এ প্যাকেট অফ আনইউজড কনডম

0

প্রমা ইসরাত:

সেদিন রাতে হালকা একটু ঝিমুনি এসেছিলো। খুব বেশি না আমি ষোল’শ টাকা দিয়ে দুই পেগ রেড লেবেল খেয়েছিলাম। যদিও আমার আরো আধা বোতল স্কচ ঘরে পড়েছিলো। আমার জীবনের প্রথম মোবাইলটা ষোল’শ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। বিটিভিতে বিতর্ক করে শিল্পী সম্মানী হিসেবে আমাকে পনেরশো টাকা দিয়েছিলো, আরও একশ টাকা ঈদের সালামী থেকে পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম এক হাজার, তা থেকে একশ বেঁচে গিয়েছিলো।

সেই মোবাইল দিয়ে সবার প্রথমে কল করেছিলাম আমার বন্ধু তনয়কে। আর তনয় কিছুদিন পরেই কোন এক আড্ডায় আমার নাম্বার ছড়িয়ে দিয়েছিলো তার বন্ধু মহলে। তারা মাঝ রাতে আমাকে ফোন করে বলতো, পাঁচ টাকায় আপনার ফোন নাম্বারটা পেয়েছি, এইটা কোন জায়গা?

যাই হোক। সেদিন রাতে আকাশে চাঁদ ছিলো, এবং হেমন্তের হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া আমাকে উস্কে দিলো। আমার মনে হলো, সেক্স করা দরকার।

প্রমা ইসরাত

আমার সাথে ছিলো আমার বান্ধবী রাই এবং জোনাকী। রাই এবং জোনাকীকে বললাম, কিছুদিন আগে এক লোকের সাথে আমার একটা ইন্টু মিন্টু হয়েছে, আমার ইচ্ছে করছে আজকে আমি তার কাছে যাবো। রাই এবং জোনাকী আমাকে বললো, অভিনন্দন।

তারও বেশ কিছুদিন আগে, আমি প্রেমে চরম একটা ধরা খেয়েছি। যে লেখকের সাথে আমার প্রেম ছিলো, সে আমাকে বলেনি তার আরও দুই, তিন কিংবা একাধিক প্রেমিকার কথা। আমি তার জীবনে একমাত্র নই, এই ব্যাপারটা আমাকে দুঃখ দিয়েছে। তারপর দুঃখ দিয়েছে তার স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া দেখে। সে হুট করেই এমন একটা ভাব ধরলো যেন তার আলজেইমার হয়েছে। লেখকরা একটু ওরম হয় বলে, আমি ভেবে ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, এবং আমার বাবার কথা মনে হচ্ছিলো।

আমার বাবা বলেছিলো, লেখকদের প্রেমে না পড়তে। এবং আমার মা বলেছিলো কবিদের প্রেমে না পড়তে এবং আমার দাদী বলেছিলেন, আমি যেন কোন ছেলেরই প্রেমে না পড়ি। । তেমনিভাবে আমার ফুপু,খালা, পাশের বাসার ভাবী, সেই ভাবীর বাড়ির কাজের মেয়ে, আমার স্কুলের কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীরা আমাকে মানা করেছিলো, আমি যেন যথাক্রমে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, উকিল, পুলিশ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির, এবং অবশ্যই ছাত্র ইউনিয়নের কোন ছেলের প্রেমে না পড়ি। আমাদের এখানে আওয়ামী লীগ মানুষ সহ্য করে, বিএনপিও সহ্য করে, কিন্তু বামপন্থী সহ্য করে না। বামপন্থী দলগুলো সম্পর্কে লোকের মানসিকতা বোঝাতে একবার আমাদের ক্লাসের দোলন বলেছিলো, বুঝলি ঝিনুক, বামপন্থীরা হচ্ছে সেই প্রেমিকা, যাদের সাথে চুটিয়ে প্রেম করা যায়, বিছানায় নেয়া যায়, কিন্তু ঘরের বউ করা যায় না।

আমার দূরের এক আত্মীয়া, যার নাম সুইটি খালা, তিনি জিন্সের প্যান্ট পরতেন, সিগারেট খেতেন এবং বলতেন, সকল পুরুষ থেকে দূরে থাকতে হবে, পুরুষ মানুষ মানেই ইতরের জাত। তিনি বলতেন, মেয়েদের পুরুষদের দেখিয়ে দিতে হবে যে মেয়েরা পুরুষ ছাড়া চলতে পারে। আমার সুইটি খালার কথা মাথায় ঢুকতো না। সুইটি খালার একা একা চলাফেরা, নিজের কাজ নিজে করা, সবকিছু আমার ঠিক মনে হলেও, আমার পুরুষের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ ছিলো। আমার কাছে মনে হতো, সেক্স করার জন্য অবশ্যই আমার পুরুষ দরকার।

নারী পুরুষের আদি রসাত্মক কিংবা বিছানার রাজনীতি আমাকে ভাবায়। তবে আমার খুব বেশি ভাবতে ভালো লাগে না। আমি আদি রসাত্মক রাজনীতি ভাবতে ভাবতে, পুরুষ নিয়ে ভাবি। দুই পেগ খাওয়ার পর আমার সকল পুরুষ ভালো লাগে। আমার কাছে মনে হয় পুরুষ মানুষ খুব অসহায়, এবং মায়াধারী। তারা এতো অসহায় হয়েও তাদের ভাব ধরতে হয়, অভিনয় করতে হয় যে তারা শৌর্যে, বীর্যে নারীর চাইতে, শিশুর চাইতে সকল প্রাণীর চাইতে উন্নত। তারা সবাইকে উদ্ধার করে, রক্ষা করে, কারণ রক্ষা কর্তা হওয়া, ত্রাণ কর্তা হওয়া সর্বোপরি কর্তা হওয়াটা একটা শর্ত হিসেবে তার উপরে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

রাই এবং জোনাকী আমাকে বললো, ঝিনুক, আসো তোমাকে এক প্যাকেট কনডম কিনে দেই। কনডম শব্দটা নিয়ে আমাদের খুব ট্যাবু কাজ করে। আমারও ট্যাবু কাজ করলো, আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। আমার লেখক প্রেমিক আমাদের সময়গুলোতে এক বক্স কনডম কিনে রেখে দিয়েছিলো তার বাসায়। সবগুলো প্যাকেট শেষ করা হয় নাই। সেই ইনটেক কনডমের প্যাকেটগুলোর কথা মনে করে মায়া লাগলো। তার উচিৎ ছিলো, আমাদের ব্রেক আপ এর দিন সেই বাকি প্যাকেটগুলো আমাকে দিয়ে দেয়া। সেই প্যাকেটগুলো সে অন্য জায়গায় ব্যবহার করছে ভেবেও আমার খারাপ লাগলো। রাই এবং জোনাকী আমাকে নিয়ে ফার্মেসির দোকান খুঁজতে শুরু করলো।।

রাই এর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো সিনেমা দেখতে গিয়ে, আমি সিনেপ্লেক্স থেকে বেড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কারণ যে বন্ধুর সাথে আমি এসেছিলাম সে আমাকে রেখে তার অন্য বন্ধুদের সাথে গাঁজা খেতে চলে গিয়েছিলো। আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, কারণ সেটা রাতের শেষ শো ছিলো, যাদের গাড়ি ছিলো তারা গাড়ি নিয়ে তামিল হিরোর মতো একটা ভাব নিয়ে চলে যাচ্ছিল। হয়ত তারা স্বাভাবিক ভাবেই যাচ্ছিলো, কারণ তারা রোজ গাড়ি চড়ে, কিন্তু আমার সেদিন মনে হয়েছিলো তারা তামিল হিরোর ভাব নিচ্ছে।

পেছন থেকে একটা শার্ট প্যান্ট পরা ছোট চুলের মেয়ে যাকে হুট করে দেখলে ছেলে মনে হয়, সে রাই। ফস করে একটা সিগারেট ধরালো। ধরিয়ে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমি বললাম হ্যাঁ কিছুটা পাচ্ছি। মেইন রোডটা এখনো বেশ দূর তো, তাছাড়া এই এলাকা টা নির্জন। রাই আমাকে বললো, দেখুন ভয় পাবেন না। আমাদের ভেতরের ভয়ই আমাদের কাবু করে ফেলে, যে আপনাকে টার্গেট করে তার কাজ অর্ধেক হয়ে যায়। রাই কে দেখে আমার ভালো লেগে গেল সেদিন। কিন্তু আমি রাইকে বললাম, আপনার কি মনে হয় না, কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সাবধানতা না থাকার জন্যই সমস্যাগুলো তৈরি হয়? রাই বললো, হ্যাঁ সেই রকম ঝুঁকি তো সব ক্ষেত্রেই থাকবে। সেটা তো সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সেই জন্য কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলে, এবং যেটা আপনার সাথে ঘটেছে, আপনি দায়ী না। যখনই আপনি সেই দায় নিয়ে পথে নামছেন, আপনি ভয়ে ভীত হয়ে আছেন, এবং যারা সেই অঘটন ঘটানোর জন্য বসে আছে, তারা দুর্বল ভেবে আপনাকেই টার্গেট করছে। রাই এর কথাগুলো আমি সেদিন মেনে নিতে পারিনি। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো ব্যাপারটা এতো সহজ না।

এর দুই দিন পর আমার রাই এর সাথে একটা ফটো এক্সিবিশনে দেখা হলো, সাথে সেদিন ছিলো জোনাকী। আমরা আড্ডা দিলাম, একটা সিগারেট তিনজন মিলে ভাগ করে খেলাম এবং এক সাথে রাতের নির্জন রাস্তায় হাঁটলাম। আমার কাছে মনে হলো, বন্ধু হিসেবে নির্ভরতার জায়গা হিসেবে, অন্য যে কোনো পুরুষের চাইতে আমি রাই এবং জোনাকীর সঙ্গ চাই। সঙ্গ চাই, সঙ্গ পেতে ভালোবাসি এবং সেটা দুই পেগ না খেয়ে।

একটা ইউটিউব ভিডিওতে একটা মেয়ে সিকিউরিটি নিয়ে বলছিলো। আমার অবশ্য অবসরে ইউটিউব ভিডিও দেখতে ভালো লাগে। সেই মেয়েটি একা একা বেড়িয়ে যেতো নানা দেশ ঘুরতে। মাঝে মাঝে তার বন্ধু থাকতো। আমার খুব ইচ্ছা করে নিজের মতো যে দিকে দুচোখ যায় চলে যেতে, নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে, কিন্তু আমি ভাবি, এটা হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব না। রেইপ হওয়ার ভয় যেখানে আমি বাড়িতে বসে পাই, বাইরে পাই, অফিসে পাই, বাজারে পাই, সেখানে আমি একা একা ঘুরে বেড়াবো কী করে!

সেই মেয়েটি বলছিলো কনডমের কথা। যে তুমি জানো না তোমার জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে, যে ধর্ষণ করতে আসছে তার অনেক রোগ থাকতে পারে, তোমার প্রেগনেন্ট হওয়ার চান্স থাকতে পারে, অন্তত সেটা থেকে এই কনডম তোমাকে রক্ষা করতে পারে। আমার অবশ্য হাসি পেলো সেই কথা শুনে। কারণ আমার কাছে কনডম আছে এই খবর যদি পুলিশ জানে, তাহলে তো ধরেই নিবে আমি সেক্স এর জন্য তৈরি হয়েই বের হয়েছি। এই ইউটিউব এ ভিডিও আপলোড করা মেয়েটা কী করে জানবে যে, কনডম ব্যাগে রাখা মানে যে সেক্সের জন্য সম্মতি দেয়া না, এটা আমাদের এখানের কেউ বুঝবে না। কারণ তারা সম্মতি বলতে বোঝে হাসি দেয়া, কিংবা নীরবতা। এই জন্যই তো এখানে প্রবাদ তৈরি হয়, হাসি তো ফাঁসি, কিংবা নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ।

যে ছোট মেয়েটা দুই বছরের, যাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে তিন তলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিলো, সেই মেয়েটার হাতে চকলেট, খেলনা এগুলো থাকার কথা, তবে কি তারাও তাদের সাথে রাখবে এক প্যাকেট কনডম? কিংবা সেই নারী, যিনি ভোট দিতে চেয়েছিলেন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে, তারও কি সেই ভোটার আইডি কার্ডের পাশাপাশি রাখার দরকার ছিলো কিছু কনডম?

রাই এবং জোনাকী আমাকে কনডমের প্যাকেট কিনে দেয়। নীল রঙ এর সেই প্যাকেট নিয়ে আমি সেই ভদ্রলোকের কাছে যাই। তার সাথে আজ আমার দ্বিতীয় দিন। প্রথম দিনও আমি দুই পেগ খেয়ে এসেছিলাম, আর সেদিন রাতে খুব ঠাণ্ডাও লাগছিলো। আমি তাকে চুমু খেলাম, এবং তাকে জড়িয়ে ধরে আগের দিনের মতোই উষ্ণ হতে চাইলাম। ভদ্রলোক বললেন, আমি আজকে এটা করতে পারবো না। আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা খারাপ হবে, আমার ইচ্ছে হচ্ছে না।

আমার প্রচণ্ড রাগ হলো। আমি বললাম, এই কথাটা আপনি আগে বললেই পারতেন আমাকে। ডাকলেন কেন? তিনি বললেন, আমি আসলে তখন চাইছিলাম, আমি আসলে চাই, কিন্তু কিছু সমস্যা আছে, এবং এখন মনে হচ্ছে, এটা করাটা ঠিক হবে না। আমার মেজাজ খারাপ হলো, আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কনডমের প্যাকেটটা আবার আমার ব্যাগে ভরলাম। আমার খুব মন খারাপ হলো।
কিন্তু আমার কাছে মনে হলো না, আমি তাকে সেক্স এর জন্য আকুতি জানাই, কিংবা তখন চেয়েছিলাম, এখন চাইনা বলে আমাকে ফিরিয়ে দেয়ার ন্যাকামির জন্য তাকে দুটো গালি দেই, বা একটা থাপ্পর মারি, আমার এও মনে হলো না যে আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে দেখে আমার দাম কমে যাচ্ছে, আমার এও মনে হলো না যে আমি হয়ত সুন্দর না, এবং আমার কাছে এও মনে হলো না, কনডমের প্যাকেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরও সে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে না, কারণ সে পুরুষ মানুষ নয়।

আমার কাছে মনে হলো, সেক্সের জন্য আজ এই মুহূর্তে তার সম্মতি নেই। তার হয়তো এই জন্য সম্মতি নেই, কারণ দেশে খোলা মাঠে ঘোমটা দিয়ে হাগতে বসার মতো একটা নির্বাচন দেখে তার মন খারাপ। তার হয়তো এই জন্য সম্মতি নেই, কারণ মন্ত্রীদের রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম দেখে তার মেজাজ খারাপ, এবং নতুন মন্ত্রীদের কারো সাথে তার সেলফি নেই। কিংবা তার সম্মতি নেই, কারণ তার পেট খারাপ এবং সেক্স করতে গিয়ে অন্য একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়ে যেতে পারে, তার হয়তো সম্মতি নেই, কারণ তার বউ, প্রাক্তন-বর্তমান প্রেমিকা, কারও কথা তার মনে পড়েছে, কিংবা তাদের কারও সাথে সে কিছুক্ষণ আগেই হয়তো সেক্স করে এসেছে, তার সম্মতি না থাকার পিছনে হয়তো পুঁজিবাদ, মৌলবাদ, নারীবাদ, ভারত পাকিস্তান, রাশিয়া আমেরিকা কিংবা মিয়ানমারের ষড়যন্ত্র আছে। যত কিছুই হোক, সত্য হচ্ছে, তার সম্মতি নেই।

আমি কনডমের প্যাকেট নিয়ে ফেরত চলে আসলাম, রাই জোনাকী এবং আমাদের বন্ধুত্বের উদ্দেশ্যে টোস্ট করে আরও তিন পেগ খেয়ে আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 447
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    447
    Shares

লেখাটি ৪,৪৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.