নারী যদি আর সন্তান জন্ম না দেয়!

0

অনামিকা রহমান:

৭ জানুয়ারি ঢাকার ডেমরায় দুটো শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে খুন করা হয়। একজনের বয়স সাড়ে চার বছর, আরেকজনের পাঁচ বছর। গত ক’দিন থেকে মাথায় তীব্রভাবে আঘাত করছে সংখ্যা দুটো- সাড়ে চার এবং পাঁচ। এ বয়সে একটি শিশুর কোনো চিন্তা থাকার কথা না, হাসবে, খেলবে আদর-যত্ন-স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হবে। অথচ নুসরাত কিংবা ফারিয়া আর কোনদিন ‘মা’ বলে ডাকবে না, বাবা-মায়ের কাছে কোনকিছু আবদার করবে না। তারও দুদিন আগেই আরেকটি দুবছরের শিশুকে ধর্ষণের পর ওপর থেকে জাস্ট ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। ওকে চকলেটের লোভ দেখানো হয়েছিল।

আমি যখন দুই, চার বা পাঁচ বছরের শিশুকে কল্পনা করি, তখন আমার চোখে ভেসে ওঠে বর্ণমালার বই, ছড়ার বই, রংপেন্সিল, খেলনা, হাসিমাখা মুখ, ছোটাছুটি, আবদার, আদর, ভালোবাসা। নুসরাত আর ফারিয়া এসকল কিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ওদেরকে লিপস্টিকের প্রলোভন দেখিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চলে। শিশু দুটো চিৎকার শুরু করলে মুখে গামছা চেপে ধরা হয়, শিশুদুটো এক পর্যায়ে মারা যায়।

কে করেছে এ কাজ? মোস্তফা এবং আজিজুল নামে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। এই বয়সের পুরুষের নুসরাত বা ফারিয়ার মতো কন্যাসন্তান থাকে। নিজের কন্যাসন্তানকে ধর্ষণের চিন্তা করতে পারে ওরা? কিংবা নিজের মা’কে? কেনো পারে না? সেটা স্রেফ নৈতিকতার প্রশ্ন। এ নৈতিকতা যদি তৈরি করে দেয়া না হতো, তাহলে এরাও রেহাই পেত না। আমার মনে হয়, যাদের ধর্ষণের ইচ্ছা থাকে, তাদের কাছে নারী শরীর মুখ্য, বয়স কোন ব্যাপার না। সেই নারী শরীর কী শিশু, কী বৃদ্ধ কিংবা কী তরুণী কিংবা ‘পিপল উইথ ডিজেবিলিটিস’।

২০১৩ থেকে ২০১৭ চার বছরে দেশে ধর্ষণ কেইস ফাইল হয়েছে ১৭২৮৯, যার মাঝে ১৩৮৬১ জন নারী এবং ৩৫২৮ জন শিশু। যারা ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে, তার আচরণকে দায়ী করে তারা শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে হয় নিশ্চুপ থাকবে, নতুবা বলবে-‘ এই ধরনের কেসে ধর্ষক আসলে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ। সাধারণত নারীই দায়ী।’ অথচ এরা জানেই না ধর্ষণ হোক আর খুন, তাকে কিছু দিয়েই জাস্টিফাই করা যায় না, পক্ষে দাঁড়ানো যায় না। যারা ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করে তারা একদিকে ভিক্টিম ব্লেমিং করে, একজন রেপিস্টের পক্ষ নেয় এবং একইসাথে নিজের সুপ্ত রেপিস্ট চেহারাটা দেখিয়ে দেয়।

ধর্ষণের কারণ হিসেবে আর্থসামাজিক অবস্থা, রাগ, ক্ষমতা, যৌন ইচ্ছা, নৈতিকতার মান, বিচারব্যবস্থা, সাইকোপ্যাথ, পৈশাচিকতা, লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন কিছু কারণকে সামনে আনা হয়। ক্ষমতা, লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাব এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, একজন নারী যিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং দেশে ধর্ষণের আইনও চলমান আছে, তবু সেই নারীটি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
এক্ষেত্রে কারণ কী? যারা ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক বা আচরণকে দায়ী করেন এ প্রশ্ন তাদের জন্য না, আদতে আমার কাছে তারাও সুপ্ত রেপিস্ট, সুযোগ বুঝে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় আছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী যেখানে ভোগ্যবস্তু (ক্ষেত্রবিশেষে ফসলের মাঠ), সম্পত্তি, অবলা, শক্তিহীন, দুর্বল, পুরুষের অর্ধেক, নির্ভরশীল এসব শব্দে আখ্যায়িত হবে, সেখানে ধর্ষণের কারণ হিসেবে মুখ্য হয়ে উঠে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা। আর যতদিন এ সমাজ থেকে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে নারী মানে স্রেফ একটি যোনির ধারক এ চিন্তা থেকে বেরিয়ে উন্নত হবে না, ততদিন নারী নির্যাতনের শিকার হবে।

যে সমাজ ব্যবস্থায় নারী অবদমিত হবার কারণে সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে অপর পক্ষ, সেখানে নারীমুক্তি আসবে নারীর জেগে ওঠার মাধ্যমে। এটা প্রধান উপায়। এর সাথে সাথে রাষ্ট্রের ঘাড়ে দায়িত্ব পড়ে নারীকে অগ্রসরের পথ তৈরি করে দেয়া, সমাজকে লিঙ্গীয় বিভাজনের মানসিকতা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্য কাজ করা, আইনকে মজবুত করা।
কোনটা করছে এ রাষ্ট্র? রাষ্ট্র স্বয়ং এখানে পিতৃতান্ত্রিক আর নারী সেখানে স্রেফ তার সম্পত্তি! নারীদের প্রতিবাদেই নারীরা মুক্তি পাবে, ধর্ষণ বন্ধ হবে, নির্যাতন বন্ধ হবে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর ভয়েজকে আজীবন ভয় পেয়ে এসেছে, আর এজন্য তাকে দমন করার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ধর্ম, যৌনতার স্টিগমা।

নারীরা আজ একবার জেগে উঠুক, একবার বলুক -‘আমরা সন্তান জন্ম বন্ধ করে দিলাম আজ থেকে। যতদিন আমার সন্তান নির্যাতন থেকে রেহাই পাবে না ততদিন আমরা একটি নির্যাতিত কিংবা একটিও নির্যাতকের জন্ম দেব না।’

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 255
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    255
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.