স্কচে নিমজ্জিত জাতির ‘প্রতিবাদ’ কার হাতে?

0

সুচিত্রা সরকার:

শ্রীমঙ্গলের চা-শ্রমিকরা প্রতি কেজি পাতা তুলে পেতো ষাট কী সত্তর টাকা। সেই দিয়ে দিনের বাজার। ওষুধ-পথ্য। তৈজস। জরাজীর্ণ জীবন, একশো টাকায় কীভাবে চলে?

জীবনে প্রথম লিকারের দোকান দেখেছি শ্রীমঙ্গলেই। একটা ছরার কাছে পাহাড়ের উপরে দুপুরের যাত্রা- বিরতি। দোকানের উপরে সাইনবোর্ড- সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত লিকারের দোকান। আই মিন, সরকারি রেজিস্ট্রেশন আছে দোকানটার। ভেতরে কালী আর লক্ষ্মীর ফটোতে ধূপ- ধুনো পড়ছে। ঘরের ভেতরে ঢোকা বারণ। জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে দিতে হয়! এক লিটার নব্বই টাকা। ধারের ব্যবস্থা আছে। ধারের টালি খাতাটা দেখলাম। চা শ্রমিকদের নামের ভারে খাতাটার জীর্ণপ্রায় দশা!

অভাবী, দুঃখী শ্রমিকের শ্রম বেচে মালিকরা বিলিয়নিয়ার হচ্ছে। বদলে শ্রমিকের জুটছে কায়-ক্লেশ জীবন। সে জীবনের জরা ভোলাবে কে? শ্রমিক যদি ঠকতে ঠকতে ফুঁসে উঠে, তাকে সামলাবে কে?

সুচিত্রা সরকার

তাই এ ব্যবস্থা! মদের নেশায় তাকে চুর করে রাখো! যাতে সে বঞ্চনা দেখতে না পায়! যাতে সে প্রতিবাদের মেরুদণ্ড তুলে দাঁড়াবার সাহস না পায়!
এভাবেই চলছে শোষণের প্রাত্যহিক জীবন! শোষকের নীল নকশা!

তাই সেখানে আন্দোলন দানা বাঁধে কম। জীবনগুলো এভাবেই ফুরিয়ে যায়। শোষণের পিঠ দেয়ালে ঠেকতে ঠেকতে মমি হয়ে যায়!
এবার একটু উপরতলার কথা।

গত এক দশকে বা দেড় দশকে বাংলাদেশও পালটে গেছে। মানে মধ্যবিত্তের বাংলাদেশ। উঠতি মধ্যবিত্তের বাংলাদেশ।

এখন সবাই ঘুরছে পানীয়কে কেন্দ্র করে। পানীয় বলছি শক্ত পানীয়কে। হার্ড ড্রিংকস। মদ। স্কচ, ভদকা, হুইস্কি- যা হোক কিছু।

কেমন তার কেন্দ্র? কিছু নমুনা- সন্তান পৃথিবীতে এলো। ব্যস, এই উপলক্ষে পানাহার! সন্তানের জন্মদিন। নিজের জন্মদিন, লতাপাতা, বন্ধুবান্ধব- চৌদ্দগুষ্ঠির সকল ক্রিয়াকর্মে মদ্য পান অবশ্যকর্তব্য।
মৃত্যুদিন? হ্যাঁ, সেখানেও রয়েছে ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পরীক্ষা শেষ! ব্যস!
চাকরিতে প্রমোশন। নতুন ইভেন্ট চালু। বসের বদলি। চাকরি চলে গেল। বউ বাপের বাড়ি গেল। ব্যবসায় লস! ছুটিতে ভ্রমণ- প্রকৃতি দেখার আগে বোতলের খোঁজ!
শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। মনটা ভাল নেই। অথবা সব ঠিকঠাক। তবু কী যেন নেই!
এই ‘নেই’ বিষয়টাকে খুঁজতেই মদের দিকে ছুটছে জাতি!

শহরে আগে এতো বার তখন ছিল না। এখন তো শাহবাগ এর পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই কতগুলো গড়ে উঠেছে। কারণ কী? বলছি, একটু ধীরে!

শুনলাম, ছোট নেতার নাকি ঢাকা শহরে তিনটা বার আছে। শুনে বললাম, ছিঃ বারের ব্যবসা? এতো খারাপ!

উত্তর আসলো- খারাপ কেন? এতো ব্যবসা!
প্রতিত্তোর একটাই- তাহলে আমেরিকার অস্ত্র-ব্যবসাও খারাপ নয়!

মধ্যবিত্ত এলাকার বারগুলোয় মেয়েরা এলাওড না। সম্পত্তি একটার দেখা মিললো পান্থপথে। সঙ্গী খাবে মদ। আমি সঙ্গী হলাম ‘টদ’ খেতে! সেখানে এতো মন্দ আলো কেন? যেন বাদুর বাস করে। প্রত্যেক টেবিলে চারটা করে ওয়াইনের গ্লাস। প্লাস্টিকের (আছাড় মারার প্রটেকশান)। প্রত্যেক টেবিলের পাশে একটা করে ঝুড়ি- পলিথিনে মোড়া (বমি পরিষ্কারের ঝামেলা নেই)।

এই যে দশা- এতো মদারুকে করুণা করা। এই পরিবেশ মদখোরের জন্য সম্মানজনক নয়। বার মালিক ব্যবসা করে। কিন্তু জানে, তার কাস্টমারদের কাছে জিনিসপত্র নিরাপদ না।

তো ভাই, কেন এই পরিবেশ তৈরি করা- যা মর্যাদা দেয় না?

একবার এক হোদলকুৎকুতের কাছে নালিশ করেছিলাম- আরেক চিনে-জোঁক ‘খাচ্ছে’। সকলকে খাওয়াচ্ছে। এসব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। নইলে বিরাট ক্ষতি! হলো না কিছুই।

তারও দশ বছর বাদের ঘটনা। সেই চিনে-জোঁক যাকে মদ চিনিয়েছিলো, ধরুন ক। মদ, গাঁজায় পেলেপুষে পড়ালেখায় ডাব্বা খাওয়ালো খ কে। তারপর সকল ধরনের অনুশোচনায় ট্রেনে তার গলা পেতে দিয়েছিল। তাইতো প্রথমটাকে চিনে-জোঁক বললাম!

একটা মেয়েকে চিনি। সো কলড নারীবাদী। কিচ্ছু বরদাস্ত করে না। অন্যায় তো নয়ই। আশপাশের কেউ-ই তার স্ট্যান্ডার্ডের নয়। সেই আমাকে একদিন জানালো, সে ‘খায়’। শুধু বন্ধুদের সঙ্গে। বন্ধুদের সঙ্গে একটু ‘উচ্ছন্নে’ যেতে সে পছন্দ করে। আট ‘শট’ পর্যন্ত তার কিছু হয় না। চেনা হলো পরিশেষে। সে যাদেরকে লোয়ার স্ট্যান্ডার্ড মনে করে, তাদের সঙ্গে বসেই ডুবে গেল। অথবা ভেসে রইলো।

একটা ছেলেকে চিনি। ঈদে চলে। পূজোয় চলে। বড়দিন। তারপর মাসের শুরুর একদিন। মাসের শেষে আরো একদিন। বড় ভাই জোর করলো একদিন। একজন এক কার্টন গিফট করেছে- তার থেকে এক বোতল পাওয়া গেল! – এরকম নানা ছুতো। অবশ্য এসবে ছুতো তৈরিই থাকে।

এই শ্রেণিটা অন্যদেরকে লোয়ার স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনা করে। ওহ, তুমি মদ খাও না? তবে, তোমার অবস্থান, আমাদের সমাজের বাইরে!

বাংলাদেশে এই যে মদের কালচার- সে কি বিশ্বকে তাল মেলাতে গিয়ে? আমার দেশে বুঝি তাপমাত্রা শূন্যে পৌঁছায়? নাকি, যেসব দেশে মদ কালচার, তারা দিনরাত ‘পানীয়’কে কেন্দ্র করেই ঘোরে? তাদের সকল ক্রিয়েশান কি ‘মদে’ই
শেষ?

ঠিক এই কারণেই। এই কারণেই দেশে এতো বার এখন। মদের ছড়াছড়ি! সেই শ্রীমঙ্গলের লিকারের বৈধ দোকানের মতো। শহরের রাজারা গোপনে ‘শল’ করেছে। এ জাতিকে আর কখনো প্রতিবাদ করতে দেবে না। মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না মেরুদন্ড নিয়ে। সুস্থ চিন্তা নিয়ে। তাদের বিষন্নতায়, ডিস্টার্বিং সময়কে সামলে দেবে ‘মদ’! তাতে করে চা- বাগানের মত, শহরের মানুষগুলোও আর অন্যায্য- অন্যায় চোখে দেখবে না।

তাই শহরে আজ কোনো আন্দোলনে এরা নেই।

তবে স্কচে নিমজ্জিত জাতির ‘প্রতিবাদ’ কাদের হাতে?

প্রতিবাদ সেই কিশোরদের হাতে। যাদের মাথা এখনো স্বচ্ছ। বিবেক তৈরি হচ্ছে। যারা এখনো মদটায় রপ্ত হয়নি। তারা রাস্তা সামলায়। হুমকি দেয়, সরকারও সামলাবে!

সুতরাং একটু ভাবুন, শাসকের ‘স্লো পয়জনে’ জাতিকে আর কোথায় নিয়ে যাবেন? চা- বাগানের বঞ্চনায়? নাকি কিশোরদেরই সামলাবে দেবেন আন্দোলন?

দারুস সালাম, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares

লেখাটি ৩৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.