চলো, নিজেকে সম্মান করি

0

তাসলিমা শাম্মী:

আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে আমি আমার তৃতীয় স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। আসার সময় আমার নিজের গয়নাগাটি আর যা সঞ্চয় ছিল সব গুছিয়ে নিয়ে এসেছি।

এটা ছিল আমার তৃতীয় সংসার। শরিফ সাহেব আমার তৃতীয় স্বামী। দেশের নামকরা ব্যবসায়ী। দেশে বিদেশে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দিনে কোটি টাকার লেনদেন, অভিজাত এলাকাতে একাধিক বাড়ি। মোটকথা, বাড়াবাড়ি রকমের প্রাচুর্যময় সংসার ছেড়ে আমি একা নিজের জীবনের কথা ভেবে বেরিয়ে এসেছি।

“এবার থেকে আমি নিজের জন্য বাঁচবো। নিজের জন্য বাঁচাটা খুব বেশি দরকার এই অল্পদিনের অনিশ্চিত জীবনে” এই বাক্যটা মনে মনে বলতে বলতে বের হয়ে এসেছি বাড়াবাড়ি রকমের আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে।

আমার প্রথম বিয়েটা হয় ১৮ বছর বয়সে আমার প্রথম প্রেমিক মুহিতের সাথে। মুহিতের সাথে আমার প্রেম সেই স্কুল জীবন থেকে। মুহিত ছিল আমার ব্যাচমেট, বয়েজ স্কুলের ছাত্র। আমরা একই স্যারের কাছে টিউশন নিতাম। সেখানেই আমাদের দেখা, বন্ধুত্ব এবং প্রেম যা পরবর্তীতে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু গড়িয়ে বেশিদূর যেতে পারেনি, খুব অল্পদিনেই উম্মাতাল সেই কিশোর প্রেম শুকিয়ে যায় বাস্তবতার খরায়।

স্কুল পালিয়ে মুহিতের সাথে এখানে সেখানে ঘুরতে যেতাম। আমার ভাইয়াদের কানে আসে, তাদের একমাত্র আদরের ছোটবোন বন্ধু নিয়ে এখানে সেখানে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। মুহিতের বাবা দেশের বাইরে থাকে, সে ছিল ওদের পরিবারের বড়ছেলে। মুহিত খুব ভাল ছাত্র ছিল। আমি ছিলাম তিন ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন। খুব আদরের ছিলাম ভাইদের কাছে, ছোটবেলায় বাবা মারা যান, মা বিভিন্ন রকমের অসুখে সারা বছর অসুস্থ থাকেন। পুরো সংসার আর আমার দায়িত্ব ভাইদের কাঁধে। বড় ভাইয়া একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী করেন, মেঝ ভাই একটা কলেজের লেকচারার আর ছোট ভাইয়া তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মুহিতের কথা জানার পর ভাইয়ারা আমাকে শাসন করেন। পড়াশুনার খোঁজ নেন, বাইরে যাবার ব্যাপারে কড়াকড়ি বাড়িয়ে দেন। কিন্তু আমি তখন মুহিতের প্রেমে অন্ধ!

কৈশোরের প্রেম খুবই ভয়ানক, চোখে ভয়াবহ ধাঁধা লাগানো এই প্রেম। পৃথিবী উলট পালট করা এই কৈশোরের প্রেম আমাকে আর মুহিতকে ভয়ানক এক ঘোরের মধ্যে আটকে ফেলে। আমরা জড়িয়ে যেতে থাকি ভয়ানক অথচ এক স্বর্গীয় প্রেমের জালে। প্রথম প্রেম, প্রথম ছোঁয়া, প্রথম চুমু!! মুহিত আমার রক্তে ঢেউ তুলে। আমি মুহিতকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না। আমরা দুজনে উত্তাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকি।

আমার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট মোটামুটি হয়। ভাইয়ারা আমার রেজাল্ট দেখে অসন্তুষ্ট হোন, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। মেঝ ভাইয়া আমাকে উনার কলেজের বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন, মুহিত অন্য একটা নামকরা কলেজে ভর্তি হয়। ভাইয়ারা আমাকে চোখেচোখে রাখেন, কিন্তু আমি আর মুহিত ঠিকই দেখা করি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী আমরা দুজনে তখন, দুজনের পরিবার থেকেই কড়া শাসনের রোলার কোস্টার চাপানো হয় আমাদের দুজনের পড়াশোনা আর চলাফেরার উপর। বাইরের আর ঘরের চাপ, উড়ু উড়ু মন, রক্তে প্রেমের জোয়ার, প্রথম প্রেমিকের দুর্বার আকর্ষণ …সবকিছু মিলিয়ে দুজন ভীষণ রকম বেপরোয়া তখন। আমাদের প্রেমে স্বার্থহীনভাবে পাশে থাকে আমাদের দুজনের খুব ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধু।

আমার মায়ের শরীরটা খুব খারাপ হতে থাকে। বড় ভাইয়াকে বিয়ে করিয়ে ঘরে বউ নিয়ে আসেন মা। বড়ভাবি সংসারের দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে আমার এইচএসসি পরীক্ষার পর একদিন আমি আর মুহিত কাজী অফিসে গিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলি। সাথে ছিল আমাদের তিন চার জন বন্ধু।

আমাদের দুজনেরই বয়স তখন আঠারো। আমি আর মুহিত মাঝে মাঝে এক বন্ধুর প্রবাসী বোনের খালি ফ্ল্যাটে গিয়ে ডেট করতাম। বাসায় ভাবিকে নানা রকমের মিথ্যা কথা বানিয়ে বলতাম। একদিন বড় ভাবী আমাকে জেরা করে। কারণ কিছুদিন ধরে আমার শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। আমি সারাদিন শুয়ে থাকি, কিছু খাই না। বড় ভাবী বুঝতে পারে আমি কন্সিভ করেছি। আমি মুহিতের সাথে লুকিয়ে করা বিয়ের কথা ভাবিকে খুলে বলি। আমার এসব দেখেশুনে মায়ের শরীর আরও বেশি খারাপ করে, ভাইয়ারা প্রচণ্ড রেগে যায় আমার উপর। মুহিতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে মেঝ ভাইয়া। মুহিতের বাবা-মা ভাইয়াদের ডেকে নিয়ে প্রচণ্ড অপমান করে। মুহিত আমাকে খবর পাঠায় বাচ্চা নষ্ট করে ফেলার জন্য। কারণ আমরা না বুঝে একটা ভুল করে ফেলেছি। তাছাড়া দুজনেই এখনও ছাত্র। আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে!

সবকিছু দেখেশুনে আমি অবাক বা কষ্ট পেতে ভুলে যাই। আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। মুহিত কোন এক সুযোগে দেশের বাইরে পড়তে চলে যায় আমাকে না জানিয়ে। সে আমাদের প্রেম, বিয়ে, সন্তান সবকিছু ভুলে যায় এক নিমেষে! সে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সিঁড়িতে পা রাখে, আর আমি প্রতিটা সেকেন্ডে সেকেন্ডে তলিয়ে যেতে থাকি হতাশার অতল গহ্বরে! একসময় আমি আত্মহত্যার কথা ভাবি। একরাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলি। আমি মরে যেতে চাই। আমি ধীরে ধীরে মরে যেতে থাকি ……।

কিন্তু না। আমি মরে যাই না, আমার ভিতরে থাকা মুহিতের অংশটা মরে যায়। আমি বেঁচে থাকি।

আমি একজন মৃত মানুষ হয়ে বেঁচে থাকি। আমি আগের মতো গাইতে পারি না, কথা বলতে পারি না, হাসতে পারি না। আমি শুধু শ্বাস নিতে পারি, কিন্তু বেঁচে থাকি না।

আমার মা মারা যান। বড়ভাবীর বাচ্চা হয়। ছোট ভাইয়া দেশের বাইরে পিএইচডি করতে চলে যায়। মেঝ ভাইয়া আমাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়। আমি দীর্ঘদিন মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার পর বাসায় ফিরে আসি। আমি আমার অতীতের সবকিছুই ভুলে যেতে প্রাণপণ চেষ্টা করি। আমাকে যে ভুলে যেতেই হবে, বাঁচতে হবে নিজের জন্য। আমি আবারও হাসতে চেষ্টা করি, বাঁচতে চেষ্টা করি।

আমি আবার পড়াশুনা শুরু করি। এর মধ্যে মেঝ ভাইয়ার এক কলিগ আমাকে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমার পরিবার মুহিতের সাথে আমার বিয়ের কথা, আমার অসুস্থতা, গর্ভপাত, আত্মহত্যার চেষ্টার কথা, সব গোপন করে। কারণ আমরা সবাই আমার অতীতের দুঃস্বপ্ন থেকে বের হবার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছি তখনো। আমি নতুন ভাবে নতুন পৃথিবীতে বাঁচতে চাই।

রাহাতের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়। রাহাত বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের বড়। বেশ ভদ্র এবং গরীব ঘরের ছেলে রাহাত।

আমাদের বেশ ভালই দিন কাটে। ভাইয়ারা আমার সংসার সাজিয়ে দেয় দামী দামী সব আসবাবপত্র আর ইলেক্ট্রনিক্স দিয়ে। আর দশজন সাধারণ মেয়ের মতোই আমি রাহাতের সাথে সংসার করতে থাকি।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই রাহাত অস্থির হয়ে উঠে আমাদের কেন সন্তান আসছে না এই ভেবে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় আমাকে। ডাক্তার দুজনকেই বিভিন্ন রকমের টেস্ট করতে দেয়। একরাতে রাহাত আমাকে জানায়, সমস্যাটা আসলে আমার! ডাক্তার বলেছে, আমার মা হবার ক্ষমতা নাই! আমি রাহাতের সাথে তর্ক করি, এটা কোনদিনও হতে পারে না। সেরাতে খুব সামান্য কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রাহাত আমার গায়ে হাত তুলে।

আমি রাহাতকে অনেকভাবে বুঝাতে চাই, “সমস্যা যার হবে হোক, দুজন মিলেই মোকাবেলা করবো। সব সমস্যারই সমাধান রয়েছে। আর বাচ্চা এমন কোন বড় সমস্যা নয় দুজন মানুষের সম্পর্কের মধ্যে”। কিন্তু রাহাত শুনে না আমার এসমস্ত শান্ত কণ্ঠের সান্ত্বনার কথা। রাহাত আমাকে প্রচণ্ড মারে। আমার চুল ধরে টেনে আমাকে মেঝেতে ফেলে দেয়। আমাকে মাটিতে ফেলে এলোপাথাড়ি লাথি মারে। আমি ব্যথার চেয়েও বেশি অপমানিত হই, আমি রাগে অন্ধ হয়ে যাই। জীবনে কেউ কোনদিন আমার গায়ে হাত তুলেনি। আমি চিৎকার করে রাহাতকে বলি, “সমস্যাটা তোমার, আমার না। আমি আগে একবার গর্ভধারণ করেছিলাম। একজন বিশ্বাসঘাতক আমার সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে পালিয়ে গেছে। আমার জীবনের প্রথম সুখগুলোকে অসুখ বানিয়ে দিয়ে গেছে”।

আমি সেদিন রাহাতের সংসার ছেড়ে চলে আসি। “আমি অপমান আর ব্যথার সাথে বাঁচতে চাই না। আমি নিজে নিজের ব্যাথার সাথে বাঁচবো, অন্যের আঘাত আর অপমান নেবার মতো উদার হতে পারবো না”। আমি স্পষ্ট করে আমার ভাইয়াদের জানিয়ে দিই।

এরপর অনেকগুলো দিন আমি আমার সাথে বেঁচে থাকি। নিজেকে নিয়ে নিজে গবেষণা করি। দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রতি করা অনেক অনেক অবহেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করি। নিজেকে ভালবাসতে থাকি মনপ্রাণ উজাড় করে। আমি হাসতে থাকি, হাসাতে থাকি। ততদিনে আমি অনেক কিছু শিখে গেছি। বয়স আর সময় আমাকে অনেকটাই পরিপূর্ণ করে তুলেছে ততদিনে। কিন্তু সময় সবসময় নিজেকে নিয়ে ভাবতে দেয় না মানুষকে! নিজের উপর আমাদের নিজেদের অধিকার মনে হয় না সবসময় কাজে লাগে!

আমার পরিবারের মানুষগুলো আবার আমাকে নিয়ে, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠে। তাদের কাছে আমি একজন মানুষের চেয়েও একজন মেয়েমানুষ! “একজন মেয়েমানুষের নিশ্চিত জীবন একমাত্র স্বামী সংসার ঘিরে” এই চিরাচরিত প্রবাদ থেকে তারা তখনো বের হয়ে আসতে পারেনি।
আমাকে সবাই মিলে বিপত্নীক শিল্পপতি শরিফ সাহেবের সাথে বিয়ে দেয়। শরিফ সাহেব দেশের একজন সফল উদ্যোক্তা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং দানবীর।

পঞ্চাশোর্ধ্ব অমায়িক, ভদ্র এবং প্রচণ্ড রুচিসম্পন্ন শরিফ সাহেব আমার সব অতীত এবং বর্তমান জেনেশুনেই আমাকে বিয়ে করে। সমাজের কাছে আমাকে তার প্রাসাদের রানী করে রাখার প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করার জন্য আমাকে হীরে আর জহরতে মুড়িয়ে সবার সামনে উপস্থাপন করে। নিজেকে কিছু সময়ের জন্য রানী ভাবতে আমিও ভুল করি না! “আঁধার কালো রাতের পর একটা মিষ্টি ভোর আসে” এই কথাটিই আমার কাছে সত্যিই মনে হতে থাকে বিত্তশালী শরিফ সাহেবের বুকে মাথা রেখে!

কিন্তু না। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মান। আমি নিজেকে একজন মানুষই মনে করি, মেয়ে মানুষ না।

একদিন মাতাল অবস্থায় শরিফ সাহেবের বিকৃত রুচির প্রস্তাবে রাজি হইনি বলে উনি আমাকে আমার অতীত টেনে “বেশ্যা ” বলে গালি দেয়!
“বেশ্যা” কি একটা গালি? আমি জানি না। আচ্ছা বেশ্যা ‘র পুংলিঙ্গ কী “বেশ্যার কারিগর”? আমি জানি না। তবে একটা সত্যি কথা, “বেশ্যা” শব্দটা আমার কাছে কোন অপমানজনক গালি না। এই শব্দের প্রয়োগকারী আমার কাছে একজন নিম্ন মনমানসিকতার মানুষ, একজন অসুস্থ মানুষ।

আমি একজন অসুস্থ মানুষের সাথে আমার অমূল্য জীবন কাটাতে পারি না। আমি বের হয়ে আসি। আমি নিজের জন্য বাঁচবো। নিজেকে নিয়ে বাঁচবো, অন্যদের বাঁচতে শিখাবো। নিজে নিজে হাসবো, অন্যকে হাসতে শেখাবো। আমি জীবনের গল্প বলবো, জীবন্মৃতের নয়। চলো নিজেকে সম্মান করি, তবে অন্যকে অসম্মান করে নয়।

শেয়ার করুন:
  • 234
  •  
  •  
  •  
  •  
    234
    Shares

লেখাটি ১,৩১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.