বিয়েটাই সবকিছুর সমাধান না

0

ফারজানা সিরাজ শীলা:

কোথা থেকে শুরু করবো জানি না। তবে শুরু করতে হবে, আমাকে বলতে হবে ঠিক কী কী কারণে আমার মস্তিস্ক আবেগশূন্য হয়ে গিয়েছে।

ঘটনা ১: সিঙ্গাপুরে ওয়েল সেটেল্ড পরিবার। সংসারে সদস্য মোটে তিনজন। স্বামী, স্ত্রী আর ফুটফুটে মেয়ে। দেশের সব নামকরা লোকজন নিজের পরিবার। টাকা পয়সা স্ট্যাটাস কোনকিছুতে কমতি নেই। এলিট শ্রেণির সাথে ওঠাবসা। হঠাৎ করে স্বামীটার হার্টে সমস্যা ধরা পড়লো। মেয়েকে আড়াই বছরের রেখে মারা গেলো। তবুও মেয়েটি শক্ত ছিলো, কারণ তার দেবররা আছে এবং তারাও এলিট। মেজো দেবরটি তাদের দায়িত্ব নিতে রাজী, কিন্তু তার ভাবীকে তার সাথে ওয়াইফের মতো থাকতে হবে।
মেয়েটির আর সহ্য হয়নি। সে দেশে ফিরে মায়ের মতো মনে করা শাশুড়িকে সব বললে আদতে কোন লাভ হয়নি। দোষ এবং চরিত্র যা যাবার, মেয়েটির গেলো। তাকে সামাজিকভাবে এতো হিউমিলিয়েট হতে হলো যা প্রকাশযোগ্য নয়। মেয়েকে বুকে আঁকড়ে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরতে গেলে দেখা গেলো কিছুই আর তার নয়। সব তার দেবরের। বেঁচে থাকার নতুন যুদ্ধ শুরু হলো। স্বামী দেশে ফ্ল্যাট কিনেছিলো কিছুদিন আগে, তার লোনটা এসে পড়লো তার ঘাড়ে। ছোটখাটো চাকরি শুরু করলো।মেয়ে বড় হতে থাকলো তার মতোন। এর ভেতর বিয়ের কথা আসে। কখনো রাজী হয় না, কারণ তারা মেয়ের ব্যাপারে খুব একটা কনসার্ন দেখায় না। দশ বছর পর উনার মৃত স্বামীর এক ক্লাসমেট বিয়ে নিয়ে আসে। পাত্র সে নিজে। তার বউ পালিয়ে গেছে,তার দুই ছেলে। সে মেয়েকে মানবে।
মেয়েটা ভাবলো, না এবার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। বিয়ের প্রথম কয়েকদিন পর জানা গেলো লোকটা মেয়েটার ফ্ল্যাট এবং ব্যবসার লোভে বিয়ে করেছে। তারপরও চুপচাপ থাকা হলো। বিপত্তি বাধলো যখন তার ছেলেরা ক্লাসে ফেল করলো এবং ওই নারীর মেয়েটা তৃতীয় হলো। ছোটখাটো অশান্তির এক পর্যায়ে ওই নারীর ঘরে লোকটা দা দেখিয়ে হুমকি দেয় তার মেয়েকে দেশে রেখে আসার জন্য এবং বলে, তোর মেয়ের তো ড্রাইভারের সাথে অবৈধ সম্পর্ক। ওই নারী তখন বিনা বাক্য ব্যয়ে চুপচাপ বের হয়ে আসে। দশ মাস সংসার শেষে ডিভোর্স।

ঘটনা ২: এইচএসসি প্রথম বর্ষে চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে। চাচাতো ভাইকে মেয়ের বাপ পড়িয়েছিলো ছোট থেকে। দেশের নামকরা পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলে। মেয়ের শত অমত থাকা সত্ত্বেও পরিবার তাকে বিয়ে দেয়।ছেলে তার থেকে পনেরো বছরের বড়। আলাদা সংসারে এ টু জেড সব মেয়ের বাবা দিলো। শুরু হলো দুজনের মনোমালিন্য। গায়ে হাত তোলা, ঝগড়া, সিনক্রিয়েট করা, সব হয়ে গেলো পাঁচ মাসের ভেতর। মেয়ে চলে আসলো বাবার বাসায়, এর ছয় মাসের ভেতর ডিভোর্স। পড়ালেখা শুরু করলো মেয়েটা। অনার্সে থাকতে এক ছেলের সাথে সম্পর্ক হলো। সেটা শারীরিকে রুপান্তরিত হলো। এভাবে চললো পাঁচ বছর। বিয়ের কথা বলাতেই বেঁকে বসলো ছেলেটা। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো, ছেলেটার আরেকটা রিলেশন আছে এবং সে সেখানে নাকি কমিটেড। এবং সে আরও অনেকের সাথেই টাইম পাস করতো। সে জাস্ট মেয়েটাকে তার নিড পূরণ করার জন্য রেখেছিলো, কিন্তু সে একজন ডিভোর্সিকে কখনই বিয়ে করতে পারবে না।

ঘটনা ৩: এসএসসি পরীক্ষার পর দীর্ঘদিনের প্রেমিকের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে মেয়েটা। বিয়ের পর দেখে ছেলেটা নেশাখোর।চরম মারধোর আর ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়ি। এর ভেতর এলাকারই এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়। পরিবারকে রাজী করিয়ে ছেলেটা বিয়ে করে। ঢাকায় নিয়ে যায়। এতো ভালো মানুষ হয় না। দুই বছরের ভেতর মেয়ে হয়।সংসার পরিপূর্ণ সুখে। কখনও মেয়েটাকে কোনো কষ্টই দেয়নি ছেলেটা। হঠাৎ একদিন চরম অসুস্থ হয়ে পড়ে ছেলেটা। ধরা পড়ে ক্যান্সার, তাও লাস্ট স্টেজে।
ছোট মেয়েটা তার খালার কাছে বড় হতে লাগলো, আর তার মা বাবাকে নিয়ে ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশের হাসপাতালে ছোটাছুটি করলো। হসপিটালে টানা কয়েক মাস পড়ে রইলো। নার্সরাও ওদের জুটি দেখে অবাক হয়ে যেতো। কী যত্নটাই না করতো স্বামীর! যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখন বার বার ঠোঁট এগিয়ে দিচ্ছিলো। মেয়েটা বললো, চুমু খাবে?” ছেলেটা ইশারা করলো। ঠোঁট ছুঁয়েই মারা গেলো আমার দেখা সেরা স্বামীটা।
মেয়েটা চলে আসলো বাবার বাসায়। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কোন দায়িত্বই নিলো না। মেয়েকে বুকে করে নতুন জীবন শুরু করলো। পড়াশোনা শুরু করার উদ্যোগে ব্যস্ত হলো। বছরখানেক পর মেয়েটার দুলাভাই বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসলো। ছেলে সুইজারল্যান্ডের নাগরিক, বিশাল বড়লোক। তার দুইটা মেয়ে আছে, প্রথম স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ, হসপিটালে ভর্তি। মেয়েটার বাচ্চা নিয়ে তার কোন সমস্যা নেই। বিয়ে হয়ে গেলো তড়িঘড়ি করেই। ঢাকাতে নিয়ে গেলে দেখা গেলো সে সুইজারল্যান্ডের নাগরিক না। তার প্রথম বউ ঢাকাতেই। তার মেয়েরাও ঢাকাতে। সে যা যা বলেছে সবই মিথ্যা। ইভেন সে অনেক মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে। এসবের প্রতিবাদ করায় ছেলেটা বলে, আমি মুতকে দুধ বললে তাই বিশ্বাস করতে হবে। দুই মাসের ভেতর চলে আসতে হলো আবারও সেই পুরাতন ঠিকানায়।

ঘটনা ৪: এসএসসির পর পরই মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের প্রথম রাতেই ম্যারিটাল রেপ এর কারণে যৌন জীবন এবং ভালেবাসা সম্পর্কে তার ধারণা পাল্টে যায়। চরম প্রতিকূলতার ভেতরও পড়াশোনা চালিয়ে যায়। মারধোর, গালিগালাজ সব চলতে সমানভাবে। ভোর চারটায় উঠে রাত দেড়টাতেও বিছানা জুটতো না। অনার্সে পড়ার সময় ছোটখাটো একটা চাকরি জুটিয়ে নেয়। বিয়ের তিন বছর পর প্রথম কনসিভ করে মেয়েটা। স্বামীকে জানালে এবরশন করায়। এরপর তিনবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। পাঁচবারে আর ডাক্তার রিস্ক নেয়নি, তাই তার ছেলেটা আলোর মুখ দেখে। হুটহাট নেশা করে গায়ে হাত তোলাটা ততদিনে স্বামীটির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একদিন বাচ্চাটাকে গেটের ভিতর আটকে মেয়েটাকে বের করে দিলো।মেয়েটা আর সহ্য করতে পারেনি। সরাসরি থানায় যেয়ে ছেলেকে নিয়ে আসলো নিজের কাছে। মুক্ত হয়ে সে নিজের জীবন গোছাতে শুরু করলো। অনেক দূর এগিয়েও গেলো।
এর মাঝে ফেসবুকে একজনের প্রেমে পড়ে গেলো। সে প্রবাসী। ছেলেটা নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলো যে ছয় মাসের ভেতর মেয়েটাকে আর তার বাচ্চাটাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। এর ভেতর মেয়েটা কাস্টডি কেস করতে চাইলে ছেলেটা বললো, না এসব ঝামেলার কোন দরকার নেই, এর আগেই তোমরা চলে আসবে। ফোনে মেয়েটার পরিবারের সবার উপস্থিতিতে তাদের বিয়ে হয়। মেয়েটার নিজের জগত গোটাতে থাকে, সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আস্তে আস্তে বেলা গড়ালে জানা যায় ছেলেটা আরো অনেককেই বিয়ের আশ্বাস দিয়েছে। টালবাহানায় দুই বছর গড়ালেও মেয়েটাকে নেয়নি বা সে একবারের জন্যও আসেনি।

ওপরের ঘটনাগুলোর কথা জেনে আমার একটা ধারণাই হলো যে, বিয়ে কোনকিছুর সমাধান নয়। বিশ্বাস করে বারবার ঠকতে হতে পারে। উপরের চারটা ঘটনাই সত্যি। নিজেকে ভালেবাসুন সবার আগে। সবকিছু ছাড়ার আগে একবার ভাবুন অন্তত।

শেয়ার করুন:

লেখাটি ৩,৬৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.