বদলে যাওয়া দিনগুলো

0

তাসলিমা শাম্মী:

বিয়ের ছয় মাস পর আমার মনে হলো, আর না, অনেক হয়েছে, আমি আমার শাশুড়িকে আর সহ্য করতে পারবো না। এই সংসারে হয়তো আমি থাকবো, নয়তো আমার শাশুড়ি থাকবে। এই মহিলার সাথে এক ঘরে, এক ছাদের নিচে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি আমার স্বামী রুপমকে এসব কথা কোনমতেই বলতে পারছিলাম না।
রুপমের বাবা নাই, ছোট ভাইটা এখনো স্কুলে আর বোনটা কলেজে পড়ছে। রুপম পড়াশুনার সাথে সাথে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা আর পড়াশোনা একসাথে চালিয়ে এসেছে বেচারা। মায়ের প্রতি, ছোট ভাইবোনগুলোর প্রতি সে প্রচণ্ড দায়িত্ববান। বিয়ের মাত্র ছয়মাসের মাথায় ঠাস করে তাকে কীভাবে বলি, আমি তার মায়ের সাথে এক সংসারে থাকবো না!

তাসলিমা শাম্মী

আমার শাশুড়ির অদ্ভুত সব আচার-আচরণ আর কথাবার্তা নিয়ে নিজের বোন আর মায়ের সাথেও আলোচনা করতে পারি না আমি। কারণ রুপমকে আমি নিজের পছন্দে বিয়ে করেছি, বাবা মা’র তেমন একটা পছন্দ ছিল না রুপম। অনেক ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে, আমার জোরাজুরি আর জেদের কারণে রাজি হতে বাধ্য হয়েছেন আব্বা আম্মা। এখন যদি আমার এসব মন খারাপের কথা বলতে যাই, মা ঠিকই খোঁচা দিতে ভুলবে না। আমার ছোট বোনও ঠোঁট বাঁকিয়ে বলবে, “মাত্র ছয়মাসেই মন উঠে গেল! এতো গভীর প্রেম ছয়মাসেই শেষ”! এসব কারণে বাসায়ও কিছু শেয়ার করতে পারছি না।

দিন দিন আমার মনমেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হতে থাকে। একবার মেজাজ খারাপ হলে টানা কয়েকদিন কোন কাজে মন বসাতে পারি না। মাথাটা ধরে থাকে, ঘরে রুপমের সাথে আর স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের সাথে অকারণে মেজাজ খারাপ করি। কলিগদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে পারি না। এমনও হয়েছে, শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদে কেঁদে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করেছি।

ঘটনার শুরু আমার বিয়ের দিনই। অনুষ্ঠান সেরে কমিউনিটি সেন্টার থেকে বাসায় আসার পর, আমার শাশুড়ি আম্মা আমাকে উনার ঘরে টেনে নিয়ে নিচু গলায় বলেন, “শোন বউমা, আজ থেকে আমার ছেলেকে আর নাম ধরে ডাকতে পারবে না। তুই তোকারিও করতে পারবে না। আর আরেকটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা সবসময় মনে রাখবে, আমার সংসার আমারই থাকবে, সবসময়ই আমার কথামতো চলতে হবে”।

ব্যস, উনার এতোটুকু কথাতেই আমার মেজাজটা খিঁচে গেল প্রথমদিনই। বাসর রাতে থমথমে মুখে রুপমকে বললাম, “ওই রুপুর বাচ্চা শোন, তোর মা যে একটা রানী সরকার আগে বললি না কেন”?

শয়তানটা হে হে হাসতে হাসতে আমাকে বলে, “তুই কি ডলি জহুর? শোন, যে যেমন, তার কপালে আল্লাহ তেমনটাই মিলায়। নিজে ভালো তো জগত ভালো”।
সেই রাতেই শয়তানটারে ইচ্ছে করছিল গলা টিপে মেরে ফেলতে। জ্বলজ্বলে চোখে তার বিচ্ছিরি রকমের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে মনে ভাবছিলাম, “তুই আমাকে চিনস নাই বাপধন! ছয়মাস শুধুই দেখে যাবো, তারপর শুরু হবে আমার কর্মকাণ্ড”।

বলে রাখা ভালো, রুপম কিন্তু আমার বেস্টফ্রেন্ড। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর একটা কথা হচ্ছে, স্বামী হবার পর বেস্টফ্রেন্ডরা কিন্তু অনেকটাই প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে! তারা তখন আগের জীবনের বিভিন্ন কথা মনে করে স্বামিত্ব ফলাতে চায়। কিন্তু আমি যে কোন জঙ্গলের বাঘ সে জানে না।

বিয়ের পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে বসেছি মাত্র সবাই, আমার শাশুড়ি আম্মা আমাকে বলে, “বৌমা, তুমি কিন্তু ঘিয়ে ভাঁজা পরোটা খাইয়ো না। পাউরুটি খাও চায়ে ডুবিয়ে। নয়তো অল্পদিনেই মোটা হয়ে যাবা। মোটা হলে মেয়েদের বাচ্চা হইতে সমস্যা হয়”।

বিয়ের পরদিন সকালেই শাশুড়ির মুখ থেকে বাচ্চাকাচ্চার কথা শুনে আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। আমি দেখি, দেবর ননদ আর আমার শ্রদ্ধেয় স্বামী পরোটা মুরগির ঝোলে ডুবোতে ডুবোতে মিট মিট করে হাসছে! সবার সামনে আমি চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে নাস্তা সারলাম।

নাস্তার টেবিলেই রুপম তার মাকে বলে, “মা, মিতু খুব ভালো করলা ভাজি করে। করলা ওর খুব প্রিয় সবজি। আজ থেকে ওকে রান্না করতে দাও”।
আমি অসহায় চোখে রুপমের দিকে তাকিয়ে থাকি। করলা যে আমার দুই চোখের বিষ সে ভালো করেই জানে। এমন নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যটা কী! কিন্তু নিজেকে নিজে বলি, “না মিতু, তুমি এখন সম্মুখ যুদ্ধে নেমেছো। এতো সহজে হেরে গেলে হবে না। সময় আর মাত্র ছয় মাস! লক্ষ্যে তোমাকে পৌঁছুতেই হবে”। আমি লম্বা করে শ্বাস টেনে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলাম।

আমার শাশুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “তাই বুঝি বৌমা!! তিতা করলা তো আমারও খুব পছন্দের সবজি! তা আমার ছেলে এতো প্রশংসা করছে, তুমি কীভাবে ভাজিটা করো বলতো”?

আমিও রুপমের দিকে একবার তাকিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই শাশুড়িকে বললাম, “তেমন কিছু না মা, করলাটা নরম হয়ে আসলে গুণে গুণে চার চামচ চিনি দিতে হয়। মনে করেন এক কাপ করলা কুচি হলে চার চা চামচ চিনি দিলেই হবে”।

সাথে সাথেই আমি দেখি, রুপমের বিষম উঠেছে, ওর নাক থেকে চা বের হচ্ছে, আমার শাশুড়ি আম্মা আর ওর ছোট বোন রুনু রুপমের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। রুপমের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতেই আমার শাশুড়ি আমাকে বলে, “করলার মধ্যে চিনি! থাক থাক, তোমাকে এখনই কিছু রান্না করতে হবে না। আমার ঘর ভার্সিটির হোস্টেল না। আমি তোমাকে রান্না শিখাবো ধীরে সুস্থে”।

আমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলি, “জ্বী আম্মা”।

তারপর থেকে প্রতিদিন একটা না একটা কিছু নিয়ে শাশুড়ি আম্মার সাথে আমার ঝামেলা লেগেই আছে। কথায় কথায় উনি আমাকে খোঁচা দিয়ে আহত করতে চান, আর আমি খুব যত্ন করেই সব কয়টা খোঁচাকে হজম করতে থাকি।

আমি একটা স্কুলে জব করি। সকালে আমি আর রুপম দুজন মিলে গল্প করতে করতে নাস্তা রেডি করি। আমি রুটি বানাই, রুপম পেঁয়াজটা কাটে বা ডিমটা ভাঁজে, অথবা চায়ে দুধ চিনি মেশায় …এসব আমার শাশুড়ি একদম পছন্দ করে না।

রুপম আমাকে সংসারের টুকিটাকি কাজে সাহায্য করে, কাপড় গুছিয়ে দেয়, মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা করলে মাথা টিপে দেয়, বা কারণে অকারণে ফুল আর চকলেট হাতে করে নিয়ে আসে … এসব দেখে শাশুড়ি আম্মা যে ভীষণ রকমের বিরক্ত হয়, আমি বুঝতে পারি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উনি এসব নিয়ে আমাকে কথা শুনাতে ভুলেন না।

আমার ভীষণ রকমের মন খারাপ হতে থাকে। আমি রুপমকে কিছু বলি না, আমার পরিবার এবং বন্ধুদের সাথেও কিছু শেয়ার করি না, কিন্তু নিজে মনে মনে ভীষণ রকমের ভেঙ্গে পড়তে থাকি। একসময় এমন পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য হই, এই সংসারে আমার আর থাকা সম্ভব নয়। আমাকে বের হতে হবে এই অশান্তি থেকে। কিন্তু আবার ভাবি, আমার স্বামীর সাথে তো আমার কোন ধরনের জটিলতা নাই, একজনের জন্য অন্য জনকে কেন সাজা পেতে হবে?

এক দুপুরে আমি কী যেন একটা কাজ করছি।
আমার শাশুড়ি আমার রুমে এসে বলে, “বৌমা, তোমাকে একটা কথা বলি, কিছু মনে কইরো না” ।

– ‘না না মা, কিছু মনে করবো না। বলেন’।

— ‘আচ্ছা বৌমা, তুমি আর রুপম তো সমবয়সী”।

– জ্বি আম্মা। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম এবং আমরা বেস্টফ্রেন্ড।

— ‘আচ্ছা বৌমা, মনে করো তোমার বয়স হয়ে গেলে যদি রুপম আর তোমাকে পছন্দ না করে? না মানে, ছেলেরা তো দেরিতে বুড়ো হয়! মেয়েদের নানা কারণে তাড়াতাড়ি শরীর ভেঙ্গে পড়ে। একসময় যদি রুপম তোমাকে বলে যে, তুমি বুড়ি হয়ে গেছো! তোমাকে আর ওর ভাল লাগছে না! তখন তুমি কী করবে?

আমি হা করে আমার শাশুড়ির মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ছিলাম উনার মুখের এই কথাগুলো শোনার পরে। আমার মাথা প্রথমে রাগে ঝিম ঝিম করে উঠলো। বলে কী এই হিংসুটে বদ মহিলা! আমার মাথায় তখন আগুন ধরে গিয়েছিল।

ঠিক ওই মুহূর্তে আমি মনে মনে ভাবছিলাম এই মহিলার সাথে একঘরে, এক ছাদের নিচে, এক সংসারে থাকা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। উনি দেখি তখনও আমার উত্তরের অপেক্ষায় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি প্রাণপণে নিজের রাগটুকু চেপে রেখে শান্তভাবে হাসার চেষ্টা করলাম।

আমি হেসেই উনাকে বললাম,
– ‘মা শোনেন, সংসারটা দুইজনেরই। আমি যথেষ্ট শিক্ষিত এবং আত্মনির্ভরশীল একজন মেয়ে। আমিও জানি কীভাবে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। কীভাবে কোন রাস্তায় হাঁটতে হয়। এমন কোন সিচুয়েশন কোনদিন এলে আমি নিজেই সরে যাবো। আমি আপনার ছেলেকে ভালবাসি বলে তার সব অন্যায়ই মেনে নিতে বাধ্য নই, নিজের অপমান তো কখনোই না। বেস্টফ্রেন্ড বা স্বামী বলে সে আমার আত্মসম্মান কিনে নেয়নি’।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, আমার শাশুড়ি কাঁদছে! উনার দুইচোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে!! আমি পাশে বসে উনার দুই হাত নিজের দুইহাতের মুঠোয় নিলাম।
মায়াভরা গলায় বললাম,
“মা, আপনার মনে কি গভীর কোন দুঃখ আছে? আমার কেন জানি মনে হয়, আপনি দিনের পর দিন অবহেলা পেয়েছেন। নিজের অধিকার , নিজের চাওয়াপাওয়া গুলো ভুলে থেকেছেন। অন্যের ইচ্ছেয় বাধ্য হয়ে উঠাবসা করেছেন! অপমান আর অবহেলা সইতে না পেরে নিজে নিজে কেঁদেছেন, নিজেকে নিজে কষ্ট দিয়েছেন! আপনার মনের ভিতরে গভীর এক না পাওয়ার ক্ষত রয়ে গেছে! এখন আমার আত্মবিশ্বাস আর সাবলীল জীবন যাপন, রুপমের সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ বোঝাপড়া দেখে আপনার সেই গভীর ক্ষতটি আবারো টনটন করছে”!

আমার শাশুড়ি আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আমতা আমতা করে আমাকে বলে,
“বৌমা, তুমি কি অনেক কষ্ট পেয়েছো আমার ব্যবহারে এতোদিন? আমি কী করবো? আমার যে অনেক হিংসে হয় তোমাকে। আমার জীবনটাও তো তোমার মতো হতে পারতো! কেন যুগে যুগে একদল শুধু কষ্ট পেয়েই যাবে, আর অন্যদল সেসব কষ্টের ধারে কাছেও যাবে না! আমি তা মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু তুমি এমনভাবে আমার দেয়া সব অপমান আর অবহেলা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে দেখে ভাবলাম, এভাবে কেন আমিও একসময় করলাম না”!

শাশুড়ি আম্মা বলেই যাচ্ছিলেন, “আমি কষ্ট পেয়েছি বলেই যে তোমাকেও কষ্ট পেতে হবে, সেটা কি ঠিক বৌমা? দিন তো একসময় বদলাতেই হবে, কী বলো? আমরাই না হয় বদলে দিই। তুমি যদি আমার সময়ের বউ না হও, আমিও তো তাহলে সেই আগের শাশুড়ি না! সেই আগের কষ্ট মনে না রেখে এখন দুইজন মিলে নতুনভাবে ভালো থাকি, কী বলো বউমা”?

বোকা মেয়েটা হাসছে, আর চোখ দিয়ে তখনো টপটপ করে পানি পড়ছে।

আমি দুই হাতে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললাম, “হ্যাঁ, আজ থেকে তো দেখছি নতুন এক স্টাইলেও মানুষ হাসবে, চোখের পানি ফেলতে ফেলতে”!

না। আমি তখনই ভাবলাম, এই মানুষটাকে ছাড়া আমি এই ঘরে থাকতে পারবো না। এই মানুষটা ছাড়া আমার এই সংসার একদম অসম্পূর্ণ।

** গল্পটি একটা নাটকের জন্য লেখা, নাটকীয়তাটুকু তাই অপরিহার্য এই গল্পে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 604
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    604
    Shares

লেখাটি ৩,৩১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.