দেশে কি মদিনা সনদ বলবৎ হয়ে গেছে?

0

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী ও সুপ্রীতি ধর:

গত কয়েক বছর ধরেই শুনে আসছি, দেশ চলবে মদিনা সনদ অনুযায়ী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান, ‘অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ’ সংবিধান সম্বলিত একটি দেশ যদি এখন মদিনা সনদ অনুযায়ী চলে, তবে তার রূপরেখা কেমন হবে, পরিকল্পনা কী হবে, আদৌ সেখানে সংবিধানের বিধান মেনে চলা হবে কিনা, তা নিয়ে কৌতূহল তো আছেই। তবে যেটুকু উপলব্ধি হচ্ছে বিগত এক দশক বা তারও কিছু আগে থেকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তথা নারীদের অবস্থান দেখে, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক কিছু না।

এই লেখাটা যখন তৈরি করছি, তখনই হেফাজতে ইসলামের শফী হুজুরের মেয়েদের পড়ালেখা সংক্রান্ত একটি নিউজে চোখ পড়লো। তিনি বলেছেন, মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। বড়জোর ক্লাস ফোর কী ফাইভ পর্যন্ত পড়তে পারে মেয়েরা, যেন সে স্বামীর টাকার হিসাব রাখতে পারে আর স্বামীর কাছে চিঠি লিখতে পারে। বেশি পড়ালেখা করলে মেয়েরা নাকি বেহাত হয়ে যায়, তাদের নিয়ে টানাটানি হয়। নাহ, এ নিয়ে কথা বলতেও রুচিতে বাঁধে।

সত্যি বলতে কী, আঁতকেও উঠিনি। বরং বিনোদিত হয়েছি এই ভেবে যে, আজকের বাংলাদেশে এই শফী হুজুরের মতোন মানুষেরাও কথা বলার সাহস পাচ্ছে! ২০১৩ সালে শাপলা চত্বর দখল নেওয়ার সময়ও এই দাবিটা করা হয়েছিল হেফাজতের পক্ষ থেকে। বলা যায়, তাদের এই অসীম সাহসের পিছনে কেবল রাষ্ট্রীয় সিস্টেমই দায়ী নয়, আমরাও দায়ী। গত প্রায় ছয় বছরেও আমরা তেমন কোনো জোরালো প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি এই নারীবিদ্বেষী উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে। বরং খোদ সরকারই যখন তাদের মদদ দিচ্ছে, তখনও চোখ-কান বুঁজে কিছুই হয়নি, এমন ভাব করছি।

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী, সাংবাদিক

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের পত্র-পত্রিকা ঘাঁটলে বা যেকোনো সময়ের পত্রিকা দেখলেই যে আতঙ্কটা ভিড় করে মনে, তা হলো ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নারীরা নিজের ঘর, বাস, ট্রেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস,
এমনকি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাসহ ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, জায়গায় প্রায় প্রতিদিন যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী নারীদের। বলা যায় ধর্ষণ এখন জাতীয় সংকট। সেই থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কোথাও কোনো কথা বলা হচ্ছে কি? বা নারী অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও কোনো জোরালো প্রতিবাদ এসেছে কি?

আসেনি। অন্তত চোখে পড়েনি। এই তো সদ্যসমাপ্ত ‘নির্বাচন’ এর দিনই নোয়াখালীর সুবর্ণচরে যে নারীটি গণধর্ষণের শিকার হলো শুধুমাত্র ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপরাধে, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের’ প্রতিবাদ দেখেছিলাম। মুহূর্তও দেরি হয়নি প্রতিবাদে মাঠে নামতে, অথচ সেই তাদেরসহ আরও অন্যান্যদের কিন্তু খুঁজেও পাওয়া গেল না গত কয়েকদিনের বীভৎস কিছু শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়। ন্যুনতম প্রতিবাদও কি কাম্য ছিল না? নাকি প্রথম ধর্ষণের ঘটনাটির পিছনে ‘রাজনৈতিক’ উদ্দেশ্য ছিল বলে তা বহুল আলোচিত হলো? তার মানে ধর্ষণও রাজনীতি বহির্ভুত কিছু নয়!

সেই ধর্ষণ এখন পাঠ্য পুস্তকেও স্বীকৃত! অবশ্য তাইবা বলি কীভাবে! গত কয়েক বছর ধরেই যেভাবে পাঠ্যপুস্তকে সংশোধনের নামে ‘ইসলামিকরণ’ চলছে, তাতে উপরে উল্লিখিত ‘মদিনা সনদ’ বাস্তবায়নের পথে দেশের কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ারই বার্তা বহন করে বৈকি!

ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইতে উল্লেখ করা হয়েছে একজন কিশোরী কী ধরনের পোশাক পরিধান করবে!কোন ধরনের পোশাক তার জন্য ‘শালীন’ এবং নিরাপত্তামূলক, তাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সুপ্রীতি ধর, সাংবাদিক

অষ্টম শ্রেণির গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে জীবন দক্ষতা শেখানোর ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে মেয়েদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হবে বলে আমি মনে করছি। যৌন নিপীড়ন থেকে মেয়েদের বাঁচাতে কিছু আত্মরক্ষার ‘কৌশল’ শেখাতে গিয়ে তার প্রতি একধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যা মোটেও কাম্য নয়। কেননা কিছু জায়গায় ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে চরম আপত্তি আছে।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষার কৌশল হিসেবে বইয়ে বলা হয়েছে—বাড়িতে কখনোই একা না থাকা, অন্যকে আকর্ষণ করে এমন পোশাক না পরা, মন্দ স্পর্শ করলে এড়িয়ে যেতে হবে অথবা স্থান পরিত্যাগ করতে হবে, পরিচিত-অপরিচিত কারোর সঙ্গে ঘুরতে না যাওয়া।

আর বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার পাঠ দেওয়া হয়েছে। বখাটে ছেলেদের কথার প্রতিবাদ করবে না, জুতা দেখাবে না, রাগ হয়ে তাদের দিকে তাকাবে না!

ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্য বইয়েও একই চিত্র, জাতীয় শিক্ষা বোর্ড তাদের পোশাক এবং পোশাকের রং নির্ধারণ করে দিয়েছে। মূলত এসব লেখার মধ্য দিয়ে ধর্মান্ধ মৌলবাদের মতো প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককেই দায়ী করা হয়েছে।

খুব জানতে ইচ্ছে করে- দশ মাস, এক বছর, দুই/তিন/পাঁচ বছরের শিশুরা কেনো ধর্ষণের শিকার হয়, বোরখা পরিধান করেও কেনো ধর্ষণের শিকার হয়? ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কেনো রাষ্ট্রের এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি? কেন আজ পর্যন্ত একজন ধর্ষকেরও কোনোরকম দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া তো দূরে থাক, বলার মতোন তেমন শাস্তিই দেওয়া হলো না।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে যে সেক্টর অত্যন্ত নাজুক, দৈন্যদশায়, হেলাফেলায়, অবহেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে তার নাম শিক্ষাব্যবস্থা।

কথা সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক স্বপ্না রেজা দৈনিক ভোরের কাগজ এ একটি লেখায় যথার্থই বলেছেন, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও জাতীয় শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত কোনো পাঠ্যপুস্তকে কি পুরুষ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, কীভাবে তারা নারীদের শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবে কিংবা দেখা উচিত? কিংবা বলা হয়েছে যে, যৌন নিপীড়ন একটি অসভ্য, অপরাধজনিত আচরণ, একজন যৌন নিপীড়ক সমাজের নিকৃষ্ট ব্যক্তি, এ আচরণ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?

আমার জানা নেই কোথাও বলা হয়েছে কিনা। বলতেই হয়, বোধের শেকড়ে কীট মারার সার না দিয়ে, বোধকে ধ্বংস করার এই পাঁয়তারা মূলত জাতিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দেয়া। পাঠ্যপুস্তকে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে যৌন নিপীড়ক বলে একটি গোষ্ঠী, বখাটে বলে একটি গোষ্ঠী সমাজে থাকবেই, আর এটা মেনে নিয়ে নারী নিজেকে রক্ষা করে চলবে। দুঃখজনক, লজ্জাকর বিষয়।

উন্নয়ন উন্নয়ন বলে এতো যে চেঁচামেচি চলছে, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে যখন ভাসছে, তখন একজন শিশু বা কিশোরী যদি বাড়িতে একা নিরাপদে না-ই থাকতে পারে, ঘরের মধ্যেও যদি তারা নির্যাতনের শিকার হয়, যৌন লালসা থেকে আট মাস, দুবছর, পাঁচ বছরের শিশুও যখন নিষ্কৃতি পায় না, তখন জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে যা খুশি তাই লিখে দিলেই হলো?

আশা করবো, পাঠ্যপুস্তকের এই বিষয়গুলো যতো দ্রুত সম্ভব মনিটর করা হবে, সংশোধন আনা হবে, প্রয়োজনে কিছুদিন দেরিতে পাঠ্যপুস্তক পেলেও অসুবিধা হবে না শিক্ষার্থীদের। তবুও যেন তারা এসব না শিখে।

আরও একটি কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলি, আপনি যেভাবেই নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকুন না কেন, দেশকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করার ম্যান্ডেট আপনাকে দেওয়া হয়নি। আপনি নিজের স্বার্থে বা রাজনীতি বা ক্ষমতার স্বার্থে ব্যক্তি আহমেদ শফীর সাথে আঁতাত করতেই পারেন, কিন্তু তাই বলে ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, আমরাও তা মেনে নেবো।

আপনি ওই লোককে এখনই পারলে আজকে, এই মুহূর্তেই থামান। নারীর উন্নয়নে বা অগ্রযাত্রায় পেরেক আর ঠুকবেন না দয়া করে। যে মাটিতে নারী জাগরণের পথিকৃতরা জন্ম নিয়েছিলেন আজ থেকে একশো, দেড়শো বছর আগে, সেই মাটিতেই ২০১৯ সালে বসে এই বিকৃত, বুড়ো হাবড়া কী করে এই কথা বলার সাহস রাখে, তা আমাদের জানা হয়ে যায় বৈকি! ওকে থামতে বলেন।

শেয়ার করুন:
  • 108
  •  
  •  
  •  
  •  
    108
    Shares

লেখাটি ৮৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.