কাবিন, যৌতুক, গৃহশ্রম: ঘরের অধিকার কার?

0

সৈয়দা সাজিয়া আফরীন:

জুবাইদা গতানুগতিক ও সাধারণ মানসিকতার পরিবারে জন্ম নেন। নিজেও খুব সাধারণ ভাবনা চিন্তার সোজাসাপ্টা মানুষ। পড়াশোনা তার উচ্চমাধ্যমিক ডিঙাতে পারেননি। পরিণত বয়সে বেশ ধরে পড়ে নেয়া যৌতুকে তার বিয়ে হয়।
স্বামীর ছোট ব্যবসা। ঠিক যেদিন থেকে বিয়ে হয় তার সপ্তাহ গড়াতেই স্বামী এবং তার পরিবারের উত্তম-মধ্যম শোনা শুরু হয়। খুব কষ্ট পেলেও এসবকে নারীর জীবনের ধার্য্য বস্তু মনে করে সয়ে যান। দিন গড়ালেও এসবের মাত্রা কমেনি এক দণ্ড কোনদিন। বরং একটা মানুষের নৈমিত্তিক যা চাহিদা থাকে, সেটাও স্বামী দিতে নারাজ। নারকেল তেল, একটা শ্ম্পুো, ব্যবহার্য দুয়েকটা পোশাকও তার থাকে না। এই সেই প্রয়োজনে বাবার বাড়ি ধর্ণা দেন। সারাদিন নিরবিচ্ছিন্ন কাজের পর এঁটো ঝুটা খেয়ে দিনযাপন করেন।

স্বামী অশিক্ষিত এবং স্বভাবে বদ, তিনি মাঝে-মধ্যে বউকে পেটাতে পছন্দ করেন। তার মনোভাব হলো বউকে এরকম বাবার কাছে ভাইয়ের কাছে চেয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে আসতে হয়, উচিতও। স্ত্রীর পরিবারকে তিনি না পছন্দ করলেও সেখানের টাকা-পয়সা আনতে বেশ পছন্দ করেন। এ ব্যাপারে ধর্ম-সমাজ যাই বলুক না কেন, পাওয়ার ব্যাপারে তার মানসিকতা খুব ইতিবাচক। তিনি পেয়েছেনও। এর পরিমাণ হিসেব করলে বলতে হয় তার যে কাবিন ধার্য্য হয়েছিল, যোগ করি তার খাদ্য বাবদ যা ব্যয় হয়েছে সে সংখ্যার তিনগুণ।

আর্থিক দাঁড়িপাল্লায় জুবাইদার কাজকে মাপা হলে তার মাসে অন্তত আট হাজার টাকা পাওয়া উচিত বা তারও বেশি। অথচ তাকে জরুরি চিকিৎসার খরচ নিতেও বাবার কাছেই আসতে হয়। চৌদ্দ বছরের জীবনে মারাত্মকভাবে ইঞ্জুরি হয়েছে এরকম মারধরসহ এতো অপমান সয়েছেন যে হিউম্যান ডিগনিটি কী জিনিস তা তিনি ভুলেই গেছেন। ওনাকে একটু ফেইকও হাসতে দেখিনি কোনদিন। শারীরিক অসুস্থতা তার আছে, মানসিকটাও সামান্য নয়। ক্রনিক ডিপ্রেশনে আছেন। দেখলেই ধারণা করা যায়, এখন যদি একটা মামলা দাঁড়ায়, এবং জুবাইদা জেতেও, টেনেটুনে কাবিনটা পাবেন হয়তো। বাকি দেয়াটা চুলোয় গেছে।

শীলাও খুব খুব কম পড়াশোনা করেছেন। বেঁধে দেয়া চামড়ার বিচারে সুন্দরী না। তবে স্মার্ট অনেকটা আধুনিকমনা। ইউটিউব ফেসবুক ব্যবহার করতে জানেন। কাজকর্মে পটু। বাবা-মা প্রচুর অর্থকড়ি ঢেলে বিয়ে দিয়েছেন। পাত্রের সাথে তার সবে মিলে তিন চার বছরের সংসার। এরপরেই ডিভোর্স হয়ে যায়। বিয়ের পরেই শাশুড়ি মায়ের কাজ, ঘরের কাজ আর স্বামীর কাজ একহাতে করেছেন। ঈদ টিদ না হলে পোশাক বা কোন হাত খরচ পেতেন না। বরং তার বাবার বাড়ি থেকে মূল্যবান উপহারাদি আসতো। ডিভোর্সের লেনদেনটা ছিল কাবিনের ধার্যকৃত টাকার একটা অংশ, পুরাটা দিকে সম্মত হননি স্বামী। আর স্ত্রীও তাতেই রাজী হন। আর দীর্ঘ ব্যবহৃত আসবাবগুলো ওই অবস্থায় ফেরত দেন। ব্যাস এটাই। কাবিনের অংকটার চেয়ে বেশি অর্থ মেয়েটার বাড়িতে বরযাত্রী খাওয়াতেই খরচ হয়েছিল। অন্যান্য উপহারের কথা বাদই দিলাম।

এরকম একশো কুড়ি গল্প আছে, প্রতি একজনের অন্তত দশটা ঘটনা নিজের অভিজ্ঞতার থলিতেই আছে। সংখ্যাটা আঁচ করা যায়?

চূড়ান্ত ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত না হলে ভিক্টিম মামলা পর্যন্ত যায় না। অথচ আমাদের রাজনীতিকরা দুম করে মিডিয়ার সামনেই বলে বসেন, অধিকাংশ নারী নির্যাতন মামলা নাকি মিথ্যা!

নির্যাতনের ঘটনা এতো কমন আর এতো নৈমিত্তিক, থানায় মামলা না নিয়ে বরং প্রতি মাসে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটা অনুসন্ধান হওয়া উচিত। ঘরে ঘরে গিয়ে খবর নেয়া বা অনুসন্ধান করা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কী না! যেটা সাধারণত মামলা নথিবদ্ধ হবার পর করা হয়।

আর গল্প বলার দরকার নেই মোদ্দা কথায় চলে আসি।

বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ সালের। নারী নির্যাতন দমন আইন চলছে ২০০০ সাল থেকে। বেশ দীর্ঘ সময় ধরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও তাদের মত কাজ করেছে। সচেতনতার সময় বলতে এ সময়টা খুব কম নয়।

এ সময়ের মধ্যে সব জুবাইদাদের এক একটা খামারী, কৃষক, ক্ষুদ্রব্যবসায়ী, উদ্যোগ, বা অন্তত গার্মেন্টসকর্মী হয়ে স্বনির্ভর হওয়া উচিত ছিল। কিছু না হোক, বিয়ের বিনিময়ে মেয়েপক্ষের বড় অংকের অর্থের খরচটা তো না হতে পারতো।

আমাদের চোখে এ সমস্যাগুলো যত গুরুতর হোক না কেন, সমাধান আছে এবং এটা খুব সহজলভ্যও মনে হয়। তড়িৎ ডিভোর্স করে এবং শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করে রাতারাতি গীতা থেকে সীতায় পরিণত হওয়া। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী হওয়া। যা পায় কাজ করা, হঠাৎ করেই আয় করা সাহসী মেয়েটা হয়ে যাওয়া। মেয়েটা পারেনি, এরকম অনেক মেয়েরা পারে না, সুতরাং তাদের ব্যক্তিত্ব বলতে কিছুই নাই। এ কারণেই সে এ জীবন ডিজার্ভ করে।

আমার জানার ইচ্ছা, একটা জীবন ধারণের ন্যুনতম সুযোগটা পেতে একটা মেয়েকে খুব সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী, নারীবাদে চরম পরম বিশ্বাসী হতে হবে কেন? একটা খুব সাধারণ নারীর কী মানুষ হবার সম্মানটা পেতে, গৃহশ্রমের বিনিময়ে হোক তার হকের খাবারটা, প্রয়োজনটা নিতে এতো ব্যক্তিত্ব, এতো সাধু, এতো আঁতেল হবার প্রয়োজন কেন হবে?

ছেলেও অশিক্ষিত হয়, মুর্খ হয়, ব্যক্তিত্বহীন জোকার হয়, দরিদ্র হয়, কিন্তু ওদের জীবিকা তো বন্ধ হয়ে যায় না! বেশিরভাগ তাদের জন্য উন্মুক্ত পেশা। রিকশা চালাও, বিদেশ যাও, মুদির দোকান দাও যা ইচ্ছা করো।

এ সমাজটার প্লেটে অনেক কিছু আছে। স্বামীর মাকে ভাতে মারা মেয়ে আছে, স্বামীকে তার পৈত্রিক পরিবারে সম্পর্ক না রাখতে দেয়া মেয়ে আছে, স্বামীর টাকা বেতন পাবার দিনই কেড়ে নেয়া মেয়ে আছে, স্বামীর অর্থে গয়না, প্রসাধনী, কিটিক্লাব সুখবিলাসে জবুথবু মেয়েও আছে।

অন্যদিকে নারীর গৃহশ্রমের মূল্য না দেয়া জালিম স্বামী, মেয়ের পরিবার থেকে মোটা মোটা নিয়েও মেয়েটাকে স্বামী পেটায়, অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে নিত্য অনিশ্চয়তায় রাখা ইবলিশ স্বামী আছে।

দেখতে হবে সংখ্যাটা ভারী কোথায়? দামী প্রসাধনের সুখে লেপ্টানো মেয়ের সংখ্যা আসলে বেশি কি?

হোমমেকার বা গৃহিণী তাকে যে নামেই চেনা হোক, তার শ্রমটা যে কোন একটা কাজ প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে বসে সহকর্মীর সাথে আড্ডা দিতে দিতে করা ক্ল্যরিক্যাল জব না। এটা কষ্টসাধ্য, সময় নির্দিষ্ট না, এবং অত্যন্ত চাপের। এই জিনিসটার মূল্যায়ন করতে তার ব্যক্তিত্ব না মাপলে চলে না?

যে মেয়েটা আয় করে করেছে, তার সন্তান নেবার সময়টাতে তার যে কোনো প্রয়োজন এবং আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্বটা কি স্বামী বা পার্টনারের উপর বর্তায় না? যদি না হয়, এতোটা চ্যালেঞ্জ কেন মেয়েটাকে নিতে হবে যে তার সন্তান লালনপালন একে ওকে দিয়ে করিয়ে শুধু অর্থের যোগানে ইমিডিয়েট কাজে থাকতে হবে? কেনই বা মেয়েটা সুপার উইম্যান হবার চেষ্টায় চেষ্টায় ডিপ্রেশনে যাবে?

নির্যাতন তো ক্রাইম/ অপরাধ। ভিক্টিম নিজে মামলা না করলেও রাষ্ট্র বাদী হয়ে করবে। ভিক্টিম মেয়েটার ব্যক্তিত্ব না থাকলেও ন্যায়বিচার তার প্রাপ্য। ধরি একটা পাগল যে তার বেঁচে থাকার, নিরাপদে থাকার অধিকার নিয়ে সচেতন না। কেউ এসে তাকে গুরুতর আঘাত দিল, এতে তার মারাত্মক শারিরীক ইঞ্জুরি হলো। পাগল বলে সে বিচার পাবে না? না পাওয়া উচিত?

বিচ্ছেদে প্রদেয় অর্থ নিয়ে ছেলেদের অনেক বিরক্তি উদ্রেক হয়, এরকম স্টেটমেন্ট শুনেছি। সামাজিক যোগাযোগে ট্রল করে খুব শিক্ষিতরা বলেন, বলেছেন। বিচ্ছেদে চোখ লাল করে কাঁদা, ভয়ানক অনিশ্চয়তায় পড়ে মেয়েটাকেও শ্বশুরবাড়ি থেকে বলেছে, কাবিন ব্যবসা করে মেয়ের পরিবার।

আমি তো বলবো, এটা যথোপযুক্তই নয়। এই পরিমাণ অর্থ তো বিয়ের দিনই চলে গেছে মেয়ের পরিবারের পকেট থেকে। ছেলেপক্ষ যে গয়না দেয়, সেটা কাবিনের টাকাতে বিয়োগ করে লেখে। পরে আবার প্রয়োজনে নিয়ে বিক্রিও করে। তবু ওটা পরিশোধিত বলে গণ্য হয়। কী হাস্যকর না! কাবিনে ভীষণ সমস্যা যৌতুকে নয়।

বিয়ে চুক্তি ছাড়া অন্য কোথাও এরকম অনৈতিক, অপরপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা লেনদেন মেনে নেয়া হয় না। আলোচিতও হয় না। আমেরিকা, ভারতসহ অনেক উন্নত দেশে বিয়ে বিচ্ছেদের লেনদেন এ স্ত্রী এবং সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তার স্বার্থে আলাদা আইন আছে। দেবার অংকটা ছেলের আয়ের দুভাগের একভাগ সম্পদেরও পঞ্চাশ শতাংশ।

সব মেয়ের প্রজ্ঞা থাকবে, শিক্ষা থাকবে, সাহস থাকবে প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব থাকবে, এরকম রাতারাতি সম্ভব না। সব মেয়ে নারীবাদী হবেন, এরকম আশা রাখাও ভুল, বিশেষ করে আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনায়। এই ভালনারেবল অবস্থায় নারীর উপর নিজেই সমাধান করে নেবার চ্যালেঞ্জ দেয়াও খুব অবাস্তব প্রস্তাব। যেখানে বিশাল এক সংখ্যার নারী ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার, সেখানে দুইটা পাঁচটা নির্যাতক আর কিটি নারীর প্রতি সজাগ কনসার্ন দেয়া মানে ওই বিশাল সংখ্যাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

শেয়ার করুন:
  • 285
  •  
  •  
  •  
  •  
    285
    Shares

লেখাটি ১,২৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.