সাধারণ মানুষের ঘামে ভেজা এই উন্নয়ন নিয়ে এতো বড়াই কেন?

0

দিলশানা পারুল:

গ্রামীণ নারীর ব্লাউজ পরা না পরা অবশ্যই উন্নয়নের একটি দৃশ্যমান ইন্ডিকেটর। এইটা কোনো হাসির কথা না। সত্যিই না। যে কথা আমাদের নায়িকা আপা ঠিকঠাক মতো বলার চেষ্টা করে বলতে ব্যর্থ হলেন, সেই কথাটা আমি বলে দিচ্ছি। এইটা খুবই সত্যি কথা, এই কিছুদিন আগেও আমাদের গ্রামগঞ্জের মেয়েরা শাড়ির সাথে ব্লাউজ সেইভাবে পরতো না।

২০১৬ সালে মোটে মানিকগঞ্জে স্কুল ভিজিটে গেছি। সাথে দুই আমেরিকান নারী গবেষক। রাস্তার পাশে মধ্য বয়ষ্ক এক নারী এক স্তন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকারভাবে। রাস্তা দিয়ে অনেকেই যাচ্ছে, কারো সেরকম খুব একটা ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হলো না। আমিই শুধু বিরাট অস্বস্তি নিয়ে তাকে পার হলাম। তারপর মনে মনে খুবই ভালো লাগলো। মনে মনে বেশ একটা গর্ব অনুভব করলাম আমেরিকান দুই নারীর সামনে। দেখছো আমরা কতো প্রগতিশীল! আধা উদোম নারী দেখলেও আমাদের দেশের লোকজন খুব একটা কিছু বলে না!!

দিলশানা পারুল

গ্রামে গেলে হরহামেশাই দেখতে পাবেন ক্ষেতে কাজ করা মেয়েরা পোশাক নিয়ে খুব একটা ভাবিত না। নদীর পাড়ে গোসল করতে যাওয়া মেয়েরাও শরীর নিয়ে খুব একটা বিচলিত থাকে, এরকম না। এইটা আমাদের সামাজিক প্রগতিশীলতার লক্ষণ। শরীর নিয়ে আমাদের শহুরে মেয়েদের যতো অস্বস্তি, নখরা, আমাদের গ্রামের মেয়েরা এই জায়গা থেকে অনেকখানিই মুক্ত। এখন সভ্যতার নামে, উন্নয়নের নামে আমরা অনেক আরোপিত, অপ্রয়োজনীয় কাজ করেছি। মেয়েদের গায়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাপড় চাপানো এই রকমই একটি কাজ।

আমাদের নায়িকা আপা যেটা বোঝাতে চেয়েছেন সেইটা হচ্ছে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ফলে আমাদের গ্রামীণ নারীর ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে এবং সভ্যতা জ্ঞান বেড়েছে, ফলে তারা আর খালি গায়ে থাকে না। তারা তাদের ক্রয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্লাউজ পরে সভ্য হয়েছে। অঞ্জনা আপার হয়ে আমি কথাগুলো বলে দিলাম। আমারে তো আর টকিং শোতে ডাকবে না, তাই এইখানেই বললাম।

এইবার আসি শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের কৃত্বিত্ব দাবি করা বিষয়ে। উন্নয়ন, মানে উন্নতি দুইটা স্তরে হয়, রাষ্ট্র এবং সামাজ এই দুইটা স্তরেই। ব্যক্তির সামষ্টিক উন্নয়নের ছাপ সমাজে পড়ে, রাষ্ট্রে পড়ে। ব্যক্তি নিজে যদি তার অবস্থার উন্নতি না করে, রাষ্ট্র বা সমাজের বাপের সাধ্য নাই তারা নিজে নিজের উন্নয়ন ঘটায়। সমাজ এবং রাষ্ট্র এই দুইটাই পরির্তনশীল। এরা সারাক্ষণই পরিবর্তিত হচ্ছে। যেই পরির্তনের মূল নিয়ামক হচ্ছে সেই রাষ্ট্রের এবং সামাজের নাগরিকগণ। যুদ্ধ এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া যেকোনো সামাজ এবং রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই সামনের দিকে এগোয়।

কেন সামনের দিকে এগোয়? কারণ মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। চিন্তা করতে পারে বলেই পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো থেকে আজকে সভ্যতাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। নিজের অবস্থার উন্নতি করা মানুষের সহজাত ধর্ম। ১৭ কোটি লোকের একটা দেশে মানুষ শুধু যদি তিন বেলা খাবার ধান্ধাই করে, তাইলেই সেইটা জিডিপিতে সরাসরি হিট করবে। এখন আট কোটি লোক যদি বলতো আমরা কাজ করবো না। সরকারকে আমাদের বসে বসে খাওয়াতে হবে, উন্নয়ন তখন জানালা দিয়ে দৌড় দিতো। এই যে এতো উন্নয়নের বড়াই করেন, এই উন্নয়ন কার জন্য হয়েছে? কার? এই দেশের প্রতিটা খেটে খাওয়া মানুষের ঘামে ভেজা টাকায় গড়া উন্নয়ন। এই যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চেতনা করেন, কার রক্তে স্বাধীন হয়েছে দেশ? কার রক্তে?

প্রতিটা শহীদের রক্ত এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত। কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, ছোট ব্যবসায়ী, মাঝারী ব্যবসায়ী এদের রক্তে কেনা স্বাধীনতায় আজকে আপনি স্বাধীনতা নিয়ে ফুটানি করেন। প্রতিটা খেটে খাওয়া মানুষের ঘামে ভেজা টাকায় রাস্তা হয়েছে, ব্রিজ হয়েছে, শিল্প কারখানা হয়েছে, মিগ কিনেছেন, কিনে ফুটানি মারাচ্ছেন আমি করেছি, আমরা করেছি। প্রতিটা ঋণের টাকা তিনগুণ, চারগুণ হয়ে শোধ দিতে হবে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে।

আপনার মন্ত্রী আমলারা সুইস ব্যাংকে যে টাকা রেখেছে, সেই টাকাও এইসব খেটে খাওয়া মানুষের ঘামে ভেজা টাকা। দেশের সাধারণ মানুষ গলায় রক্ত তুলে খাটবে, খেটে দেশে কে এগিয়ে নেবে, আর উন্নয়নের ফুটানি মারাবেন আপনারা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 143
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    143
    Shares

লেখাটি ৪০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.