নারী শরীর প্রতিশোধের কোন জমিন নয়

0

মুশফিকা লাইজু:

পৃথিবীর সভ্যতার ক্রমধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, গৃহ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে, ব্যক্তি থেকে সামগ্রিক স্বার্থে, ভালবাসা থেকে ক্রোধে, প্রাপ্তি থেকে অপ্রাপ্তিতে- সবক্ষেত্রে পুরুষের সবশেষ আক্রোশের শীর্ষবিন্দু হয় নারীর শরীর। যেন একটি প্রাণের নির্দিষ্ট অতিক্ষুদ্র একটি অঙ্গকে ছিন্নভিন্ন করে দিলে জয়ী হয়ে যাবে, তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যত জিঘাংসা- পাপ-তাপাকাংঙ্খা।

ভাবখানা যেন দেখো, সমর কৌশলে হেরেছি তো কী হয়েছে, জ্ঞানে পারিনি তো কী হয়েছে, প্রজ্ঞায় উত্তীর্ণ নই তো বয়েই গেছে; ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি তো জঠরের রাস্তা। শক্তিমানদের সাথে পারিনি, কিন্তু দুর্বলের কাছে তো বলপ্রয়োগ করেছি। যেখানে আঘাত করলে ঐ নিকশ কালো সুবর্ণ গহ্বর থেকে কোন বত্রিশ দন্তবিশিষ্ট দৈত্যদানো বের হয়ে কোন হায়েনাকে প্রতিহত করে না।

মুশফিকা লাইজু

ভাবছিলাম সুবর্ণচরের নির্বাচন পরবতী ধর্ষণ ঘটনাটি নিয়ে। একদল বিপুল ভোটে জিতে গেল তো পাতিনেতাদের মনে হলো, মাস্তি করতে হবে। নিজেদের ঘরে হয়তো সকলেরই বউদাসী আছে, তাতে কী! কথা না শোনার জন্য প্রতিশোধ নেয়ার পাশাপাশি রুচি বদলানো দরকার। আর ফ্রিতে কিছু পৈশাচিক আনন্দ করা। এতে কোনো দ্বিমত নেই, যে এই পুরুষালী-পৈশাচিক আনন্দের উপকরণ হিসেবে অবশ্যই নারী-মাংসের চেয়ে উপাদেয় কিছু হতে পারে না। ওই যে বলে না, গো মাংস বা শুকরের মাংসের ধর্ম আছে, সবাই তা খায় না, কিন্তু নারী মাংসের কোনো ধর্ম নেই, জাত-বিচার নেই।

আর রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধী কেউ এই আক্রোশের শিকার হলে তো কথাই নেই। নিজেকে তো বোঝানো যাবে, এটা তেমন কোন ব্যাপার নয়, অন্যায় তো নয়ই, বরং জায়েজ একটা কাজ। রাজনৈতিক বিরোধীরা তো যুদ্ধে হেরে যাওয়া ‘গণিমতের মাল’। যে কোন রাজনৈতিক সমরে পরাজিতদের স্ত্রী-কন্যা-মাতা-ভগ্নিদের ভোগ করা বিজয়ীদের অধিকার। সামাজিক ছাড়পত্র তো আছেই। এই নিষ্ঠুর অত্যাচারের কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বারবার-পুনর্বার।

জাতীয়তাবাদী দল, আওয়ামী লীগ পন্থীদের; আবার আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী পন্থীদের। কিংবা এই শক্তিশালী দুইপক্ষ মিলে তৃতীয় কোন পরাজিত পক্ষের নারীদের উপর বল প্রয়োগ এবং বলাৎকার করা যেন নিয়তির এক অনিবার্য উপসংহার। এমনটা যেন ঘটারই কথা। দুই পক্ষেরই বাক-বিতণ্ডা ভয়াবহ, মার মার কাট কাট, চরম গরম। অত:পর যা কিছু ক্ষতি, যা কিছু হারানোর তা ঐ ভুক্তভোগী নারীই হারায়। সমাজ, দেশ, আইন যতো ক্ষতিপূরণ করুক না কেন! কোন কিছুর বিনিময়ে তার এই ক্ষতি পূরণ হবার নয়, হয়ও না।

মূলত: ধর্ষকের কোন রাজনৈতিক দল নেই। প্রয়োজন হয় না তার কোন ধর্মীয় বেড়ি-ও। কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ড না হলেও চলে। এরা একশ্রেণীর শিশ্ন যাতনাকাতর ইতর পুরুষ প্রাণী। তাই দলে টানা বা দল থেকে বহিস্কার বা তিরস্কার করা কোন সামাধান নয়। মোদ্দাকথা, ধষর্কদের পরিচয় শুধুমাত্র ধর্ষক। এর আর কোন আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। সে আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে দলেরই হোক না কেন।

তবে আশ্চর্য এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নারীর যোনীরও কোন ধর্ম নেই, নেই কোন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ও। আছে অসম্মান, ঘৃণা আর প্রতিহিংসা বহনের ইতিহাস। পুরুষের সাথে পুরুষের প্রতিযোগিতা, ক্রোধ, হিংসা, নৃশংসতা, প্রকাশ্যে বলি হওয়ার ইতিহাস, আর এই প্রতিহিংসাপরায়ণ ধর্ষণের ইতিহাস প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর। ধর্মীয় যুদ্ধ, রাজনৈতিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, দ্বি-জাতিতত্ত্ব, ভাষা ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ- পৃথিবীতে যে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হোক না কেন, তার শেষ এবং উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যটি হলো নারীর যোনীদেশ। আর যা কিছুই ধ্বংস হোক না কেন বা সমাধান যেভাবেই আসুক না কেন, নারীর যোনীর প্রতি পুরুষের আঘাত অনিবার্য। জয়ের আনন্দে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নারীর যোনীর প্রতি নৃশংসতা তাদের আরাধ্য।

এই বোকাদের পৃথিবীতে অন্য কিছু না হয় বাদই দিলাম, সাবানেরও হালাল-হারাম আছে। কিন্তু নারীর যোনীর কোন হালাল-হারাম নেই! নিজের ধর্মপত্নির সাথেও সহবাসের জন্য ধর্মীয় রীতিনীতি আছে! পরাজিতদের নারীদের দখল বা ধর্ষণের কোন রীতিনীতি নাই। নেই কোন বিবেচনাবোধও। যতদূর জানি, পৃথিবীর কোন যুদ্ধনীতিতে নারী ধর্ষণ নিষিদ্ধ- এমন কোন নীতি বা রীতি সংযোজিত হয়নি। তাই প্রতিশোধ নেবে তো নারীর যোনীকে বিধ্বস্ত করে দাও। পরাজিত হয়েছে তো নারীকে দলিত করে আরো বেদনায় মূহ্যমান করে দাও। যুদ্ধক্লান্ত তো নিয়ে আসো প্রতিপক্ষের নারীকে, ভোগ আর আনন্দ করার জন্য। মোট কথা, সবকিছুর উপকরণ হলো ঐ নারীর যোনী।

আমাদের চেতনা ভোঁতা হয়ে গেছে। আজকাল আর কোন ধর্ষণের সংবাদে আমরা অস্থির হয়ে যাই না। প্রথমে ভাবি, নারীটি বেঁচে আছে তো! সঠিক চিকিৎসা পাবে তো! এরপর মেয়েটার কীভাবে আবার শুরু করবে তার জীবনযাপন! তাকে নিয়ে কাগজওয়ালারা, প্রশাসনের মোড়লরা প্রহসনের বিচারকেরা কী কী ব্যবসা করবে। এসবের পরে ঐ নির্যাতিতা নারীকে ভুলে যেতে আমাদের আধা সভ্য সমাজের কতদিন সময় লাগবে!

কোন পরাজিত পুরুষের প্রিয় নারীকে ধর্ষণ করে তাকে যতটাই ভূলুন্ঠিত করা হোক না কেন, মোটা দাগে শেষ লাইন হলো, তাতে পুরুষের পৃথিবীর কিছু যায় আসে না। কারণ ধর্ষিতা নারীকে ত্যাগ করার অধিকার সমাজ তাকে দিয়েছে, ধর্মও দিয়েছে। আগেরদিনে যে কোন ধর্মযুদ্ধ, আমাদের ৭১ এবং পৃথিবীতে এখন যতো রাজনৈতিক যুদ্ধ চলমান তার প্রত্যেকটিতে প্রতিহিংসার আগুনে নারীই তার সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে পরে সমাজ-পরিবার পরিত্যক্তা হয়ে জীবনাবসান করেছে।

তাই ভাবি, মানুষ কবে সত্যিকারের মানবিক হয়ে উঠবে, পৃথিবীর সভ্যতার সাথে আর কবে যুক্ত হবে একটি মানবিক অনুষঙ্গ! যে নারীর শরীর কোন প্রতিশোধের ভূমি নয়!

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন:
  • 526
  •  
  •  
  •  
  •  
    526
    Shares

লেখাটি ১,২৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.