নারীর কষ্ট মানেই কি বিলাসিতা?

0

ইলা ফাহমি:

ক্লান্তি, (প্রি)মেন্সট্রুয়েশনাল ডিপ্রেশন, পিরিয়ডের ব্যথা, ম্যাজমেজে অবসাদ, শরীরের প্রতিটা জয়েন্টে ব্যথা, স্তনে ব্যথা, বিষাদ জিহবা, মাইগ্রেন, নির্ঘুম রাত নিয়ে মাসের এই কয়টা দিন আসে নিয়ম করে। এখন উপরি যুক্ত হয়েছে ভাঙা আঙুলে হঠাৎ হঠাৎ জেগে ওঠা চিনচিনে ব্যথা আর জ্বরভাব।

বছর সাতেক আগেও এই বিষয়গুলো এমন ছিলো না। ছিলো না বললে ভুল হবে, ছিলো কিন্তু ভিন্ন রূপে। একসময় পিরিয়ডে প্রচণ্ড পেটব্যথা হতো। পেটব্যথায় শরীর কুঁকড়ে যেত, গলা দিয়ে চিৎকার বেরুতো। আম্মা বা খালা বলতেন-‘চিৎকার করতে হয় না। মানুষ শুনবে, লজ্জা না?’
প্রাকৃতিক নিয়মের প্রকাশ লজ্জার, সেদিন জেনেছিলাম। জেনেছিলাম নারী হওয়াই আসলে সবচেয়ে বড় লজ্জা, নারীর জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বনই হচ্ছে লজ্জা, নারী আগাগোড়াই আসলে লজ্জা। বলছিলাম পিরিয়ডের কথা, এমনও হয়েছে এই পিরিয়ডের ব্যথায় জ্ঞান হারিয়েছি। এরপর? এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর একা একা ডাক্তার দেখিয়েছি, ওষুধ খেয়েছি, ঠিক হয়েছি। সে ডাক্তার আবার পুরুষ ডাক্তার, কী লজ্জা!! সেই তীব্র ব্যথা আর নেই, বাকিসব আছে।

ইলা ফাহমি

বছর চারেক হলো ডিপ্রেশনকে পড়তে শিখছি। তখন থেকেই বোধহয় নিজেকে পড়তে শুরু করলাম। এ সময়ে অতীতের স্মৃতিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে সারা শরীর জুড়ে, নিজের অক্ষমতা, অনিরাপত্তা সামনে এসে দৈত্যের হাসি হাসবে, নিজেকে অকর্মণ্য ইউজলেস প্রোডাক্ট মনে হবে, কাউকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, পাশের মানুষের করা আচরণগুলো ছুরি হয়ে খোঁচাতে থাকবে ইউটেরাসে, ঘুম আপত্তি জানাবে রাত্রিকালীন সঙ্গমে। যেনো এ সময় এ শরীরটা ছেড়ে সবার দূরে সরে যেতে হয়, নিরাপদ দূরত্বে ভুতুড়ে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় মূর্তির মতো ছ’দিন পর ফেরত আসবার অপেক্ষায়। যেনো এ ক’টা দিন পাশে কেউ থাকবার কথা নয়! তারপর? খুব যত্ন করে দমিয়ে রাখা কান্নাটাও আর শরীরের ভেতর থাকতে চায় না, ছিঁড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। তারপর শরীরটা নিঃসাড় হয়ে গভীর কোন অন্ধকার কুয়ায় পড়ে থাকতে চায় কুণ্ডলী পাকিয়ে।

‘আমাদের মা-খালাদের দেখেছি সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করতে, কোনদিক দিয়ে তাদের পিরিয়ড হলো কী বাচ্চা হলো বোঝাই যেত না। এখনকার মেয়েদের এতো সমস্যা আসে কোত্থেকে! আগেরদিনের মতো এতো পরিশ্রমও করতে হয় না!’ মা-খালাদের চোখের গভীরে যে নীল মারিয়ানা ট্রেঞ্জ অপঠিত রয়ে গেছে, যার কিনারে দাঁড়িয়ে তারা সকাল-বিকাল দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, সে খবরটুকু ক’জন জানে? যারা ওপরের বাক্যটুকুও বলেন না, তারাও মনে মনে ধারণ করেন এবং এজন্যই এই সময়ে ‘লজ্জিত নারী’টির যে বাড়তি মানসিক যত্নটুকু করতে হয় সেটাকে বালখিল্যতা এবং বিলাসিতা মনে হয়। আর নারীটি দূরে সরে যেতে থাকে সবকিছু থেকে, এমনকি নিজের সত্ত্বা থেকেও।

নারীর চাহিদা মানে বাড়তি যন্ত্রণা, নারীর যত্ন মানে বাড়তি বিরক্তি, নারীর কষ্ট মানে উপরি বিলাসিতা। অথচ নারীর ওই জরায়ু যদি লজ্জিত হয়ে তার কাজ বন্ধ করে দেয়! অথচ এমন একটুকরো জায়গাও কী পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই যেখানে নারী নিজেই তার বিমর্ষতা বিষন্নতা অবসাদকে সময় দিতে পারে, নিজের যত্ন নিতে পারে?
সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে শীতের সকালে ওম নেবে সূর্যের, নদীর কিনারে বাঁধানো বৃক্ষের নিচে বসে শুনবে পাখিদের খুনসুঁটি, আলো-আধারির জ্যোৎস্নায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে পাহাড়ের পথ ধরে বেশ খানিকটা গভীরে, বৈঠাহীন নৌকায় শুয়ে রাতের তারা দেখতে দেখতে হয়তো সে জীবনের মানে খুঁজে নেবে৷ তারপর নতুন উদ্যোমে শুরু হবে তার সামনের দিনগুলো, আরও আলোকিত, আরও উদ্ভাসিত হয়ে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 95
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    95
    Shares

লেখাটি ৪৮৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.