সমাজ যখন আন্দোলিত, তখন মূলধারার গণমাধ্যমও পিছিয়ে থাকতে পারে না। কারণ তারা জানে এই যুগে অনলাইনকে উপেক্ষা করার সাধ্যি আর কারও নেই। তারাও খবরটি ছাপে।

শুরু হয় পুলিশের তৎপরতা। চারদিকে সাড়াই বলে দিচ্ছিল ইতিবাচক খবরটি ঘটতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই। এই সাড়ার কাছে পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতাও নেই কিছু না করে থাকার। রাত তিনটার দিকে উদ্ধার হয় বাইকটি। আমরা ছবিতে দেখতে পাই শাহনাজকে হেলমেট পরেই ঘরে বসে থাকতে। বাইক হারিয়ে সে এতোটাই বিমর্ষ ছিল যে, বাইক না পাওয়া পর্যন্ত হেলমেট খুলবে না বলেই প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিল। কিন্তু শাহনাজ জানে না, বিশ্বের নানা প্রান্তের কতো হাজারও মানুষের শুভ কামনা আর দেশের সাংবাদিক এবং অনলাইন সমাজের তৎপরতা তার পাশে ছিল।

অবশেষে জয় হলো একজন শাহনাজের। আর জয় হলো সার্বিক মানুষের। মানবতার। পুলিশ এখানে চরম মানবিকতা দেখিয়েছে, যা তাদের দায়িত্বেরই অংশ, যেমনটাই হওয়া উচিত একটা সভ্য রাষ্ট্রের। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা এমন সব ঘটনার মোকাবিলা করি যে আমরা ভুলে যাই পুলিশ আমাদেরই অংশ, আমাদের সেবার কাজেই তারা নিয়োজিত। কেন যে এমনটি হয়ে ওঠে না আর সবক্ষেত্রেই! এতো বছর বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, পুলিশ চাইলে অনেক বড় বড় ঘটনাও তারা সমাধান করতে পারে। রাষ্ট্র তথা মানুষের সেবক হতে চাইলে এই চাওয়াটাই তাদের চাইতে হবে সবসময়।

দ্রুত লেখাটা লিখছি। কারণ শাহনাজের এই সাফল্যের অংশ হতে চাই। ওর পাশে আরেকটিবার দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের হাতটি প্রসারিত করে বলতে চাই, আমরা তোমার সাথে আছি। সেইসাথে এই বার্তাটিও দিতে চাই অন্য লড়াকু মেয়েদের যে, লড়াইটা সৎ এবং সঠিক হলে সেখানেও পাশে থাকবো আমরা। বেঁচে থাকার জন্য লড়াইয়ের বিকল্প নেই। আমাদের সম্মিলিত বা যুগপৎ লড়াই-ই আজকের বাংলাদেশ হয়ে উঠুক। আমরা আমাদের কাজের মধ্য দিয়েই শফী হুজুর তথা তাবৎ নারীবিরোধী শক্তিগুলোর ঘৃণ্য তৎপরতার অনন্য প্রতিবাদ হয়ে উঠতে পারি।

সেইসাথে ফেসবুকেরও জয় হোক, আমরা যেন প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদে এভাবেই শামিল হই দলমত নির্বিশেষে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 531
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    531
    Shares

লেখাটি ৮৭৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.