মনের ভেতর বাস করা ট্যাবুগুলোকে ভাঙ্গতে হবে

0

উপমা মাহবুব:

ট্যাবুর সংজ্ঞা কী, কোথা থেকে ধারণাটি এলো, এর বিবর্তন – এসব সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। কখনো এ নিয়ে পড়ালেখা করা হয়ে উঠেনি আর কী! সাধারণভাবে ট্যাবু বলতে বুঝি কোন কাজ, যা ভ্রান্ত ধারণা বা অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সমাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মানুষও মনে-প্রাণে সেগুলোকে নিষিদ্ধ হিসেবেই ধারণ করে এবং তা করা থেকে বিরত থাকে। ট্যাবুর এই সংজ্ঞাটিকে আপাতত সঠিক ধরে ট্যাবু ভাঙ্গা বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য তুলে ধরবো।

খুব ছোট থাকতে আমার মধ্যে একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল যে আমি যদি কান্না করি তাহলে লোকে আমাকে দুর্বল ভাববে। কেননা চারপাশের অধিকাংশ মেয়েদের সেরকমই মনে হতো – অবলা, ভীতু, পরনির্ভরশীল। একটুতেই কান্নাকাটি করছে। ছেলেরা শক্ত আর সাহসী। তাদের কাঁদতে দেখতাম খুব কম। রূপকথার গল্পে, পরবর্তীতে পড়া শরৎচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের নারী ও পুরুষ চরিত্ররাও এরকমই ছিল। সমাজ যেন নিষিদ্ধই করে দিয়েছে যে মেয়েরা সাহসী হবে না। তাদের মনের জোর থাকবে না।

আমি আমার সমস্ত শৈবব, কৈশোর জুড়ে হাজার দুঃখ-কষ্ট-বেদনায়ও তাই কখনো কারও সামনে কাঁদিনি। আর সবসময় নিজেকে বোঝাতাম, একটা ছেলে যা পারে, আমিও তা পারি। এটা সত্য যে, এর মধ্য দিয়ে আমি ছেলেদের মতো হতে চাইতাম। নারী সত্ত্বাকে ভুলে গিয়ে পুরুষদের মতো হতে হবে – সেটাও যে একটা ভুল ধারণা, তা বোঝার মতো বয়স তখনো আমার হয়নি। তারপরও এটাই সম্ভবত আমার জীবনের প্রথম ট্যাবু ভাঙ্গার চেষ্টা যা দিয়ে আমি তথাকথিত নারীর ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলাম।

তারপর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। যতটা সম্ভব মুক্ত মনের হওয়ার চেষ্টা করি। তারপরও অবাক হয়ে যাই যখন আবিষ্কার করি মনের অজান্তেই এখনো কত ট্যাবুকে সত্য বলে বিশ্বাস করি।

এইতো সেই দিনের ঘটনা – রাস্তায় হাঁটছি। দেখলাম হুড খোলা রিক্সায় একটি মেয়ে বসে আছে। তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো, একা মেয়ে রিক্সায় সবসময় হুড তুলে বসবে – এই ধারণাটা নিছক ট্যাবু ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সঙ্গে তার নিরাপত্তার বা হঠাৎ করে রিক্সা থেকে পড়ে যাওয়ার আশংকার কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ উইমেন চ্যাপটারের মতো পোর্টালে লেখালেখি করা এই আমি হুড খোলা রিক্সায় বসে থাকা মেয়েদের দেখলে আড়চোখে তাকাই, আর ভাবি, ‘ওভার স্মার্ট’। যেদিন প্রথম হুড খুলে একা রিক্সায় চড়লাম, যেন মুক্তির আনন্দ পেলাম। খোলা বাতাসে চুল উড়িয়ে চলা – আহ! একেই বলে স্বাধীনতা।

তবে মুশকিল হলো, ট্যাবু ভাঙ্গার সাথে সবসময় কিছু ‘কিন্তু’ জড়িত থাকে। উপরের ঘটনাটার মানে কি এটাই যে, নারীর প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়ার প্রতি সমাজের যে রক্ষণশীল মনোভাব সেটাও ট্যাবু? বিষয়টিকে বুঝতে হলে অন্য ফ্যাক্টরগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

সিগারেট খাওয়া একদিকে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর এবং যেখানে-সেখানে সেটি খাওয়া আইনের লঙ্ঘনও বটে। তাই এটা নারী এবং পুরুষ দুজনের জন্যই বর্জনীয়। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে নারী বা পুরুষ কারোর সিগারেট খাওয়াই সমর্থনযোগ্য নয়।

তাই এভাবে বলা যেতে পারে যে, সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম বা প্রথা যা কোন কার্যক্রম বা আচরণকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে, তার বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে সেগুলোই ট্যাবু। কিন্তু সমাজ নিষিদ্ধ কোন কাজ যদি আইন এবং মানবাধিকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেটি ট্যাবু নয়। সেগুলো রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর। ইউরোপ-আমেরিকার কোন বিমানে বসে আপনি প্রকাশ্যে বান্ধবীকে মুখচুম্বন করতে পারবেন। প্রকাশ্যে চুম্বন করা যাবে না- অনেক জায়গাতেই এটাকে ট্যাবু হিসেবে ধরে নিয়ে তা আর মানা হয় না। কিন্তু বিমানে বসা অবস্থায় সেক্স করা শুরু করলে বা তার কাছাকাছি আচরণ প্রদর্শন করলে তার জন্য আপনার দণ্ড হবে। এটি আইনত নিষিদ্ধ আচরণ। তাই ব্যক্তি স্বাধীনতা বা ট্যাবু ভাঙ্গার নামে সীমানা লঙ্ঘন করে যা ইচ্ছা তাই করবো, সেটিও সম্ভব নয়।

ট্যাবু জিনিসটা তাই বেশ গোলমেলেই বটে। দেশভেদে তার পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে সময়ভেদেও। এক সময় বাংলাদেশে নারীরা চারপাশে কাপড় দিয়ে ঘেরা যানের ভেতর চলাচল করতেন। সেখানে একটা সুঁচ ঢোকানোর মতো ফাঁকও থাকতো না। বেগম রোকেয়া তার লেখনী এবং নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে এই প্রথাকে ট্যাবু হিসেবে প্রমাণিত করেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্মকে শেখানো হয়েছে – ঘোরটেপ থাকবে না, কিন্তু একা চলাচলের সময় রিক্সার হুড তুলে রাখবে, তাহলেই তুমি বেগম রোকেয়ার সময়কার সেই ট্যাবু ভাঙ্গতে পারবে। সেই ধারণাও যুগের হাওয়ায় এখন ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে। হুড তোলা আর না তোলা এখন ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা। এটিকে কোন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আর বেঁধে দেওয়া যাচ্ছে না।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে এটা বলা যায় যে ট্যাবুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে একটু একটু করে, ধীরে ধীরে ভাঙ্গতে হয়। হুট করে সামাজিক নিয়ম মানি না, ধর্মে বিশ্বাস করি না – এই কথা বলে যুদ্ধ ঘোষণা করলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। কেননা সমাজ বা ধর্মের সবকিছুই ভুল বা ভ্রান্ত নয়।

অন্যদিকে, যদিও আমি আইনের কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু অনেক সময় সমাজের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেও আইন তৈরি করা হয়। তাতে সমাজের ভ্রান্ত ধারণাগুলোর প্রতিফলন ঘটে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ট্যাবুকে সমর্থন করে এ রকম আইনও পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। সবসময় তাই নিজের মনের অভ্যন্তরে কোন ট্যাবুগুলো বাস করে সেগুলোকে খুঁজতে থাকি। অন্যরা কোন বিষয়গুলোকে ট্যাবু বলছে এবং কেন বলছে তা বোঝার চেষ্টা করি। আধুনিকতা, ব্যক্তি স্বাধীনতার কনসেপ্টগুলোকে বিশ্লেষণ করে কোনটা ট্যাবু আর কোনটা আসলে আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন তা বোঝার চেষ্টা করাটা জরুরি। আমার মনে হয় নারী-পুরুষ সকলের ক্ষেত্রেই নিজের ভেতর ধারণ করা ট্যাবুগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে ভাঙ্গতে পারাটা খুব জরুরি।

যাই হোক, ট্যাবু বিষয়ে যা লিখলাম তার সবই আমার এলোমেলো ধারণা। আগেই বলেছি এ বিষয়ে আমার ধারণা খুবই কম। নিজের মতো করে ভেবে কিছু যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম মাত্র। যা লিখেছি তাতে দ্বীমত থাকাটাই তাই স্বাভাবিক। তবে এটাতো ঠিক যে ট্যাবু নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া দরকার? আমার লেখাটি যদি কারো মনে এ বিষয়ে চিন্তা করার খোরাক জোগায়, সেটাই এই লেখার সার্থকতা।

শেয়ার করুন:
  • 849
  •  
  •  
  •  
  •  
    849
    Shares

লেখাটি ২,৫৬৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.