পাপের পুরাণ

0

ফারজানা শারমীন সুরভি:

শহরটি বাড়ছে। প্রতিদিন। একটু একটু করে খেয়ে ফেলছে লাগোয়া বনটিকে। বাঘ-ভাল্লুক ঠাঁই নিয়েছে রূপকথার বইয়ে। পাখিগুলো ভীত চোখে দেখে, শহরটির থাবায় বিষাক্ত নখ। গাছগুলো বিষণ্ণ চোখে দেখে, শহরটির হাঁ মুখে লকলকে জিহবা। এই শহর কখনো ঘুমায় না। ‘যার আছে দণ্ড, সেই এখানে ক্ষমতাবান প্রচণ্ড’-একটি বাচ্চা ছেলে সুর করে বলে। এখানে শুধু রাজা আছে। মানুষ রাজা! রাজার বিশাল দণ্ড আছে। যখন তখন দণ্ডখানা পুলকিত হয়। দণ্ডদের সুখের জন্য মোটা মোটা বই লেখা হয়েছে অনেক। লোকে ওগুলোকে ধর্মগ্রন্থ বলে। কোনো নারী এখানে রাণী হতে পারে না। রাণীর গদিতে বসে তুলো ভরা নরম-সরম পুতুল। পুতুলগুলো ভারী মজার! রাজার হাতে সুতো থাকে। সুতোর টানে দুলে পুতুলগুলোর মোহিনী নিতম্ব । রাজার হাতে বেত থাকে। বেতের ভয়ে পুতুলগুলো হয় তোতা পাখি ।

নাগরিকরা জানে, বনে থাকে বৃক্ষ। বৃক্ষের বুক চিরে বিক্রি করা যায় বিনা বাধায়। দণ্ডধারীদের মনে বড় আনন্দ! কুড়াল দিয়ে ওরা কোপ দেয় গাছেদের শরীরে। আর ফুরফুরে মনে গান গায়, “আমরা সবাই মালিক, আমাদের এই দন্ড নগরে”। শহরটি বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে বনের সবুজ নেই প্রায়। কিন্তু তাতে কার কী আসে যায়?

আর পাঁচটি গাছ বাকি। একটি কাঠগোলাপ।একটি বট। একটি কালমেঘ। একটি তেঁতুল। একটি কৃষ্ণচূড়া। গভীর রাতে ওরা ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে। কান্না চাপা পড়ে নগরের হট্টগোলে। একদিন ঘুম ভেঙ্গে বট গাছ দেখে কাঠগোলাপের কাটা মুণ্ডু। কয়েকটি প্রজাপতি তখনি নিহত। কাঠগোলাপ ফুলদের সাদা বুকে জুতোর দাগ। কালমেঘ ফুঁপিয়ে কাঁদে। অসহ্য আক্রোশে ডাল-পালা-ফুল ঝাড়া দেয় কৃষ্ণচূড়া। তেঁতুল খসিয়ে দেয় সবুজ পাতার আচ্ছাদন।

আবার রাত আসে। এবার রাতের আঙ্গুল ধরে দুঃখ নয়। ক্রোধ আসে। অনন্যোপায় গাছেরা বনদেবীকে খুঁজে। ফুঁসতে ফুঁসতে নদী বলে, “আরে বোকাচোদার দল, বনদেবীকে তো কবেই ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে!” “এখানে নারী আর দেবীতে কোনো পার্থক্য নেই”-অনাহারে মৃতপ্রায় একটি ভ্রমর ধুঁকতে ধুঁকতে বলে। গাছেরা বুঝতে পারে, এখানে নারীর জন্য উদ্যত লৈঙ্গিক অস্ত্র। নারী হত্যা চর্চিত অভ্যাস। এখানে বৃক্ষ হত্যা উন্নয়নের সমার্থক।

আর চারটি গাছ বাকি। ওরা প্রতিশোধ নিতে চায়।

শহরটি বাড়ছে। প্রতিদিন। নিত্য নতুন উপায়ে দণ্ডধারী নাগরিকরা থাবা বসাচ্ছে নারীদের বুকে। কাউকে পুড়িয়ে মারে। তার পোড়া শরীর দেখে লোল টানে। কারো জিভ টেনে ছিঁড়ে নেয়। তার ছেঁড়া জিভের ঝোল তারিয়ে তারিয়ে খায়। কারো যোনির দরজা ভেঙ্গে উল্লাস করে। তার মুখে কয়লা ঘষে খিকখিক হাসে। কারো মেরুদণ্ড ভেঙ্গে মটমট আওয়াজ শোনে। তার নুয়ে পড়া মাথার উপর চড়ে বসে ঘোষণা করে, ‘ব্যাটাছেলে জিন্দাবাদ!’। কাউকে কালো কাপড়ে মুড়ে কলংকের বোঝা টানার হুকুম দেয়। তার মগজকে ঢেকে ফেলে কালো পরদা দিয়ে। দণ্ডধারী খুশি হয় আরেকটি দণ্ডধারীর জন্মে। পেরেক ফুঁটিয়ে খুন করে ভ্রুণ নারী। সব নারী এখানে ‘মেয়েছেলে’। যে নারী শিকল ভাঙ্গতে চায়, তাকে ওরা বলে ‘খানকি মাগী’। যে নারী বিচারের জন্য রাজার কাছে যায়, তাকে ওরা দিনে দুপুরে ন্যাংটো করে।

আর পাঁচজন নারী বাকি। একজন সাহসিকা। একজন বিষাদময়ী। একজন প্রাণচঞ্চলা। একজন নির্মলা। একজন মায়াবতী। রাত গভীর হলে ওরা ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে। কান্না চাপা পড়ে নগরের হট্টগোলে। একদিন ঘুম ভেঙ্গে বিষাদময়ী দেখে সাহসিকার সারা শরীরে করমচা রঙ্গা রক্তের ছোপ। সাহসিকার ছাই রঙ্গা কবুতর বুকে ছুরি ও দাঁতের আঁচড়। ফুঁপিয়ে কাঁদে নির্মলা। অসহ্য আক্রোশে হাত-পা ছুঁড়ে প্রাণচঞ্চলা। মায়াবতী উন্মাদিনী হয়ে যায়। খসিয়ে দেয় পরনের কাপড়।

আবার রাত আসে। এবার রাতের আঙ্গুল ধরে দুঃখ নয়। ক্রোধ আসে। অনন্যোপায় নারীরা ঈশ্বরকে খুঁজে। ফুঁসতে ফুঁসতে নির্বাসিত কিংবা নির্বাসিতা তৃতীয় লিংগের একজন বলে, “ধর্মের ছেঁচা খেয়েও তোমাদের শিক্ষা হয়নি। জানো না, ঈশ্বরকে তো বহু আগেই ধর্মের চাপাতি দিয়ে জবাই করা হয়েছে!” “এখানে ঈশ্বর আর মাটির পুতুলে কোনো পার্থক্য নেই”-একজন নারীর গলিত লাশ ধুঁকতে ধুঁকতে বলে।

আর চারজন নারী বাকি। ওরা প্রতিশোধ নিতে চায়। ওরা ছুটে যায় বিলুপ্ত বনের দিকে।

নির্যাতিত ভাষা বুঝে নির্যাতিতের। নারী ভাষা বুঝে বৃক্ষের। নারী এবং বৃক্ষ দল বেঁধে এগিয়ে যায় শহরটির দিকে। নগরের প্রহরীদের ছোঁড়া বুলেটে ওরা ঝাঁঝড়া হয়। তবু ওরা এগিয়ে যায়।হামাগুড়ি দিয়ে। তখন তীরন্দাজদের ছোঁড়া তীরে ওদের পিঠ রক্তজবা। তবু ওরা এগিয়ে যায়। বুকে হেঁটে। দণ্ডধারীরা হাততালি দেয়। হাততালির উল্লসিত শব্দে লজ্জায় মুখ লুকায় সূর্য। হায়! নারী! হায়! বৃক্ষ! প্রকৃতি বিলাপ করে। বধির নাগরিকরা শুনতে পায় না। তারা অপেক্ষা করে। এই বিদ্রোহী নারী কিংবা বৃক্ষদের পিষে মারবে বলে।

ঠিক তখনি আকাশে দেখা যায় একটি ফিনিক্স পাখি। পাখিটি বলে, ‘সরিয়ে দাও ছাইয়ের স্তুপ’। নারী এবং বৃক্ষ তখন ভুলে যায় সব। ভুলে যায় অক্ষমতা, রক্তজবা পিঠ, ঝাঁঝড়া বুক। ওরা বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে যায়। ওরা একসাথে আর্তনাদ করে। ওদের কণ্ঠে শত শিঙ্গার জোর। ওদের মাথায় ফিনিক্স পাখির পালকের মুকুট। ওরা একসাথে আর্তনাদ করে। প্রকম্পিত শহরে ভয়ে হুটোপুটি খায় সকল দণ্ডধারী। সিংহাসনের নিচে লুকিয়ে থর থর করে কাঁপে রাজা। ওরা একসাথে আর্তনাদ করে। সশব্দে ধসে পড়ে একটি শহর।

পুনশ্চঃ অনেক অনেক দিন পরে একদল প্রত্নতত্ত্ববিদ আবিষ্কার করবে একটি মৃত নগর। গহীন বনের মধ্যে তারা খুঁজে পাবে এক শহরের ধ্বংসস্তুপ। ওরা খুঁজে পাবে না কখনো পাপের পাললিক শিলা। কিন্তু পৃথিবী মনে রাখবে সকল পুরাণ। যেদিন নারী এবং বৃক্ষের আর্তনাদে প্রকম্পিত হবে দশ দিগন্ত, সেদিন পৃথিবী পুনরাবৃত্তি করবে সেইসব পুরাণ।

শেয়ার করুন:
  • 226
  •  
  •  
  •  
  •  
    226
    Shares

লেখাটি ১,০৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.