ধর্ষণের শিকার নারী ও একজোড়া পা এর ছবি

শাহরিয়া খান দিনা:

নারীর জরায়ুতেই জন্ম নেয় সব মানুষ। সেই মানুষের মধ্যে কিছু মানুষরুপী অমানুষ হয় ধর্ষক। এইদেশে যত পুরুষ ধর্ষক, তার চাইতে বেশি পুরুষকে দেখা যায় ধর্ষকের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টায়, ইনিয়ে বিনিয়ে ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে ধর্ষণকে জায়েজ প্রমাণের প্রাণান্তকর হাস্যকর প্রচেষ্টারত। সমাজে মন্দ চরিত্রের মানুষ সমাজের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, তার চাইতে যারা সেই মন্দ কাজগুলিকে যুক্তির মারপ্যাঁচে বৈধ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, তারা বেশি ক্ষতিকর।

মূল বিষয়ে আসি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ভোট দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুবর্ণগ্রামে চার সন্তানের এক জননীকে ক্ষমতাসীন দলের ১০/১২ কর্মী মিলে গণধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। মধ্যরাতের পর ১০ থেকে ১২ জন লোক হাতে লাঠিসোটা নিয়ে তার বাড়িতে ঢুকে। তারপর তারা স্বামী ও চার সন্তানকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। “এরপর তারা আমাকে বাইরে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে,” তীব্র ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে বলেন ওই নারী। ধর্ষকদের চিনে ফেলায় জবাই করতে চায় তাকে। সেই নারীর জীবনভিক্ষা চাওয়ার আকুতিতে ফেলে রেখে যায় জীবিত তাকে।

একটু পেছনে ফিরে বলি, পূর্ণিমা রানী শীল। স্কুলে পড়া ছোটো মেয়েটা, ২০০১ সালে যাকে বিএনপি-জামাত জোটের কর্মীরা মায়ের সামনে রাতভর গণধর্ষণ করেছিলো। মালাউনের বাচ্চারা সব নৌকায় ছাপ মেরেছে, তাই সবক শেখানোর জন্য ১০/১২ জন একসাথে পূর্ণিমাদের বাড়ি এসেছিলো। এতো মানুষ দেখে পূর্নিমার অসহায় মা মিনতি করে বলছিলো “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট, তোমরা একজন একজন করে এসো। এতোজন একসাথে আসলে আমার মেয়েটা মরে যাবে।”

বিএনপি জোট সরকারের সময় সেই পূর্ণিমার বাবার করা মামলা নিয়ে পুলিশ টালবাহানা শুরু করেছিল। ফলে ২০০১ সালেরই ২৪ অক্টোবর পূর্ণিমা রানী শীল ১৬ জনকে আসামি করে সিরাজগঞ্জ জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে আবারও মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ ২০০২ সালের ৯ মে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের করে। পরে আদালত ওই অভিযোগপত্র আমলে না নিয়ে আবারও চার্জশীট দেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর অনেক জল গড়িয়ে যায়।

দীর্ঘ ১০ বছর পর শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ২০১০ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্যাতনের শিকার দেশব্যাপী বহুল আলোচিত পূর্ণিমা রানী ধর্ষণ মামলার রায় হয়। সিরাজগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ওসমান হায়দার এই মামলার রায় প্রদান করেন।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের জননীকে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়দানকারী রুহুল আমিনের নির্দেশে তার দশ বারো জন সঙ্গী-সাথী ধর্ষণ করেছে। নির্যাতিত নারী নিজেই অভিযোগ করেছেন। অথচ মামলা থেকে কৌশলে বাদ গিয়েছে মূল অভিযুক্ত রুহুল আমিনের নাম। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট থেকে ৩ লাখেরও বেশি(ইংরেজি ৮৯ হাজার,বাংলা ২ লাখ ১১ হাজার) শেয়ার হয়েছে। যা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তারপর কোনো কোনো ‘গণমাধ্যম’ সংবাদটি আংশিক প্রকাশ করেছে। তিনজন আসামী গ্রেপ্তার হয়েছে। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে কিছু মুখস্ত কথা ‘অপরাধী যেই হোক, পার পাবে না’ ‘মামলা না হলেও তাকে ধরা হোক’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে পুলিশ ভাইরাও আশ্বস্ত করে বলছে, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে, চমকের নাকি অনেক কিছুই বাকি আছে!

তাহলে কী দাঁড়ালো! অপরাধের ধরন তো একই রকম!
সুবর্ণচরের ওই নারীর সাথে পূর্ণিমা, ছবি ও মহিমাদের কোনো ফারাক নেই। কারণ তারা নারী। দুই দলের ধর্ষকদের মধ্যেও ফারাক নেই। তারা সবাই ধর্ষক। পূর্ণিমাকে নিয়ে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যের পর মন্ত্রীর এপিএস হিসাবে চাকরি দেওয়া হয়েছে এই ভেবে যে ‘মেয়েটির প্রতি অনেক দায়িত্ব পালন করা হলো’, এই নারীও হয়তো তেমন কিছুই পাবেন ভবিষ্যতে। রাজনৈতিক ধর্ষণের ফলাফল একই তো হয়!

দুঃখকষ্ট, জড়াখড়া, অভাব-অনটনে প্রকৃতিগত কারণেই হয়তো নারীরা বরাবরই সহিষ্ণু। যুদ্ধ-বিগ্রহ সহিংসতা প্রতিশোধে নারীর জরায়ুই হয় লক্ষ্যবস্তু। নারীর সম্ভ্রম সম্মান জরায়ুতে ধরে নিয়েই চলে নির্যাতন। যুগে যুগে পৌরুষত্ব দেখাতে গিয়ে এক শ্রেণীর মস্তিষ্ক বিকৃত নোংরা কীট এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করে থাকে। অথচ ক্ষেত্রবিশেষে উল্টো নির্যাতিতা নারীটাই যেন হয়ে যায় অপরাধী।

আইনের শাসনের যথাযথ বাস্তবায়নই পারে এই ধরনের অপরাধের লাগাম টানতে। ধর্ষকের দল-মত কিছুই বিবেচ্য নয়, সে ধর্ষক, জঘন্য অপরাধী, এটাই তার একমাত্র পরিচয় এবং তার প্রাপ্য যথাযথ শাস্তিই একমাত্র কাম্য। তেমনি নারীর অসম্মানে তার সামাজিক স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে নয়, মানবিকতা থেকেই সোচ্চার হোক প্রতিবাদের প্রতিটি কন্ঠ।

ধর্ষণের শিকার নারীর পা’ জোড়ার ছবি ঘুরছে সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে। রক্তাক্ত পা’দুখানি যেন হৃদয়ে রক্তক্ষরণেরই প্রতিচ্ছবি। সমস্ত প্রতিশোধের টার্গেট যখন হয় নারী শরীর, প্রতিরোধের শক্তি নেই ভেবে চড়াও হওয়া নৈতিক দুর্বল অক্ষমেরা একবার ভেবে দেখুক এই নারী শরীরের মধ্যে রেখেই জন্ম দেয় তাদের মতো তথাকথিত সক্ষম পুরুষদের। গর্ভে একটা ধর্ষককে নিজের রক্ত মাংস দিয়ে বড় করছে জানতে পারলে নিশ্চয়ই কোন নারী সেই সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতেন না।

চলতে চলতে অনেকটা পথ চলে এসেছে আজকের পৃথিবী। বলতে বলতে অনেক কথাই বলা হয়েছে এতোদিনে, তবু বিলুপ্ত হয়নি নারীর প্রতি ধর্ষণের মতো জঘন্য সহিংসতার। সবশেষ সবিনয়ে প্রার্থনা –
প্রভু, ধর্ষকদের নারীগর্ভে জন্ম দিও না, নয়তো জগতের সমস্ত প্রতিশোধ সহ্য করার মতো জরায়ু দিও।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.