মানসিক কাউন্সেলিং কেন প্রয়োজন?

0

শর্বাণী দত্ত:

আমাদের দেশে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ টার্মটাই বেশ একটা বিলাসিতা। বিশেষ করে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য, যেখানে কিনা মেয়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যই এখনো অনেক জায়গায় উপেক্ষিত। মেয়েদের মনে হরমোনজনিত জটিলতার প্রভাব একটা মেডিকেল রিয়েলিটি। এটাতে আমাদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

আর এছাড়াও আরেকটা ব্যাপার হয়, যেটার নাম বিষণ্ণতা বা মানসিক অবসাদ; সবাই ডিপ্রেশন বলে জানে যেটাকে। এ ব্যাপারে কথা বলার আগে আমি একটু ঝেড়ে কাশতে চাই, স্বীকার করতে চাই যে বছর খানেক আগে অব্দিও আমি ডিপ্রেশনকে এক প্রকার আদিখ্যেতা বা ন্যাকামি মনে করতাম। এবং সম্ভবত সারাজীবনই মনে করে যেতাম, যদি না এই ভয়ানক রোগটা আস্তে আস্তে একদিন আমার ভেতর বাসা না বাঁধতো।

মেয়েদের বিষণ্ণতা দেখলেই আশেপাশের একদল লোক শেয়ালের মতো হাসে, “ইশ কী এটেনশান সিকার রে বাবা!” আমার প্রথম বিষণ্ণতার সমস্যা শুরু হয় দু বছর আগে; এরপর থেকে অবশ্য ক্রমাগত বিষণ্ণতার সঙ্গেই বসবাস করে চলেছি। উনিশ বছর বয়েসে আমি যখন প্রথম বাড়ির বাইরে গেলাম, বাড়ির বাইরে বলতে একেবারে দেশের বাইরে, এমন একটা বিষয় পড়ার জন্য যে বিষয়ে আমার আগ্রহ তো ছিলই না, বরং ভীতি ছিল। পড়া শুরু করার পর বুঝতে পারলাম আমি একেবারেই চাষাবাদের গরু, আমায় দিয়ে আর যাই হোক গরুর লড়াই হবে না।

কিন্তু ওদিকে বড় মুখ করে গেছি, চারিদিক থেকে সাংঘাতিক প্রেশার, রেজাল্টের ক্রমাগত অধঃপতন। ওদিকে আবার অন্য দেশে গিয়ে ওখানকার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়েও পদে পদে ধাক্কা খেতে হলো। এমনও অবস্থা হয়ে গেছিলো, পুরো হোস্টেলে কথা বলার মতো আমার একটা মানুষ নেই। আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। আমি ধীরে ধীরে ভেঙে গেলাম। দুটো দেশের মধ্যকার so close yet so far সংস্কৃতিগত পার্থক্য আমার সামনে দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। কয়েক দফা আমার বন্ধুবান্ধব হলো, তাদের বেশ কয়েকজন আমার সঙ্গে এমনই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করলো, আমি মানুষের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেললাম। সেসময় সর্বতোভাবে ভয়াবহ একাকিত্ব আমাকে গিলে খাচ্ছিলো।

তখন একজন বিশেষ বন্ধু, সবচেয়ে কাছের বন্ধুর কাছে আমি মানসিক আশ্রয় চাইলাম। কারণ সেসময়টা আমার এমনই অবস্থা, আমার পা যেনো একটা পাহাড়ের একদম কোণায়; কেউ ধরে না রাখলে একটু হাওয়া দিলেও যেনো উড়ে যাবো। কিছুদিন যাওয়ার পর আমার সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ মন আর তার অত্যন্ত ‘এডাল্ট’ চাওয়া পাওয়ার মধ্যে বিশাল ফারাক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি তখন আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম, দিনশেষে আমি একটা শরীরই। যত সহজ সরল অনায়াসে হৃদয় দিয়ে আমি কাওকে ভালোবাসি না কেনো, আমার ইচ্ছের ওপরে তার কামনা-বাসনাই থাকবে। আমার ইচ্ছে অনিচ্ছে, আদর্শ, নীতি বোধ এগুলোকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন কখনো কারোর বোধহয় পড়বে না। তাই নিজের কাছে নিজের সম্মানকে ওপরে রেখে আমি সরে গেলাম।

একা এতো এতো মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই সব ছেঁড়ে ছুঁড়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। যদিও আমি জানতাম এরপর হতাশা হয়তোবা আমাকে আরো কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। হলোও তাই। আমার হতাশার মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হলো। এসবের মধ্যেই হঠাৎ করেই আমার দীদা চলে গেলেন; যিনি আমার মায়ের মতো না, হয়তো মায়ের চেয়েও বেশি ছিলেন। সেসময় থেকে একটা রাতও বোধহয় আমার কাটেনি, যে রাতে আমি কেঁদে কেঁদে ঘুমোইনি। সেই বিচ্ছিরি একাকিত্ব, শূন্যতা, হারিয়ে ফেলা সময়ের মধ্যে আমি ভেসে যেতাম। রুমমেট যেনো টের না পায়, তাই মুখে কাপড় দিয়ে কাঁদতাম।

দেশে ফিরে আবার ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া শুরু হলো। আমি এর মধ্যে যখনই যাকেই আমার ডিপ্রেশনের কথা বলতাম, প্রায় সবাই বালখিল্যতা হিসেবে নিতো। কাজের মধ্যে আমার নামে যা খুশি, নোংরা আজেবাজে গল্প রটালো অনেকে। আমার বিভাগের সহপাঠীরাই আমাকে নিত্যনতুন প্রোফাইল খুলে অবিশ্বাস্য নোংরা ভাষায় মেসেজ পাঠাতে লাগলো এবং তা অত্যন্ত নিয়মিতভাবে।

ছোটবেলা থেকে পৃথিবীর অধিকাংশ মেয়ের মতো আমিও বারবার নিগৃহীত হয়েছি। পাশের বস্তির ছেলে, বন্ধু, দূরের আত্মীয়, দর্জি, রিকশাওয়ালা- কে নয়? এর মধ্যে কিছু ঘটনা যেগুলো আমি কোনোদিন ভুলতে পারিনি, বড় হওয়ার পর আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া ব্যবহার- আমি মানুষকে, বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে অবিশ্বাস করা শুরু করলাম। এতো এতো যন্ত্রণার মধ্যে আমি যখন শুধু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য হাহুতাশ করছি, আমার নিজের দেশে নিজের লোকেরাই আমাকে নিয়ে যা খুশি নোংরা আলাপ করছে, আমার লাইফস্টাইল, আমি কী খাই, কার সঙ্গে ওঠাবসা করি, কী পরি ও কী পড়ি, কী লিখি, প্রতিটি কিছু নিয়ে ওদের কুরুচিপূর্ণ উপহাস এবং সাইবার হ্যারেসমেন্ট আমাকে অসুস্থ করে তুললো। এটাই প্রগতিশীল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মজার বিষয়, আমি জানি কারা আমাকে ওসব লেখে, এবং আরো মজার বিষয় ওরাই নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে র‌্যালিতে হাঁটে, স্লোগান দেয়। ডিপ্রেশন যে কতটুকু ভয়াবহ সেকথা আপনি নিজে ডিপ্রেশনের ভেতর দিয়ে না গেলে শুধু গল্প শুনে কখনো বুঝবেন না। আমার অগণিত যন্ত্রণার জায়গা, যেগুলোতে আমার এক বিন্দু দোষ কখনো ছিল না, সবকিছু নিয়ে যখন আশেপাশে একটা মাতাল তাণ্ডব আমাকে দেখতে হয়, সেই ডিপ্রেশন নিয়ে আমাকে নিজের রুমে ফিরতে হয়।
অনেকবার এমনও হয়েছে, বাড়ি থেকে আমার বাবা-মা ফোন করে জানতে চাইছে কেমন আছি, আমি যে “ভালো” বা “ভালো নেই” বলবো, সেটুকু বলার শক্তি আমার গলায় আর নেই; আমার গলা কান্নায় বন্ধ হয়ে আসে, আমি ‘হুম হা’ করে ফোন রেখে দিই।

আমার বিষণ্ণতা নিয়েও দেখি কিছু মানুষ হেসে ফেলে, অথচ কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলে না,
“তোমার তো কোনো দোষ নেই! তুমি কেনো কাঁদবে?” আমি মানুষের প্রতি নিরন্তর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। কোনো অন্যায় না করেও, কাওকে কোনো আঘাত না দিয়েও একটা দমবন্ধ করা কারাগারে আমার জায়গা হয়ে যায়। যেখান থেকে মনে হয় কোনোদিন মুক্তি পাওয়া যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ জীবনে যা যা দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করেছি, সব একের পর এক চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হতে থাকে। আমি ভেউভেউ করে কেঁদে ফেলি।
কোনো কোনো দিন কেঁদে হাল্কা হওয়ার জন্য যে প্রাইভেসিটুকু প্রয়োজন তা পাওয়া সম্ভব হয় না, আমি মনে ভয়ে ভয়ে থাকি, হঠাৎ কান্না পেলে কোথায় গিয়ে কাঁদবো? আমি নিজেকে করুণা করি। ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার পর, আমার সেসব ‘সহপাঠীরা’ একটু সতর্ক হয়, মেসেজ আসা বন্ধ হয়। যদিও আমার এবং আরো অনেক মেয়েকে নিয়েই (যাদেরই বেঁচে থাকার একটা নিজস্ব ছন্দ আছে) নিরন্তর নোংরা গসিপ থামেনি।

এখন আমি নিজের কাউন্সেলিং করানোর ব্যবস্থা নিজেই করেছি। কারণ ডিপ্রেশনের লুপটাই এমন, একবার পড়ে গেলে শুধু গভীরেই যেতে থাকে, এরপর হয়তো একদিন আমাকে হারিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশের মেয়েগুলো বড্ড বেশি সহ্য করে বড় হয়। মাঝে মাঝে তো আমি ভাবি আমি কত ভাগ্যবান, আয়েশা, ফারিয়া বা নুসরাতের মতো অন্ততঃ রেপ হয়নি আমার, প্রবল ডিপ্রেশন নিয়ে হলেও বেঁচে তো আছি।

মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। থাকতে নেই বোধহয়। একেকবার যখন ওদের মলেস্টেশন হয়, কিংবা ধর্ষণ হতে হতে বেঁচে যায় যারা, যারা অকারণ ক্যারেকটার এসেসিনেশন নামক নোংরা পলিটিক্সের শিকার হয় তাদের পড়ার বা কাজের জায়গায়, তাদের মানসিক অবস্থা যে কী ভয়াবহ আর দুঃসহ হয়, হাইমেন পুজো করা সমাজ বোধহয় তা ভাবতেও পারে না। প্রতিনিয়ত একটা দমবন্ধ করা কষ্ট, কিছু দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতি মাথায় রেখে একটা গোটা জীবন বিষণ্ণতার সঙ্গে কাটানো মৃত্যুর চেয়ে কম নয়।

আমাদের স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে খুব একটিভ কাউন্সিলিং সেশন প্রয়োজন। মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য সত্যিই ঠিক অবহেলা বা ট্রলের বিষয় নয়। একটা মানুষ শুধু মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলেই, সারাজীবন অসংখ্য কিছু সহ্য করে, সেসব স্মৃতি বুকে চেপে রেখে একদিন বিষণ্ণতায় মরে যাবে, এটাও কি এক প্রকার দেবী উপাসনা?

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 585
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    585
    Shares

লেখাটি ১,৪৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.